Bangladesh

বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রসার

বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উৎপত্তি ও বিকাশ

বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। তারা অর্থনৈতিকভাবে ধনী নয়, আবার দরিদ্রও নয়; বরং সমাজে একটি ভারসাম্য রক্ষা করে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এই শ্রেণি সবসময় প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে শুরু হয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নেতৃত্ব দিয়েছে— ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সাংস্কৃতিক জাগরণ কিংবা জাতীয় আন্দোলন। কিন্তু বর্তমান সময়ে তারা সংকট ও টিকে থাকার সংগ্রামে লড়ছে। চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণি অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকা শক্তি হতে পারে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই করতে হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি কী?

সংজ্ঞা

মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলতে এমন এক সামাজিক গোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণির মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞাসমূহ:

  • এরিস্টটল: “মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন সমাজের নিয়ামক হয়, তখন সমাজ সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থায় থাকে।”
  • গ্রেটন: “সমাজের সেই শ্রেণিকে আমরা মধ্যবিত্ত বলি, যাদের জীবনের প্রধান নিয়ামক মুদ্রা।”
  • জাহাঙ্গীর আলম শোভন: সমাজের সমকালীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যারা মধ্যম মানে থাকে। সাথে তাদের যদি শিক্ষা ও নৈতিকতা থাকে তাহলে বাংলার সমাজে তারা মধ্যবিত্ত।

বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উৎপত্তি ও বিকাশ

ঔপনিবেশিক শাসন ও শিক্ষা প্রসার

ব্রিটিশ শাসনামলে আধুনিক শিক্ষা, প্রশাসন ও পেশার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম হয়। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতকে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এই শ্রেণির বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

  • ১৮১৬: হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা

  • ১৮৩৫: লর্ড বেন্টিঙের শিক্ষা নীতি প্রবর্তন
    এগুলো শিক্ষিত সমাজ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে সহায়ক হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)

লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উত্থান ঘটায়। জমিদারের সহযোগী ফড়িয়ারা অর্থে মধ্যবিত্ত হলেও শিক্ষার ঘাটতি ছিল; তবে তাদের উত্তরসূরিরা শিক্ষা লাভ করে প্রকৃত অর্থে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে।

নগরায়ণ ও চাকরিজীবী শ্রেণি

কলকাতাকে ব্রিটিশরা প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলায় চাকরিজীবী ও ব্যবসা নির্ভর মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। মধ্যবিত্তরা তাদের দৈনিন্দিন ব্যয় মিটিয়ে পত্রিকা পাঠ, সাহিত্য সভায় যোগদান ও থিয়েটারে যাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করে।

হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির অগ্রগতি

ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষায় অগ্রসর হয়ে দ্রুত প্রশাসন, ব্যবসা ও শিক্ষায় প্রভাব বিস্তার করে। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কর্মুচারীদের মধ্যে হিন্দুরা শিক্ষা দ্বারা একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে এবং তা তাদেরকে নগদ অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম করে তোলো।

মুলিমদের পশ্চাৎপদতা ও উন্নয়ন

প্রথমে মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষা ও প্রশাসন এড়িয়ে চলে। তবে নবাব আব্দুল লতিফস্যার সৈয়দ আহমদ-এর প্রচেষ্টায় উনিশ শতকের শেষভাগে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা মুসলিম মধ্যবিত্তদের বিকাশে ভূমিকা রাখে।

সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিকাশ

১৮১৮ সালে সমাচার দর্পণ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় শিক্ষিতদের মতপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সংবাদপত্র মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী সচেতন হয়ে উঠে এবং শিক্ষা তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠে। শিক্ষা থেকে তারা নৈতিকতাও অর্জন করে।

প্রশাসনিক চাকরি, বাণিজ্য ও ব্যাংকিং

সরকারি চাকরির সুযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির আত্মকর্মসংস্থান ও সামাজিক উত্থান নিশ্চিত করে। বৃটিশ আমলে চাকরিজীবি শ্রেণীর বিকাশ হলে পাকিস্তান আমলে রাজনীতিবিদ ও স্বাধীন বাংলাদেশে মধ্যবিত্তদের মধ্যে ব্যবসায়ী শ্রেণীর বিকাশও ঘটে।

নারী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ

ঊনবিংশ শতকে নারী শিক্ষার প্রসার, বাংলা সাহিত্য, নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক সত্তাকে শক্তিশালী করে। এ সময় নারীদের পত্রিকাও ভূমিকা রাখে। আগের প্রজন্মের শিক্ষিত বাবাদের  একটা অংশ তাদের মেয়েদের শিক্ষার জন্য এগিয়ে  আসে। নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ পরে পুরো মধ্যবিত্ত পরিবারে শিক্ষা ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটায়।

সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন

রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্ম সমাজ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারী শিক্ষা আন্দোলন—এসব উদ্যোগ মধ্যবিত্তকে সামাজিক সচেতনতার দিকে ধাবিত করে।  ইংরেজী ও ইউরোপীয় শিক্ষায় দেশে সচেতনতা তৈরী হলে সামাজিক সমস্যা সমাধানে অনেকগুলো সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠে। এসব আন্দোলন মধ্যবিত্তের বিকাশে ভূমিকা রাখে।

সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭)

সিপাহী বিদ্রোহের পর মুসলমানরা আরো বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়, ফলে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে তারা আবার নতুনভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যুক্ত হতে শুরু করে। ইংরেজী শিক্ষার ব্যাপারে মুসলমানদের অনীহা আস্তে আস্তে কাটতে থাকে। মুসলমানেরা শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে এই শ্রেণীর বিস্তার লাভ করাতে সক্ষম হয়।

রাজনৈতিক আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদ

১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), এসব সংগ্রামে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি ছিল। ছাত্রসমাজ এই আন্দোলনের মূল সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে রাজনীতি সচেতন হওয়া এবং মধ্যবিত্তের নেতৃত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আরো নতুন লোকদের তাদের সাথে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আগের চেয়ে বেশী হারে মধ্যবিত্ত তৈরী হয়। কৃষক ও শ্রমিকের সন্তানেরা লেখাপড়া করে তাদের পরিবারকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে নিয়ে আসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১৯২১)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্মে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাঙালী মধ্যবিত্ত, তথা মুসলিম মধ্যবিত্ত বা বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকাশের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণী শিক্ষিত হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার দরুন তাদের মধ্যে এক ধরনের নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়। এবং এই দায়িত্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ভূমিকা রাখে।

দেশভাগ (১৯৪৭) ও প্রভাব

দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের সামাজিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। হিন্দু অভিজাতরা কলকাতায় চলে যায়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলমানরা পূর্ববঙ্গে আসে। ব্যবসা ও ভূমির মালিকানা পরিবর্তন হয়। নতুন মুসলিম  লীগকেন্দ্রিক ভূমিসম্পদ মালিক শ্রেণি জন্ম নেয়। ব্যবসা, চাকরী ও নেতৃত্বে শিক্ষিত মুসলিম শ্রেণীর জায়গা তৈরী হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ উচ্চ পর্যায় লাখ করে।

আন্দোলন (১৯৪৮–১৯৫২)

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে মধ্যবিত্তদের জন্য সবচেয়ে অনুপ্রেরণা হলো ভাষা আন্দোলন। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও ছাত্রসমাজ ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। এর মাধ্যমে আত্মপরিচয়, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক চেতনায় মধ্যবিত্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন একদিকে বাঙালী মুসলিমদের মধ্যে একতা তৈরী করে অন্যদিকে। রাষ্ট্রভাষা দাবি আদায়ের অনুপ্রেরণা নতুন মধ্যবিত্তদের মাঝে আশার সঞ্চার করে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯৭১)

মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি নেতৃত্ব প্রদান করে। স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে তারাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারতবর্ষে অন্যতম সফল জাতি হিসেবে বাঙালী মুসলিমরা তাদের জন্য একটা আলাদা দেশ বানাতে পেরেছে। বলা বাহুল্য বাঙালী হিন্দুরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। এটা বিগত শতকের ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঘটনা। এবং বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য নজির। এই ঘটনা গোটা অঞ্চলের ভাগ্য রেখা বদলে যায়। ব্যাপারটা এমন যে, একসময়ের মধ্যবিত্তরা বাংলাদেশ পরবর্তী সময়ে উচ্চবিত্ত হয়েছে এবং আরো ব্যাপক নতুন মধ্যবিত্তের উন্মেষ ঘটেছে।

চীনে ১৯৭৮ সালের সংস্কারের পর মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়।১৯৯১ সালে ৪০% দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশাল মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হয়। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফলো (২০০৭) প্রমাণ করেন— মধ্যবিত্ত উদ্যোক্তা তৈরি করে, ভোগ বাড়ায় এবং সুশাসনের দাবি তোলে।