জমিদার বাড়ী

বাংলাভাষার উৎস ও বিকাশ

বাংলাভাষার উৎস ও বিকাশ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

ভাষাবিজ্ঞান এক রহস্য ও সম্ভাবনার বিজ্ঞান। মানুষের মুখের ভাষা কালক্রমে  শানিত আর সাহিত্যের ভাষায় রুপ নিয়েছে। মানুষ যুগে যুগে নিজেদের প্রয়োজনে শব্দ তৈরী করে সেই শব্দের মালা গেঁথে তা দিয়ে ভাষার গাঁথুনি নির্মাণ করেছে। সারা পৃথিবীজুড়ে নানা জাতির মানুষের ভাষা রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের জন্য তারা ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করলেও তাদের হাসি কান্না অবাক করার অভিব্যক্তিগুলো কিন্তু একই রকম। ভাষা কখন কিভাবে আবিষ্কার হলো বা শুরু হলো তার দিন তারিখ দেয়া কঠিন। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে মানুষের ভাষা বিকাশের যে ধারা তা ভাষা বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে ভাষার গতি প্রকৃতি প্রকারভেদ পরিবর্তন ও বিকাশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছেন।

বিশ্বের যাবতীয় ভাষার উৎপত্তি মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি মূল ভাষা গোষ্টি থেকে। ইন্দো-ইউরোপীয় বা আদি আর্য ভাষাগোষ্টী এদের মধ্যে একটি। আবার এই ভাষা গোষ্ঠী থেকে উৎপত্তি হয়েছে আনেকগুলো ভাষার। সে ভাষাগুলোকেই আমরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করি। প্রচলিত এবং বিলুপ্ত ভাষাগুলোর ধরণ বিচার করে কয়েকটি শ্রেনীতে ভাগ করা হয়েছে। হাজারো বছর আগে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা বঙ্গীয় অঞ্চলে কোমল চলনসই এক ভাষায় রুপপরিগ্রহ করেছে। এই ভাষাকে কখনো বলা হয়েছে প্রাকৃত, কখনো বলা হয়েছে গৌড়িয় ভাষা, কখনো বলা হয়েছে গৌড়িয় প্রাকৃত। কারণ এটা প্রাকৃত জনের ভাষা। এটা সে ভাষাই বাঙ্গালা বা বঙ্গালা বা বাঙালা ভাষা। গ্রহণযোগ্য মতে বাংলা ভাষার জন্ম হয় মাগধি গৌড়িয় অপভ্রংশ থেকে। বাংলাভাষার তিনটি যুগ রয়েছ্

যথা:
১। প্রাচীন যুগ; ৬৫০ খ্রিষ্টপূর্বাদ্ব থেকে-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্তু
২। মধ্যযুগ: ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে -১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্তু
৩। আধুনিক যুগ: ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে -বর্তমান সময় পর্যন্ত

ভাষার ইতিহাস মানব সভ্যতার চেয়েও পুরনো। আনুমানিক ৫০০০ হাজার খ্রিস্টপূর্ব মধ্য এশিয়ায় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর উদ্বব হয়েছিল ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাবংশ আবার প্রধানত ৮টি শাখায় বিভক্ত। এরা হল- গ্রিক, ইতালিক, কেলটিক , জার্মানিক, আর্য যা ইন্দোইউরোপীয়, বালটো¯েøাাভিকামেসিয়ি এবং আলবানয়ী। এর মধ্যে প্রথম ৪টি পূর্বাংশের ভাগ (মূলত এশীয় যার নাম ‘সতম্ শত বা একশত্ জামার্নিক শাখা থেকে ইংরেজি ভাষার জন্ম। কারোমতে ইংরেজী একটি উপদ্বীপের ভাষা। আর আর্য শাখার দুটি প্রধান ভাগ হলো ফার্সী ও ভারতীয় যা থেকে সংস্কৃত ভাষার জন্ম্ । ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব আড়াই হাজার পূবে মধ্যে এশিয়ায় একদল লোক বসবাস করত। তারা প্রথমে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তার নাম ইন্দো ইউরোপীয় মূলভাষা। এই ভাষা থেকেই পৃথিবীর বেশীরভাগ ভাষার জন্ম হয়েছে। পরবর্তীতে তারা ইউরোপও মধ্য এশিযার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। একসময় ইন্দো-ইউরোপীয ভাষাগোষ্ঠীর এদের একদল পাকিস্তানের উত্তরপশ্চিম সীমান্তে হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। তাঁদের ভাষা আর্য ভাষা রূপে পরিচিত ছিল। এই আর্য জাতি ক্রমশ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতের আদিবসীদের সাথে একাত্ম হয়ে যায়।
এ অঞ্চলে আর্যদের আগমনে ভাষা ধর্ম ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন সাধিত হয়। আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব অব্দ থেকেই আর্যরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ভারতবর্ষে আসতে শুরু করে, সঙ্গে ছিল বৈদিক ভাষা ও দেবগীতিমূলক সাহিত্য। আর্যদের আরেকটি দল মধ্য এশিয়ায় বসতি স্থাপন করে। ইরানিয়রা ও ভারতীয় আর্যরা একত্রে ইন্দো-ইরানীয় নামে পরিচিত।
ইন্দো ইরানিয়দের ভাষার প্রচীন নিদর্শন পাওয়া যায় ১২০০-১১০০ খিস্টপূর্বে রচিত ঋগে¦দে। খ্রিস্টর্পুব ১৫০০-১০০০ বেদ যে ভাষায় লেখা হযেছিল তার নাম বৈদক ভাষা কেউ কেউ আর্যভাষাও বলেন। গবেষণা থেকে জানা যায় মোটা মুটি ৮০০ খ্রিস্টাব্দ পুর্বে থেকে শুরু হল ভাষাভিত্তিক আধিপত্য। পরে ভাষায় শৃংখলা আনয়নের কাজ শুরু হয়। সংস্কৃত ভাষাও এ ভাষার একটা পরিবর্তিত রুপ। ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পানিনি নামক একজন ব্যাকরণবিদ অষ্টাধ্যায়ী নামক বিখ্যাত গ্রন্থে এলোমোলো ভাষাগুচ্ছকে সংস্কার করে সর্বভারতীয়দের জন্য সুস্থির রূপ দান করেন এ থেকেই শুরু হলো সংস্কৃত ভাষা। পরে বাংলা ভাষাতেও এর প্রভাব পড়ে।

সংস্কৃত ভাষা বর্তমানে মৌখিক ভাষা হিসেবে প্রচলিত না থাকলেও হিন্দু ধর্মের মন্ত্র, যজ্ঞ ও নানা আনুষ্ঠানিকতায় এর ব্যবহার রয়েছে। সংস্কৃত কথাটার মানে হল সংস্কার করা হয়েছে বা শুদ্ধ করা হয়েছে ভাষা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রূপে অগ্রসর হতে থাকে এসব ভাষাকে বলা হয় আদিম প্রাকৃত ভাষা। এই প্রকৃত বা প্রাকৃত ভাষা কথাটির তাৎপর্য হল প্রকৃতির অর্থাৎ জনগণের কথ্য ভাষা অথবা প্রান্তিক জনগনের ভাষা। এই প্রকৃত ভাষাই আঞ্চলিক ভিন্নতা নিয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত হল। যেমন: মাগধি পাকৃত, মাহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনি প্রাকৃত, পেশাচি প্রাকৃত ইত্যাদি। মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংম থেকে কালক্রমে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উৎপত্তি লাভ করে আজকের বাংলাভাষা। সেদিক থেকে বাংলা অনেক পুরনো ও বনেদি ভাষা।

ভাষার এইসব তথ্য গত কয়েক শতকে জানতে পেরেছেন ভাষাবিদ পন্ডিতগণ। ১৯শতকের শেষের দিকে জর্জ গ্রিয়ার্সন তাঁর একটি প্রবন্ধে প্রথমে বলেন, মাগধী প্রকৃতভাষা নামক একটি ভারতীয় উপভাষার পূর্বাঞ্চলীয় বিশেষ এক রূপ থেকে বাংলাভাষার জন্ম হয়েছে শতকের প্রথম দশকে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে কাঠামো বিষযক বিতর্ক বাংলাভাষার উদ্বব বিষয়ক ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
সংস্কৃত বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করতেন যে সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলাভাষার বিকাশ হয়েছে। কিন্তু গবেষনা থেকে দেখা গেল বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষার জন্ম এবং এটা আজ প্রতিষ্ঠিত ধারণা। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে হরপ্রসাদশাস্ত্রী নেপালে রাজ গ্রন্থগারে পান তিনটি পুথিঁ আর ১৯০৯ খ্রিস্টব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লব বাঁকুড়া বিঞ্চুপুরের এক গোয়ালঘরে সন্ধান পান একটি পুঁথি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিস্কার একত্রে প্রকাশিত হয় হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা নামে এর একটি নাম চর্য্যাশ্চর্য যার মূল নাম ছিল চর্যাগীতিকোষ পরবতীতে এটাই চর্যাপদ নামে পরিচিতি পায়।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন মাগধি অপভ্রমংশ থেকে বাংলাভাষার জন্ম। ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ মনে করেন গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে জন্ম নেয় আধুনিক বাংলা ভাষা। এখানে সামান্য বিতর্ক থাকলেও। বাংলা ভাষার জন্ম সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে হয়নি এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে বলা যায়।

এভাবে দেশ বদলে যায়, মানচিত্র বদলে যায়, বদলে যায় ভাষাও। বাংলা ভাষার জন্মকথা সম্পর্কে জানতে মোটামোটি এই বিষয়গুলো আমলে নিলে সংক্ষিপ্ত ধারণা থাকবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply