স্টিফেন হকিং এর সময়ের সংক্ষিপ্ত বয়ান
image : collected

স্টিফেন হকিং এর সময়ের সংক্ষিপ্ত বয়ান

“সময় ও মহাবিশ্বের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”

বই: A Brief History of Time

লেখক: স্টিফেন হকিং

প্রকাশকাল: ১৯৮৮

বিষয়: সময়, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, কৃষ্ণগহ্বর, মহাকর্ষ, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম মেকানিক

ভাষা: বাংলা, স্প্যানিশ, ফরাসি, জার্মান, চীনা, জাপানি, আরবি ইত্যাদি ভাষা।

আমাদের অনেকের মধ্যেই মহাবিশ্ব নিয়ে এক ধরনের স্বভাবজাত কৌতূহল কাজ করে—এই বিশাল সৃষ্টি কিভাবে হলো, এর শুরু কোথায়, শেষ কোথায়? আমি নিজেও বরাবর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছি। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক এসব জটিল প্রশ্নকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তোলার দুঃসাহসিক ও দূরদর্শী প্রয়াস যে একটি বইয়ে এত সুন্দরভাবে উঠে আসতে পারে, তা প্রথম বুঝেছিলাম স্টিফেন হকিংয়ের লেখা  A Brief History of Time  পড়ার পর। শুধু বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকদের নয়, সাধারণ পাঠকদের মাঝেও বইটি অসাধারণ সাড়া জাগিয়েছে।

লেখক পরিচিতি:

স্টিফেন হকিং ছিলেন আধুনিক যুগের অন্যতম প্রতিভাবান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান প্রফেসর ছিলেন—একসময় যে পদে ছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। হকিং তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—এএলএস রোগের কারণে মোটর নিউরন সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে যাওয়ার পরও গবেষণা থামাননি। তিনি হুইলচেয়ারে বসে, কৃত্রিম কণ্ঠে কথা বলে বিশ্বকে দেখিয়েছেন, শারীরিক অসুস্থতা কখনো মেধাকে থামিয়ে দিতে পারে না।

কোন পরিস্থিতিতে বইটি লেখা হয়:

১৯৮৮ সালে যখন A Brief History of Time প্রকাশিত হয়, তখন হকিংয়ের শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তবুও তিনি সাধারণ মানুষকে জটিল পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেওয়ার এক অসম্ভব প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বইটি লেখার সময় তিনি মোটেও ভাবেননি এটি একটি বেস্টসেলার হবে। বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—সাধারণ মানুষ যেন ‘টাইম, স্পেস, বিগ ব্যাঙ ও ব্ল্যাক হোল’ সম্পর্কে সহজভাবে জানতে পারে।

বইটির বিষয়বস্তু:

A Brief History of Time মূলত সময়, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, কৃষ্ণগহ্বর, মহাকর্ষ, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম মেকানিকসসহ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে লেখা। হকিং চেষ্টা করেছেন—জটিল গণিত বাদ দিয়ে, যুক্তি ও সহজ উদাহরণ দিয়ে এসব বিষয়ের গভীরতা বোঝাতে।
বইটিতে রয়েছে এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর, যা যুগে যুগে মানুষ ভাবছে—

  • মহাবিশ্বের শুরু কিভাবে?
  • সময় কি অনন্ত?
  • কৃষ্ণগহ্বর থেকে কি আলো বের হতে পারে?
  • কি ছিল বিগ ব্যাঙের আগে?

বিখ্যাত ব্যক্তিদের মন্তব্য:

বইটি প্রকাশের পরপরই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। কার্ল সাগান, যিনি ভূমিকাও লিখেছেন, বলেন, “এই বইটা মানুষকে বিজ্ঞান বুঝতে শেখাবে, এবং জানাবে আমাদের অবস্থান কোথায় এই মহাবিশ্বে।”
নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিনসহ বিশ্বখ্যাত সব পত্রিকা বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে।

বিক্রির দিক থেকে বইটির সাফল্য:

বইটি প্রকাশের প্রথম বছরেই মিলিয়ন কপির উপর বিক্রি হয়। একটানা ২৩৭ সপ্তাহ নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় ছিল—এটা একটা রেকর্ড! এখন পর্যন্ত ৪০টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং প্রায় ২৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। এটি শুধু একটি বিজ্ঞান বই নয়, বরং সাধারণ পাঠকের জন্য বিজ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া এক অসাধারণ প্রকাশনা।

জীবনে এর শিক্ষা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ:

আমার কাছে এই বইটি শুধু মহাবিশ্বের তথ্যই দেয়নি, বরং জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে দিয়েছে। হকিং আমাদের শিখিয়েছেন—জটিলতার মাঝেও সরলতা খুঁজে পেতে হয়, আর বিশ্বাস রাখতে হয় জ্ঞানের শক্তিতে।
যাঁরা বিজ্ঞান পড়েন, তাঁদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। তবে যাঁরা বিজ্ঞানের ছাত্র নন, তাঁরাও যদি মহাবিশ্ব নিয়ে একটু কৌতূহলী হন, তাহলে এই বই তাঁদের জ্ঞানের জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

A Brief History of Time কেবল একটি বিজ্ঞান বই নয়—এটি এক মনোজাগতিক যাত্রা। যারা জানতে চান আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি—তাঁদের জন্য এই বই একটি শ্রেষ্ঠ উপহার। পাঠ শেষে আপনার মনে হবে—আপনি কেবল বিজ্ঞান শেখেননি, বরং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন।

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply