ই-কমার্স ও আগামীর বাংলাদেশ

ই-কমার্স ও আগামীর বাংলাদেশ

ই-কমার্স ও আগামীর বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বিগত ১৫ বছরে ই-কমার্স সেক্টরটি বিভিন্নভাবে প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া ক্ষেত্রে সফল? এক্ষেত্রে মূল অর্জনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে একটি নতুন ব্যবসা খাত ও সেবা খাত হিসেবে ই-কমার্স জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই খাতে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ কর্মী এবং আরো ৪ লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কাজ করছে। এটা কর্মসংস্থানের দিক থেকে একটি মাইল ফলক।
করোনাকালীন সময়ে নিত্যপণ্য সচল রাখার ক্ষেত্রে অভাববনীয় সাফল্য ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এই খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীরা। গৃহে থাকা মানুষকে ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দিয়েছে। জরুরী পরিস্থিতি বিকল্প পণ্য হিসেবে আম. কোরবানি পশু ইত্যাদি বিক্রি করার সুযোগ করে দিয়ে একদিকে গ্রাহকে সেবা দিয়েছে অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসায়িক লেনদেন এর নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।
বিগত বছরে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত, ঝুকিপূর্ণ ও প্রতারণামূলক ব্যবসার মাধ্যমে যে পরিস্থিতি তৈরী করেছে। একদিকে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করেছে। যদিও প্রতারিত গ্রাহকদের বিশাল অংশের জন্য কিছুই করা যায়নি। শুধুমাত্র, গেটওয়েতে গ্রাহকদের আটকে থাকা টাকার মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে।
ডাক বিভাগে ই-কমার্স সেবা যুক্ত হয়েছে। বেসরকারী কুরিয়ার ও পার্সেল সার্ভিসেও ই-কমার্স সেবা গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে অন্তত ২শ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যারা শুধু ই-কমার্সের পণ্য ডেলিভারী দিয়ে থাকে।
পণ্য ছাড়াও সেবা পর্যায়ে ই-কমার্সের উন্নয়ন ঘটেছে। স্বাস্থ্যসেবায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ২ শতাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বিগত ২০২১—২২ সালের বাজেটে ই-শিক্ষার উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের পর এই উন্নতি ঘটে।
প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ লাখ লোক এই সেবা পাচ্ছে এবং বার্ষিক ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বাজারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৫-৭% লোক অনলাইনে কেনাকাটা করে। আমাদের যেহেতু ১৩ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাই আমাদের প্রায় ৪০% মানুষ নিয়মিত এবং ৭০% মানুষই চাইলে এই সেবা নিতে পারেন। এটা সম্ভব হয়েছে ইন্টারনেট স্মার্টফোন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে।
বর্তমানে ডিবিআইডি এর মাধ্যমে ই-কমার্স খাতের নিবন্ধন শুরু হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা তৈরী, কেন্দ্রীয় লজিস্টিক ও সাপ্লাইচেইন তৈরীর জন্য কাজ শুরু হয়েছে। যদিও এর কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এবং এর নিবন্ধন নিয়ে কতৃপক্ষ এবং নিবন্ধনকারী কারো অভিজ্ঞতা সূখকর নয়।
ইতোমধ্যে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ বাস্তবায়ন ছাড়াও ভোক্তা অধিকার আইন, ট্রেড লাইসেন্স আইন ও প্রতিযোগিতা আইন সংশোধন প্রস্তাবনা তৈরী করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল কমার্স কতৃপক্ষ আইন, ক্রস বর্ডার ই-কমার্স পলিসি ও লজিস্টিক পলিসি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

প্রস্তাবনা
আগামীর বাংলাদেশপ্রতিষ্ঠার জন্য অন্যতম হাতিয়ার হবে স্মার্ট অর্থনীতি তথা স্মার্ট বিজনেস। আর স্মার্ট বিজনেসের জন্য ই-কমার্সের বিকল্প নেই। তাই ই-কমার্সের যেসব বিষয়ে সরকারকে কাজ বা উন্নয়ন করতে পারবেন।
১। ই-কমার্সের নীতি পলিসি:
ই-কমার্সের জন্য নীতি ও পলিসি তৈরীর ক্ষেত্রে যুগোপযোগী বিষয় সম্পৃক্ত করা। এজন্য প্রাইভেট সেক্টরের মতামমের ভিত্তিতে পলিসি চূড়ান্ত করা এবং পলিসি ও আইন সমূহ ই-কমার্স বান্ধব করে তৈরী করতে হবে। ভোক্তার পাশাপাশি উদ্যোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
২। ই-কমার্সের জন্য ভৌত ও অভৌত অবকাঠামো তৈরী।
দেশের ই-কমার্সকে প্রান্তিক পর্যায়ে বিস্তৃতি করতে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে ডাক বিভাগ ও সরকারের অবকাঠামো ব্যবহার করে শর্টিং ও পিকিং সেন্টার তৈরী করা এবং সরকারী বেসরকারী অংশীদারিত্বে সেবার উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত ডিজিটাল অবকাঠামোগুলো কার্যকর ও বাস্তবায়ন করা।
৩। ক্রস বর্ডার ই-কমার্স
রপ্তানীমুখী ই-কমার্সের উন্নয়নে ক্রস বর্ডার পলিসি বাস্তবায়ন করে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের পণ্য সেবাকে আন্তজাতিক বাজারে প্রবেশের অধিকার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে। দেশীয় পণ্য সেবাকে বিদেশের বাজারে পৌঁছে দিয়ে বিদেশী মূদ্রা অর্জনের খাততে প্রসারিত করতে হবে। তাতে আগামী ২০২৫ সালে আইসিটি খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানী লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাবে।
৪। গ্রামীণ ই-কমার্সের উন্নয়ন
গ্রামে উৎপাদিত পণ্য সেবা শহরের ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিয়ে অর্থনীতি ভারসাম্য বজাতে সহযোগিতা করা। কৃষি ও কৃষি প্রযুক্তির সাথে ই-কমার্সের সংযুক্তি ঘটিয়ে ঘটিয়ে গ্রামের কৃষক ও গ্রামীণ নারীদেরকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা।

৫। অনলাইন পেমেন্ট
ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করতে আন্তজাতিক মানের পেমেন্ট সিস্টেম চালু ও বৈদেশিক পেমেন্ট সহজিকরণ করতে হবে। মোবাইল ফিন্যান্সিং সহজ ও নিরাপদ করে ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের পথ সহজ হবে। বাজেট ও করনীতি প্রণয়ন করতে হবে।

৬। ক্ষুদ্র, নারী, ছাত্র ও খন্ডকালিন উদ্যোক্তা
ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগ পাওয়ার পথ সুগম করতে হবে। প্রয়োজনে বর্তমান ঋণ নীতি ই-কমার্স বান্ধব করতে হবে। যাতে বিনিয়োগের পথ সুগম হয়।
৭। দক্ষ জনবল তৈরী
এই খাতে দক্ষ উদ্যোক্তা ও কর্মী তৈরী করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসে ই-কমার্সকে সংযুক্ত করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটেও ছোট ছোট কোর্স চালুর অনুমতি দেয়া যেতে পারে। এজন্য কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে কাজ করতে হবে।

৮। প্রয়োজনীয় গবেষণা ও সমীক্ষা
ই-কমার্স খাতে প্রয়োজনীয় নীতি পলিসি তৈরী করার জন্য গবেষণা ও সমীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে অলাভজনক সংস্থার গবেষণা তহবিলে প্রদানকৃত অর্থ কররেয়াত দেয়ার মাধ্যমে সরকার নিজে অর্থ বিনিয়োগ না করে এই খাতের গবেষণা কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply