Slang, Narrative, Politics, Future

শাউয়া শব্দের অর্থ ও এর ব্যবহার

শাউয়া শব্দের অর্থ ও এর ব্যবহার

শাউয়া শব্দটি কোথায় কিভাবে উৎপত্তি হয়েছে সেটা বের করা কঠিন। কারণ এই শব্দ অভিধানে নেই বা আভিধানিক শব্দ নয়। এমনকি এটা মূলধারার বাংলা শব্দও নয়। এটা আঞ্চলিক শব্দ বটে।  তবে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে এই প্রজন্মের ছাত্র জনতা এটাকে রাজনীতিতে আমদানী করে রাজনীতির ভাষায় রুপান্তর করেছে। এটা নিয়ে চলছে চর্চা ও বিতর্ক। আমরা শব্দটি ও তার ব্যবহার নিয়ে যৎকিঞ্চিত আলোচনা রেখে যাবো। যাতে পরবর্তী কোনো চিন্তাশীল পাঠকের কাজে লাগে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলছে শাওয়া বা শাউয়া মূলত “শোয়া” থেকে বিকৃত রূপ| কিছু অঞ্চলে “শাউয়া” শব্দটি “শোয়া” (শুয়ে থাকা) শব্দের রূপান্তর। গালি হিসেবে ব্যবহারের সময় এটি বোঝাতে পারে— অলস / কাজকর্ম না করা ব্যক্তি বা সারাক্ষণ শুয়ে থাকা, অকর্মণ্য অথবা ঢিলেঢালা, দায়িত্বজ্ঞানহীন।  যেমন রাগ করে বলা হয়: “এই শাউয়া, সারাদিন কিছু করস না!” এখানে অর্থ দাঁড়ায়: অলস বা অকর্মণ্য লোক।

এছাড়া এর আরেক অর্থে বা কিছু ক্ষেত্রে শব্দটি অশালীন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। বাংলার লোকজ ভাষায় “শোয়া” শব্দটি কখনো কখনো অবৈধ সম্পর্ক বা যৌন আচরণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সেই সূত্রে “শাউয়া” বললে— চরিত্রহীন ব্যক্তি বা নৈতিকভাবে অধঃপতিত অবমাননাকর যৌন ইঙ্গিত। এই অর্থে এটি বেশি কটু ও অপমানজনক।

আরেকভাবে এটা  সামাজিক অবমাননার জন্য ব্যবহার হয়। কিছু জায়গায় এটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট অর্থ ছাড়াই অবজ্ঞা বা রাগ প্রকাশের শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়— মানে: “তুই একটা বাজে লোক” টাইপের সাধারণ অপমানসূচক শব্দ। এভাবে অনেক নিরপেক্ষ শব্দই লোকভাষায় গালিতে পরিণত হয়।

তবে কোনো কোনো এলাকায় “শাউয়া” শব্দটি মূলত বাংলার লোকজ ভাষায় ব্যবহৃত একটি কুরুচিপূর্ণ অশালীন স্ল্যাং, যা কিনা  নারীর অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল অঙ্গকে তাচ্ছিল্য অর্থে বোঝানো হয়। কেউ কেউ পুরুষের গোপন অঙ্গ বা দূর্বল অঙ্গ বা খারাপ অঙ্গ বোঝাতেও এটা ব্যবহার করে। সে অর্থে এটি ভদ্র শব্দ নয় বা ভদ্র সমাজে বা মজলিসে বলার মতো শব্দও নয়।

কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৫ বছরের দমন নিপীড়ন এর ফলে নির্যাতিত মানুষেরা বেশকিছু গালিকে প্রায় নিয়মিত করে ফেলেছে। নির্যাতনের মাত্রা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন প্রতিবাদের নতুন ভাষা এমনকি নতুন ভাষার গালি তৈরী হতে দেখা যায় বিশ্বজুড়ে এবং ইতিহাস জুড়ে। আমরা ইতিহাসে বেশকিছু গালি এভাবে পেয়েছি। যেমন

মীরজাফর: বিশ্বাসঘাতকতার চরমসীমা অতিক্রম করার কারণে  একজন বিশ্বাস ঘাতকের নাম থেকে গালির জন্ম হয়েছে।

রাজাকার: দালালীর চরমসীমা অতিক্রম করার কারণে। দালালদেরকে তাদের পেশাগত নামে ডাকা হয়। এবং এটি একটি গালিতে পরিণত হয়।

গোয়েবলেস: মিথ্যাকে এমন এরক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন এই ভদ্রলোক। ফলে এখন তার কাজ বা তার মতো মিথ্যাবাদকে শুধুমাত্র মিথ্যা দিয়ে প্রকাশ করলে সেটি আর যথার্থ প্রকাশ হয় না। তাই মিথ্যার নতুন নাম গোয়েবলেসীয় আর মিথ্যাবাদীর নতুন নাম গোয়েবলেস। এটা গালি।

হিটলার: স্বৈরশাসনকে হিটলার এমন হিংস্ররুপে নিয়ে গিয়েছেন এবং কিছু কিছু মানুষ এখনো সেটা করে। তাদের বোঝানোর জন্য যেমন হিটলারের নাম ব্যবহার করা হয়। তেমনি স্বৈরশাসকদের হিটলার বলে গালি দিতেও এর ব্যবহার হয়।

কিন্তু শাউয়া শব্দটি নতুন নয়। পুরাতন শুধুমাত্র এর ব্যবহারের মাত্রা বদলেছে। এটা অশিক্ষিত বা নিচুজাতের মানুষের খুব বিরক্তি এবং তাচ্ছিল্যের একটি অশ্লীল গালি। কিন্তু ওইযে, ফ্যাঁসিবাদী সরকার যখন লুট খুন গুম আর নানা অত্যাচারের মাত্রা অতিক্রম করেছে। তখন তার প্রতিবাদের জন্য গালির ভাষাও মাত্রা অতিক্রম করে গেছে।

অনেকের মতে মানুষ যখন অত্যাচারীর অস্ত্রের বিপরীতে অস্ত্র ধরতে পারে না তখন সে গালি দেয়। আর গালি দিতে দিতে যে যখন অতীষ্ঠ হয়ে যায় তখন সে নতুন গালি দেয় বা আগের চেয়ে খারাপ গালি দেয়। এই শব্দটি অনেকটা স্বাভাবিক গালি হয়ে গেছে। এটি রাজনীতির স্লোগানেও উঠে এসেছে ঠিক সেভাবেই।

বিশেষ করে পুলিশের উপর ক্ষোভ প্রকাশে তরুন প্রজন্ম এটি ব্যবহার করছে।

-টিনের চালে কাউয়া-পুলিশ আমার শাউয়া।

নারী পুরুষ সবার মাঝে এটি ব্যবহার হলেও অনেকে এর অর্থ জানে না। অনেকে জানে এটি কেবল তাচ্ছিল্য প্রকাশক  একটি শব্দ মাত্র। যারা এ ধরনের গালির বিপক্ষে তারা অবশ্যই শালীনতার পক্ষে। তারা মনে করেন পরিস্থিতি যাই হোক যা খারাপ তা খারাপই। কোনো পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে কোনো খারাপকে ভাল বা অন্যায়কে ন্যায় বলা ঠিক নয়।

আর যারা এর পক্ষে, বা এটাকে তেমন খারাপ মনে করেন না। তারা ইতিহাসের কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, এটা আসলে প্রতিবাদের ভাষা। প্রথম উদাহরণ: কবি রফিক আযাদের কবিতা

-ভাতদে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো। এছাড়া, তারা হুমায়ন আযাদ ও তসলিমা নাসরিনের উপন্যাসে বিভিন্ন ধরনের গালি বা স্ল্যাং ব্যবহারের কথা বলেন।

রয়েছে, নচিকেতার সে বিখ্যাত দেশাত্ববোধক গান, -‘‘হাসপাতালের বেডে টিভি রোগীর সাথে খেলা করে শুয়োরের বাচ্চা’’

আরো একটি বিষয় হলো, এই গালিটি যে সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। তারা এ ধরনের শব্দ বিরোধীদের জন্য ব্যবহার না করলেও। গুম খুনের সময় এবং পলিশি নির্যাতনের সময় মানুষকে অশ্লীলভাবে গালি দিতো। তারা মা বাপ ধরে নানা গালি দিতো। কোনো নির্দিষ্ঠ গালি ছিলো না।

গালির চেয়ে বেশী জঘণ্য ছিলো ফ্যাসিবাদী সরকারের আচরণ, খুন গুম, লুট ছাড়াও কিছু ঘটনা বাংলাদেশের সব নির্যাতনের ইতিহাসকে হার মানিয়েছে। যেমন-

* এক রাজনৈতিক নেতাকে বাসায় না পেয়ে ১ কিলোমিটার দূরে তার ভাইয়ের বাসা থেকে তার ভাতিজিকে ধরে নিয়ে যাওয়।

* একজন প্রতিবাদী স্ত্রীকে রোজা ভাঙিয়ে ধর্ষণ করা।

* সাতখিরা এলাকায় গ্রাম ধরে ১৯৭১ স্টাইলে নারীদের শ্লীলতাহানি করা।

* একটি রাজনৈতিক দলের নারী কর্মী এমনকি গর্ভবতী কর্মীদের উপর পাশবিক নির্যাতন করা।

* পিলখানা হত্যাকান্ডের সময় অফিসারদের স্ত্রীদের  রেফ ও খুন যাতে রয়েছে সরকারের কূটে কৌশলের দা।

আরো নানা চরম ঘটনা জনগনের ক্ষোভকে উসকে দেয়ার জন্য নানা উপাধি ও গালির জন্ম দিয়েছে। এমন কিছু চরম গালির নতুন ধরনের ব্যবহার হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো শাউয়া।

বাংলাদেশে দুটো পুরনো স্ল্যাং এখনো অনেক বেশী প্রচলিত একটি হলো ‘‘শালা’’ আরেকটি হলো ‘‘বাল’’। আজ আলোচনার জন্য লিখলেও আমি এগুলো শুনতে এবং কাউকে বলতে দেখলে খুব বিব্রত হই। যদিও বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে এমন আরো স্লাং রয়েছে। যেমন বাড়া, এগুলো খুবই বিব্রতকর। আমি এসবের প্রচলনের পক্ষে নই। খোদ ইংরেজীতে এফ দিয়ে যে শব্দটি ব্যবহার হয়। মনে হয় স্ল্যাং এর মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশী প্রচলিত এবং বেশী অশ্লীল।

বিশেষ করে “শাউয়া ছিঁড়ে ফালানোর” মতো হুমকি দেয়া, প্রতিবাদী কোনো মিছিলের স্লোগানে “শাউয়া” শব্দের ব্যবহার এর মাধ্যমে এই শব্দকে সহজ করে তোলার ঘোর বিরোধী আমি। যদি এর সত্যি অর্থ নারীর কোনো স্পর্শকাতর অঙ্গ হয়। তাহলে অবশ্যই তা নারীর প্রতি চরম অবমাননা। কিন্তু আমি যখন মেয়েদের হাতে এই শব্দ দিয়ে বানানো প্লেকার্ড দেখি তখন আমি বিভ্রান্তি হয়ে যাই। তখন মনে মনে বলি ‘‘ এই প্রজন্মকে আমি বুঝি না।’’

আমি শরীফ ওসমান হাদির ফ্যাসিবাদবিরোধী গালিতে এই শব্দের ব্যবহার সমর্থন করি না। কিন্তু একজন শরীফ ওসমান হাদীর জন্য আমি এটা ক্ষমা করে দিতে পারি। কারণ হাদীর হাজার হাজার ভালো উচ্চমানের, আদর্শিক ও পথ নির্দেশনামূলক কথার মধ্যে একটি কথার জন্য তার সকল অর্জন ও আদর্শ ভুল বা মিথ্যা বা দোষের হতে পারে না।

কারণ স্বাধীনতা পরবর্তী আমরা আরেকজন শরীফ ওসমান হাদী পাইনি। আমাদের ডা, মিলন, দেলোয়ার, নূর হোসেন, মাসুম, বিশ্বজিৎ, আবরার ফাহাদ, আবু সাইদ, মীরমুগ্ধ, ওয়াসিম, আনাস এরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের অবদান ও ত্যাগের গৌরবে উচ্চ মাকামে রয়েছে।

কিন্তু ওসমান হাদী সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। কারণ তার নিজস্বতা রয়েছে। তার স্বীয় আদর্শ রয়েছে। সে বলতে পারে ‘‘আমি নিজের শত্রুর সাথেও ইনসাফ চাই’সে বলতে পারে ‘‘আমাকে তোমরা যাই বলে অপবাদ দাওনা কেন আমাকে ‘‘ভারতের সেবাদাস না বললেই হয়’’। সূতরাং তার নিজের আদর্শ ছিল, নিজস্ব সংগঠন ছিল। সেই মনে একমাত্র ব্যক্তি যে জানতো সে শহীদ হবে এবং সে বলে গিয়েছিল ‘‘ একজন বিপ্লবীর মৃত্যু রাজপথে হওয়া উচিৎ। নিজের মৃত্যু সম্পর্কে বলেছে ‘‘ আমি ভীষনভাবে কামনা করি রাজপথে বুলেট এসে আমাকে বিদ্ধ করেছে’’। এটা হাদী কোনো সাধারণ রাজনীতিবিদ নয়। হাদী বাংলাদেশের চে গুয়েভারা। সে হয়তো বিপ্লবের বিজয় নিশান ওড়াতে পারেনি। কিন্তু বিপ্লবের বীজ রোপন করে গেছে। যা মহীরুহ আগামীর বাংলাদেশ জালিমের বিরুদ্ধে লড়াইতে শক্তি পাবে।

আমাদের একটা সিদ্ধান্ত হলো, বেশীরভাগ মত অনুসারে এটি অশ্লীল শব্দ। তাই এর ব্যবহার সমর্থনযোগ্য নয়। মজলুম তার উপর নির্যাতনের অতি ক্ষোভে এটা ব্যবহার করতে পারে। সেজন্য তার শাস্তি না হতে পারে কিন্তু এর ব্যবহার সমর্থন করা যায় না। যেমন সমর্থন করা ঠিক নয় পতিত ফ্যাসিবাদ শেখ হাসিনার অন্তবাস নিয়ে নোংরামি কিংবা শেখ মুজিবের মূর্তির মাথায় উঠে মূত্রত্যাগ করা।

আবার একই ভাবে এই শব্দ ব্যবহারে জন্য কারো ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক নয়। তবে কোনো মানুষ সব সময় এমন শব্দ ব্যবহার করে অবশ্যই তিনি গ্রহণযোগ্য হতে পারেন না। আবার এ ধরনের অতি নোংরা আচরণগুলো যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটায় সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।

হয়তো অন্যায়ভাবে গালি দিলে তার জন্য বেশী তিরষ্কার ও শাস্তি ও আর মজলুমের জন্য কিছু শিথিলতা থাকতে পারে। কিন্তু খারাপ খারাপ বলতে হবে। খারাপ কথা ভাল মানুষের মুখ দিয়ে বের হলে সেটা ভাল হয়ে যাবে না। এটাও মাথায় রাখতে হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply