Women Byuer

বিদেশে শ্রমিক ও কর্মীপ্রেরণ এ সংক্রান্ত সমস্যা ও সমাধান

বিদেশে শ্রমিক ও কর্মীপ্রেরণ

আমাদের দেশের অর্থনীতি যে দুটি মুল ভিত্তির উপর বিকশিত তার একটি হলো রেমিটেন্স যা আমাদের প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধারা পাঠান। এই খাতে যত অনিয়ম গত ৫০ বছর ধরে শুনে আসছি। সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ খুবই বিরল ঘটনা। প্রবাসীদেরকে অবহেলা সরকার আর দূতাবাসের যে গল্পটি। প্রতিটি ঘটনা প্রকাশ করতে হলে শুধু এই বিষয়ে আলাদা কয়েকটি পত্রিকা লাগবে। আর প্রবাসীদের প্রতিনিয়ত ঠাকানো, প্রতারণা, বাড়তি অর্থ আদায়, অসম্মান এমনকি একটি মরদেহ যে অসম্মান পায় সে কথা আর যারা দু’য়সা কামিয়ে পরিবারের আর্থ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে নি তাদের দূ:খতো পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জলে ধুয়ে শেষ করা যাবে না।
পাশাপাশি আদমের নানা গল্প সেই সাথে ভূয়া সনদ, ভূয়া প্রশিক্ষণ, ভূয়া মেডিক্যাল আর মিথ্যা অভিজ্ঞতার গল্পগুলোও আছে। আর আছে অপেশাদার আচরণ নানা আইন না মানা এবং অনিয়মের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর ফলে আমরা মাত্র ৪০টির মতো দেশে ভিসা ছাড়া যেতে পারি, এখনো অনেকগুলো দেশে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ। আর আমাদেরকে যে অবহেলা অবজ্ঞা করা হয় সেসবতো লিখে শেষ করা যাবে না।
আচ্চা আমরা যখন জানি আমাদের সমস্যা কি? কেন আমরা এগুলো নিয়ে আলোচনা ও পদক্ষেপ এর মাধ্যমে এর সমাধান করি না। আমরাতো চাইলে এটার সমাধান সম্ভব। আসুন ধাপে ধাপে আলোচনা করা যাক।
অদক্ষ শ্রমিক সমস্যা
১। আমরা শ্রমিক প্রেরণের সময় দক্ষ অদক্ষ চিহ্নিত করে পাঠাতে পারি। আমরা বিদেশ গমনের জন্য নিবন্ধন চালু করে তাদেরকে গ্রেডেশান করতে পারি। এজন্য সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মূল্যায়ন করতে পারি।
২। আমরা অদক্ষ ব্যতিত স্বল্পদক্ষ, কর্মদক্ষ, মাঝারী দক্ষ ও সুদক্ষ সকল কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে পারি। সরকার নানা ভাতা দিতে পারে।
৩। সরকার চাইলে যাদের পাসপোর্ট ও বিদেশগমন নিশ্চিত বা নিবন্ধন হয়েছে। তাদেরকে ভূর্তকি পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ এর ব্যবস্থা করতে পারে।
৪। প্রতিটি নাগরিকের জন্য কোনো না কোনো কাজ শেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এবং সাধারণ শিক্ষার সাথে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে কোনো একটা জীবনমূখী শিক্ষা যুক্ত করতে হবে। এজন্য কোনো শিক্ষক এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সম্পৃক্ততা রাখা যাবে না। স্কুল কতৃপক্ষ পেশাজীবিদের দ্বারা শেখাবে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বা সরকারী প্রতিষ্ঠান শুধু পরীক্ষা নিয়ে সনদ দিবে।
৫। স্কুল পর্যায়ে ভাষার মৌখিক ও ব্যবহারিক মার্ক যুক্ত করতে হবে। স্কুল পর্যায়ে শুদ্ধ বাংলা চর্চা ও ইংলিশ স্পিকিং চালু করতে হবে। কলেজ পর্যায়ে কয়েকটা তৃতীয় ভাষা রাখতে হবে। এগুলোর শিক্ষক নিয়োগের কোনো বিধি থাকবেনা যোগ্যতাও থাকবেনা। শিক্ষকের কাছে শেখাও বাধ্যতামূলক থাকবেনা। শুধু অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়ে সনদ নিতে হবে। (আইইএলটিএস এর মতো)
৬। শ্রমিক বাছাইতে ইন্টারভিউ এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি তৃতীয় কোনো এজেন্সিকে দিয়ে করাতো যেতে পারে। যেভাবে ভিএফএক্স বিভিন্ন দেশের ভিসার কাজ করে।
৭। ক্ষেত্রে বিশেষে বিভিন্ন গ্রেডের প্রশিক্ষন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৮। আবাসিক প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে।
৯। প্রতিটি প্রবাসী বা যেকোনো প্রশিক্ষণ এর সাথে আচরণ ও ভাষা অন্তভূক্ত করা যেতে পারে।

রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা রোধ

১) যেকোনো অভিযোগ প্রমাণে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের বিধান করতে হবে।
২) রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য জামানতের বিধান আরো শক্ত করতে হবে।
৩) রিক্রুটিং এজেন্সির বাড়তি টাকা নেয়া বন্ধ করতে হবে। সরকারের নির্ধারিত ফরম দ্বারা এই ফি নেয়ার বিধান চালু করতে হবে। প্রয়োজনে তাদেরকে ট্যাক্স ভ্যাট সুবিধা দিতে হবে।
৪) রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেয়া বাধ্যতা রাখা যাবে না।
৫) রিক্রুটিং এজেন্সির রেটিং ও গ্রেডেশান চালু করতে হবে। একেক ধরনের এজেন্সিকে একেক পেশার লোক প্রেরণের জন্য নিয়োগ করতে হবে। যেসব এজেন্সির ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থাকবে তাদেরকে অগ্রাধিকর দিতে হবে।

দূতাবাসের সেবা

১) দূতাবাসে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে। যে দেশে যে ধরনের প্রয়োজন। কোথাও বিজনেস কাউন্সিলর, শিক্ষা কাউন্সিলর বা ছাত্র কাউন্সিলর, সাংস্কৃতিক কাউন্সিলর, শ্রমিক বা মানবাধিকার কাউন্সিলর, দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক কাউন্সিলর ইত্যাদি।
২) দূতাবাসের সেবা মনিটরিং এর জন্য কমিটি বা মনিটরিং সেল থাকতে হবে।
৩) দূতাবাসে সেবা না পেলে দেশের দপ্তরে তাৎক্ষনিকভাবে যোগাযোগ করার মাধ্যম থাকতে হবে।
৪) প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রে কতসময়ের মধ্যে সাড়া দেবে এবং প্রবাসির ইস্যুতে কত সময়ের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পিত্তি করবে যতগুলো সেবার ক্ষেত্রে সম্ভব টাইম ফ্রেম ঠিক করে দিতে হবে।
৫) দূতাবাসে নিয়োগের ক্ষেত্রে, যোগ্যতা, আন্তরিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, আচরণ ও অতীতে সামাজিক কাজের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
৬) অভিযুক্তদের দ্রুত প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করতে হবে।

আধূনিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা

১) ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এর গ্রেডেশান ও রেটিং চালু করতে হবে।
২) কারিগরি শিক্ষা পদ্ধতির বর্তমান প্যাটার্ন ভেঙ্গে নতুন কাঠামো তৈরী করতে হবে।
৩) কারিগরি ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে ১/২জন বা ১০-২০% শিক্ষক নিয়মিত থাকবে। বাকীরা নিয়মিত শিক্ষক হবেন না। তারা হবেন পেশাজীবি।
৪) প্রতিটি কারিগরি শিক্ষায় ব্যবহারিক ও ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। কোনো কোম্পানীতে সুযোগ না হলে সেল্প ইন্টার্ণশিপের অপশন রাখতে হবে ক্ষেত্র বিশেষে।
৫) ব্যবহারিক পরীক্ষায় আলাদাভাবে পাস করার বিধান থাকতে হবে।
৬) প্রতিবছর সিলেবাস এবং শিক্ষক তালিকা নতুন করতে হবে।
৭) ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। ৫-১০% বিদেশী প্রশিক্ষক অনুমোদন দিতে হবে।
৮) বিদেশী ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে জমি পেতে সহযোগিতা করতে হবে। এবং বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
৯) প্রশিক্ষণ খাতে স্কলারশিপ চালু করতে হবে। সকলের জন্য প্রশিক্ষণ ফ্রি না করে যারা ভাল করবে তাদেরকে ভাতা দিতে হবে।
১১) স্কুল পর্যায়ে ৬ মাসের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট কোর্স চালু করতে হবে। কলেজ পর্যায়ে ১ বছরের ডিপ্লোমা ও হার্ডস্কিল কোর্স চালু করতে হবে। যা সার্টিফিকেট পরীক্ষার পরে থাকবে। এবং কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে প্রয়োজনে উপবৃত্তি চালু করতে হবে।
১৩) স্বল্পশিক্ষিতদের জন্য বিশেষ কোর্স ডিজাইন করতে হবে। সেসব কোর্স এর সাথে ভাষা ও আচরণ যুক্ত করতে হবে।
১৪) প্রবাসী বাংলাদেশী অর্থায়ন ও বিনিয়োগে সহজশর্তে জেলা উপজেলা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য নীতি ও বিভাগ চালু করতে হবে। প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যান্য
১) রেমিটেন্স এর পরিমাণ এর উপর বিশেষ উপাধি দিতে হবে। স্তরভিত্তিক উপাধিসমূহ ঠিক করতে হবে।
২) প্রবাসিদের জন্য বিশেষ পেনশন স্কিম চালু করতে হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply