দেশের পাশে নতুন দেশ: সংকট নাকি সম্ভাবনা?

দেশের পাশে নতুন দেশ: সংকট নাকি সম্ভাবনা?

দেশের পাশে নতুন দেশ: সংকট নাকি সম্ভাবনা?
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চল রাখাইন, যা মিয়ানমারের একটি উপকূলীয় রাজ্য, বর্তমানে এক নয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। এই অঞ্চলটি মিয়ানমারের অন্যতম দরিদ্র এলাকা হলেও এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ এবং কিয়াউক পিউতে পরিকল্পিত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ অঞ্চল দিয়েই চীনের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রবাহিত হচ্ছে, যা এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ও সম্ভাব্য স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার সম্ভাবনা। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি আরাকান আর্মি নতুন দেশ ও সরকার ঘোষণা করে, তাহলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশ আমূল বদলে যাবে। এতে বাংলাদেশের জন্য নতুন এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, কেউ কেউ এটিকে সম্ভাবনার নতুন দ্বার হিসেবেও দেখছেন। কারণ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই খুব ইতিবাচক ছিল না। ফলে, নতুন কোনো প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট ও নতুন সমীকরণ

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের অন্যতম প্রধান সমস্যা। নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে, এই সংকট আরও জটিল হতে পারে। তবে, যদি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের গঠনমূলক আলোচনা হয়, তাহলে সংকট সমাধানেরও একটি পথ বেরিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী ২৭০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে বর্তমানে আরাকান আর্মির শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বড় প্রশ্ন হলো— নতুন এই প্রতিবেশীর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক রাখা হবে? বাংলাদেশ কি সশস্ত্র গোষ্ঠী বনাম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যুক্তি দেখিয়ে নীরবতা অবলম্বন করবে, নাকি বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে? শেখ হাসিনার সরকার যে ভুলটি করেছিল, বর্তমান সরকারও কি সেই একই ভুল করবে?

বাংলাদেশের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি

আরাকান আর্মি কারো প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়াই মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তাই তাদের সমর্থন করা বা না করা নিয়ে বাংলাদেশের বড় কোনো ভূমিকা নেই। তবে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মংডু থেকে চাল ও গবাদিপশু আমদানি করলে বাংলাদেশের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। যদিও সম্প্রতি এক জাহাজ চাল আমদানির অনুমোদন কাগজপত্রের কারণে বাতিল করা হয়েছে, যা আমলাতন্ত্রের অদক্ষতার একটি বড় উদাহরণ।

একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে চাল আনতে গিয়ে যদি কাগজপত্রের যথার্থতা খোঁজা হয়, তাহলে সেটা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নয়। এদিকে, বাংলাদেশে বৈধ কাগজপত্র থাকলেই নিম্নমানের খাদ্যদ্রব্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। এতে বোঝা যায়, আমাদের আমলাতন্ত্র কেবল ফরমালিটির আড়ালে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যর্থ।

আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান

“আশপাশের শক্তিশালী দেশগুলো কেউ চাইছে না এ অঞ্চলে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হোক। এ রকম নতুন রাষ্ট্র বেরিয়ে এলে শক্তিশালী দেশগুলোর ভয় হলো, তাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীরা’ উৎসাহিত হবে।” এটি আরাকান আর্মির বক্তব্য, যা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। এই অবস্থান থেকেই বড় শক্তিগুলো রাখাইনে নতুন রাষ্ট্র গঠনের বিপক্ষে রয়েছে। তবে, বাংলাদেশের জন্য মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের কৌশলগত অবস্থান কী হবে।

বাংলাদেশ অতীতে একতরফাভাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রতি নমনীয় ছিল। এক বড় ভুল ছিল জান্তা সেনাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে পরে তাদের ফেরত পাঠানো। এতে আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিচার করানোর সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ, এই সেনারা ছিল রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রত্যক্ষ অংশীদার এবং সাক্ষী।

আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক

যদিও আরাকান আর্মি একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, তবুও শুধুমাত্র সেই কারণে তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার নীতি যথার্থ নয়। কারণ, বাস্তবতা হলো, রাখাইন অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা ভবিষ্যতে আরও বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই তারা মিয়ানমার সামরিক শাসকের আরও কিছু এলাকা দখলে নেবে। এই বাস্তবতায়, বাংলাদেশের উচিত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা। কারণ, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা সংকটের অন্যতম কারণ হলেও, তাদের ছাড়া এই সংকটের সমাধানও সম্ভব নয়।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও বাংলাদেশ সে সুযোগ হাতছাড়া করেছে। এখন ২০২৫ সালে এসে তারা আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না, বরং রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গারা তাদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?

বাংলাদেশ সরকারের জন্য প্রধান করণীয় হলো, ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ বলে দূরে থাকার পরিবর্তে কৌশলগতভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। অতীতে ‘নীতি ছাড়া নীতি’ (No Policy is a Policy) গ্রহণ করে দেশের স্বার্থহানি ঘটেছে। তাই এখন সময় এসেছে সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতি গ্রহণের।

আফগানিস্তানের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পর তালেবান ক্ষমতায় এলে, চীন ও রাশিয়া কোনো দ্বিধা না করেই তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজ দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ। বাংলাদেশেরও উচিত, আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চায়, তা স্পষ্ট করা।

একটি নতুন রাষ্ট্রের আবির্ভাব

দেড় দশকেরও কম সময়ে আরাকান আর্মি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করে রাখাইনে কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মংডু দখলের মাধ্যমে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শেষ শক্তিশালী ঘাঁটিকে ধ্বংস করেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে— বাংলাদেশের উচিত হবে কি নতুন এই দেশকে শত্রু হিসেবে দেখা, নাকি কূটনৈতিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা?

উপসংহার

বাংলাদেশের জন্য রাখাইনে উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মিশ্রণ। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত। সঠিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হতে পারে, অন্যথায় এটি আরও একটি অমীমাংসিত সংকটে পরিণত হতে পারে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply