লোকসাহিত্যের যাত্রাপথ ও প্রযুক্তির প্রেক্ষাপট
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
একজন করে চারণ কবি, কবিয়াল, সর্দার ও দোহারী মারা যাচ্ছে বা বৃদ্ধ হয়ে স্মৃতিভ্রম হচ্ছে আর লোকসাহিত্যের একটা করে লাইব্রেরী যেন নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একটি এলাকায় পালাগান, কবিগান, যাত্রাগান, লোকখেলা, গম্ভীরা, জারিগান ও মেয়েলিগীত উঠে যাচ্ছে আর লোকসাহিত্যের একটা করে বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসস্তুপের নিকট ছাপা পড়ছে। সেখান থেকে হয়তো কখনো সেসব গীতিকা, গীত ও লোককথাগুলোকে উদ্ধার করা যাবেনা।
লোকসাহিত্য সংগ্রহ সংরক্ষণ এর যে অনুরাগ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্যাহ, কবি জসিম উদ্দীন. মোজাফ্ফর আহমদ, চন্দ্রকুমার দে, ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন ও আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদসহ অন্যরা শুরু করেছেন। তার ধারা হয়তো বেঁচে আছে কিন্তু অব্যাহত আছে বললে ভুল হবে। খুবই স্বল্প পরিসরে তার চলন আর সারে সারে চলছে তার দলন। একদিকে চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রেকর্ড ও সংগ্রহের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
‘‘সিনেমা, টেলিভিশন আর ইন্টারনেটের যুগ! তাতো হবেই’’। কেউ একধাপ এগিয়ে বলবে ‘‘ভারতীয় টিভি সংস্কৃতির আগ্রাসন’’! কেউ বলবেন, ‘‘আকাশ সংস্কৃতির যুগ! কার সাধ্য সংস্কৃতির আমদানী ঠেকায়’’? একধাপ এগিয়ে বলবেন কেউ ‘‘ইউটিউবের যুগে একথা বেমানান’’।
কথা অসার নয়, অমূলক নয়। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, মুক্ত সংস্কৃতি, নতুন প্রজন্মের প্রশ্বস্তি আর আন্তজালের বিস্তৃতিতে হু হু করে অপরাপর সংস্কৃতির বাতাস প্রবেশ করবেই। বিশ্ব সংস্কৃতির স্বাদ আস্বাদন না করলে সংস্কৃতিমনা বলে উত্তরীয় চড়িয়ে ঝোলাব্যাগ ঝুলিয়ে সাহিত্যের কচকচানি করব আমরা আর আমজনুা গিলবে বাজারী বিনোদন।
আগামী প্রজন্ম গণতান্ত্রিক এক মুক্ত পৃথিবীর বাসিন্দা, যা কিছু চাইবে গ্রহণ করবে যা কিছু চাইবেনা এড়িয়ে যাবে। সংস্কৃতিতে আর ছাপিয়ে দেয়া বিষয় নয়। এতো আর ধর্মের বাণী নয় যে পরকালের মঙ্গলের জন্য মান্য অথবা শিরোধার্য, এমনকি রাজ রাজড়ার যথাজ্ঞা নয় যে ‘‘জোহুকুম’’ বলে মেনে নিতে হবে। রাষ্ট্রতো কারো সাংস্কৃতিক স্বাধীনুায় বাগড়া দিতে পারেনা। এসব কথাগুলো আধুনিকতা, বাস্তবতা এবং আগামীদিনের নিরীখে সত্য
এইযে, প্রযুক্তির সুযোগ, মুক্তচর্চার অবারিত দ্বার এবং আদান-প্রদান ও প্রচার প্রপাগান্ডার বিশাল জগণ এখানে আমরাওতো পারি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে তুলে ধরতে। না, অন্য সংস্কৃতির বিরোধীতা করে বা ঠেকিয়ে নয়।
ভিনদেশী সংস্কৃতির কোনো রস আস্বাদন করতে চাইলে তা যে কেউ করতে পারে বা করবে। সেটা নিজের সংস্কৃতিকে পায়ে পিষ্ট করে দলিত মথিত করে নয়। বিশ্বজুড়ে হাজারো সংস্কৃতিক ধারার সাথে আমার ভাষা, আমার সাহিত্য, আমার সংস্কৃতি আমার কৃষ্টি ও কালচার টিকে থাকবে নিভু নিভু প্রদীপের আলোতে নয় শত সহ¯্র ধারায়। এটা কোনো সংস্কৃতির সাথে প্রতিযোগিণা করে নয়। প্রতিটি সংস্কৃতি তার ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিকশিত ও প্রকাশিত হবে। এমনটাইতো হওয়া উচিত।
কিন্তু তা আর হচ্ছে কই? ফুটবল ফেডারেশন যেভাবে আছে, লোকক্রীড়া ফেডারেশনতো সেভাবে থাকতে পারতো। ক্রিক্রেট বোর্ড সরগরম, হাডুডু ফোরামতো আরেকটু চাঙ্গা হতে পারতো। এইযে দৈন্যতা স্বীয় সংস্কৃতির প্রতি সেটা সাধারণ মানুষ বলি আর হুকুমু বলি সকলের ক্ষেত্রেই রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের হয়তো তখনো চেতনা হবে যখন শতশত গ্রামীন খেলা, খেলার বোল, গীতিকবিতা, পালা ও কথিকাগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমী এ ব্যাপারে কয়েকধাপমাত্র এগিয়েছে। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্ন সংগ্রহ ছাড়াও তারা জেলাভিত্তিক সংগ্রহ প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু সাদাকালোর বাইরেও যে অনেক রং রয়ে গেছে।
খুব কি কঠিন কাজ হবে, যদি শিল্পকলা একাডেমীর সাথে প্রতি জেলায় একটি করে লোকসাহিত্য উপশাখা খোলা হয়? খুব কি ব্যয়বহুল হবে, যার কাছে বা যার যার স্মৃতিতে যেসব লোকসাহিত্য রয়েছে সেগুলোর পান্ডুলিপি জমা নিলে, এমনকি সেটা সম্মানির বিনিময়ে হলেও? দু-চারজন গবেষক যে কাজ বছরের পর বছর করবেন যে কাজ সরকারীভাবে বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষনার মধ্য দিয়ে কয়েকগুন কম সময়ে করা যাবে। জরুরী নয় যে হাতে লিখে দিতে হবে। অডিও বা ভিডিও রেকড করেও জমা নেয়া যায়।
আজকাল প্রত্যেকের হাতেইতো মুঠোফোনের ভেতরে রয়েছে সব কারিকুরি। তবে গবেষকদের কাজও থাকবে সাধারণ সংগ্রহ আর গবেষণা দুটোতো ভিন্ন মাত্রার কাজ। বøগে লিখে পোস্ট করা যায়। ভিউি করে ইউটিউবে আপলোড করা যায়।
জাতিসত্তার বিকাশে জাতীয়তার বিতর্ক কবে শেষ হবে আমরা কেউ জানি না গত কয়েকশ বছরে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরেপেক্ষতাবাদের বিকাশ রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে স্বমাহিমায় প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। শেকড়ের সন্ধানী কিংবা মূলের ধারন-বাহনের আকুতিও প্রতিটি সমাজের কিছু মানুষদলের মাঝে আজো বিদ্যমান। তাদের সংগঠন, দেশ কিংবা প্রতিষ্টান না থাকায় সেটা কিছুটা ¤্রয়ি। সে সংকট এর বাইরে নয় বাঙালীও।
শেকড়ের সন্ধান করতে গেলে কেবলি বেরিয়ে আসে হাজার বছরের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শিল্প, আচার, বিশ্বাস ও ধর্মানুষ্ঠানের চিত্র। তাই মুসলিম কিংবা হিন্দু, বাংলাদেশী কিংবা ভারতীয়, দেশী কিংবা প্রবাসী সকল বাঙালীর শেকড় যেন এক জায়গায়। আর নিজেদের পৈত্রিক সম্পদ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে বাংলা সংস্কৃতির বটগাছের শেকড়ের নিচে গোপনে জমা রাখা বাঙ্গাল সংস্কৃতির হাড়িতে থাকা মুঠো মুঠো হীরা-মানিক-সোনা-মুক্তা।

