Buroc, Study, Research

প্রশাসনিক রাজতন্ত্র ও বাংলাদেশ

প্রশাসনিক রাজতন্ত্র ও বাংলাদেশ: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

১৭৫৭: নিরব দর্শকের যুগ

বাংলার স্বাধীনতার সূর্য যখন অস্তমিত হয়, সাধারণ জনগণ তখন মূলত নিরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে। রাজনীতি ছিল “রাজাদের কাজ”—প্রজাদের ন্যায় নয়। এই বিভাজন ছিল তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত সামাজিক-রাজনৈতিক মিথ, যেখানে শাসনকে জনগণের অংশগ্রহণের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছিল।

১৭৭৭: চেতনার উন্মেষ

দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে বাংলার মানুষ প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে যে রাজনীতি সরাসরি তাদের জীবন, মৃত্যু ও অস্তিত্বকে প্রভাবিত করে। এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় নানা বিদ্রোহ ও গণ-অসন্তোষ, যা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা করে।

১৮৫৭: রূপান্তরের সংগ্রাম

একশ বছর ধরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংগ্রামের পর মানুষ বুঝতে পারে যে আধুনিক অস্ত্র ছাড়া ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সিপাহী বিদ্রোহ ঐতিহাসিক ব্যর্থতা নয়, বরং সংগ্রামের এক ধাপ অগ্রগতি ছিল। এর পরবর্তী শতাব্দীতে ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে চলে যায়, যা শাসন কাঠামোকে আরও কেন্দ্রীভূত করে।

১৮৬১: প্রশাসনিক রাজতন্ত্রের আইনি ভিত্তি

এই বছর প্রণীত দণ্ডবিধি (পেনাল কোড ১৮৬১) আজও বাংলাদেশে বলবৎ। এই আইন তৈরির মৌলিক দর্শন ছিল সুদূর ব্রিটেন থেকে একটি উপনিবেশকে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র তৈরি করা। যেহেতু ব্রিটিশ রাজপরিবার বা সরকার সরাসরি এদেশে অবস্থান করবেন না, তাই তৈরি করা হয় এমন একটি আইনি কাঠামো যা একটি “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র” প্রতিষ্ঠা করে। এই ব্যবস্থায় বিচারক ও আমলাদের এমন ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয় যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। বাংলাদেশের বর্তমান আইন, বিচার ও সংবিধান এখনো সেই ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা বহন করছে।

১৯৪৭: উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা

ব্রিটিশরা শারীরিকভাবে চলে গেলেও রেখে গেল তাদের তৈরি ব্যবস্থা: আইন, নিয়ম, বিচার প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কাঠামো। অর্থাৎ, “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র” অক্ষত রয়ে গেল। পাকিস্তান রাষ্ট্র সেই একই টোনে লেখা আইনের পান্ডুলিপি দিয়ে শাসন চালাল। ফলাফল: বারবার বিপ্লব, অসন্তোষ ও যুদ্ধ।

১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধ ও অদৃশ্য কাঠামোর স্থায়িত্ব

আমরা মনে করলাম সমস্যার মূলে আছে পাকিস্তান। তাদেরকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিলাম, কিন্তু রেখে দিলাম সেই “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র”। সেই আইন, সেই বিচার ব্যবস্থা—তার সাথে মিলিয়ে লেখা হলো একটি নতুন ঘুমপাড়ানি গান, যার পোশাকি নাম “সংবিধান”। যদি আপনি কখনো শুনে না থাকেন যে “বাংলাদেশের সংবিধান প্রচলিত ঔপনিবেশিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক”, তাহলে আপনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন নন। বাস্তবতা হলো, সংবিধান সেই প্রশাসনিক রাজতন্ত্রকে আরও পোক্ত করেই প্রতিষ্ঠা করেছে।

১৯৯১: ভেতরের অপরিবর্তন

সব দোষ চাপানো হলো এরশাদের উপর। তাকে সরানোর পর কিছুটা ভালো মানুষ দিয়ে কিছুটা ভালো ফল পাওয়া গেল। কিন্তু সিস্টেম রয়ে গেল আগের মতোই। সে “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র” অব্যাহত থাকায় ৫২-এর সমস্যা ৫৩ হয়ে ফিরে এল।

২০২৪: প্রকৃত পরিবর্তনহীনতা

তুলনামূলক ভালো অবস্থার কিছু লক্ষণ দেখা দিলেও তা মৌলিক কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন নয়। এই অল্প অগ্রগতিকে নষ্ট করার জন্যও বিপুল বিনিয়োগ ও মনস্তাত্ত্বিক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও রয়ে গেছে সেই “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র”। ফলে ইতিহাসের চক্র আবারও পুনরাবৃত্তির দিকে এগোচ্ছে।

উপসংহার: গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে রাজতন্ত্র

যারা ক্ষমতায় আসেন, তারা যখন প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেন, তখন গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে আসলে একটি “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র” কায়েম হয়। রাজতন্ত্র নিজেই অপরিহার্যভাবে খারাপ নাও হতে পারে, কিন্তু যখন একজন অত্যাচারী ও নিকৃষ্ট শাসক গণতন্ত্রের পোশাক পরে হত্যা, খুন ও লুটপাট চালায়, তখন তার পালিত শেয়ালেরা অন্য গান শুনিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে রাখতে চায় মাত্র।

এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং একটি ইতিহাস-বহমান কাঠামোগত সমস্যা, যার শেকড় প্রোথিত আছে ঔপনিবেশিক আইন ও প্রশাসনিক দর্শনে। যতদিন না এই “প্রশাসনিক রাজতন্ত্র” এর মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা হচ্ছে, ততদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্ভব।

লেখাটি জাহাঙ্গীর আলম শোভনের নোট থেকে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরী।

ছবিও কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার তৈরী

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply