Chattagram Day

২৫ এপ্রিল হোক চট্টগ্রাম দিবস

২৫ এপ্রিল হোক চট্টগ্রাম দিবস

চট্টগ্রাম—বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, প্রাচ্যের রানী এবং দেশের একমাত্র সমুদ্রবন্দরের শহর। এই মহানগরীর ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো, কিন্তু আধুনিক চট্টগ্রামের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ শুরু হয় ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল। এই দিনে চট্টগ্রাম বন্দর কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা । এই দিনটিকে “চট্টগ্রাম দিবস” হিসেবে ঘোষণা করার  দাবীর পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।

চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিকো-রোমান মানচিত্রকার ক্লডিয়াস টলেমির আঁকা মানচিত্রে এই বন্দরটি পূর্ব বিশ্বের অন্যতম সেরা বন্দর হিসেবে চিহ্নিত ছিল 1। নবম শতাব্দী থেকে আরব বণিকরা এখানে বাণিজ্য করতে আসতেন, যারা একে “শাত-উল-গঙ্গ” বা গঙ্গার বদ্বীপ নামে ডাকতেন । ১৫১৭ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে আসে এবং বন্দরটিকে “পোর্টো গ্র্যান্ডে” বা বিশাল বন্দর নামে অভিহিত করে ।

ব্রিটিশ আমলে বন্দর উন্নয়নের সূচনা

ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে ইংরেজ ও দেশীয় ব্যবসায়ীরা বার্ষিক মাত্র এক টাকা সেলামির বিনিময়ে নিজ ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীতে কাঠের জেটি নির্মাণ করেন । ১৮৬০ সালে প্রথম দুটি অস্থায়ী জেটি নির্মিত হয় । কিন্তু বন্দরটির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে আরও কয়েক দশক সময় লেগেছিল।

১৮৮৭-১৮৮৮: বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বছরগুলো

১৮৭৭ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার গঠিত হয় 1। ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট প্রণয়ন করে 3। এরপর ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল এই অ্যাক্ট কার্যকর হয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে 13। এই দিনে দুটি মুরিং জেটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় 1

২৫ এপ্রিল ১৮৮৮-এর তাৎপর্য

এই তারিখটি চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কারণ:  এদিনই প্রথমবারের মতো বন্দরটি একটি সংগঠিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে ।  আধুনিক অবকাঠামো বলতে দুটি মুরিং জেটি চালু হওয়ায় বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসে।  এই বন্দরের মাধ্যমে ব্রিটিশ বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সাথে ব্যস্ত বাণিজ্য শুরু হয়, বিশেষ করে আকিয়াব ও রেঙ্গুন বন্দরের সাথে । ১৮৮৯-৯০ সালে বন্দরটি মোট ১,২৫,০০০ টন রপ্তানি পরিচালনা করে 1

 ব্রিটিশ আমলে বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয় এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার “চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট” পাস করে । ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল এই আইন কার্যকর হয় এবং এটি ছিল চট্টগ্রামকে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম ধাপ। 

১৮৮৮ সালের পর চট্টগ্রাম বন্দর ব্রিটিশ বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সাথে ব্যস্ত শিপিং লিঙ্ক স্থাপন করে, যা বাংলার অর্থনীতিকে নতুন গতি দেয়। ১৮৯৯-১৯১০ সালের মধ্যে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ এবং ১৯১০ সালে রেলওয়ে সংযোগ স্থাপিত হয়, যা বন্দরের গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রামকে “মেজর পোর্ট” ঘোষণা করে, যা এটিকে উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করে।   প্রতি বছর ৩০-৩২ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার সক্ষমতা নিয়ে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ততম বন্দরে পরিণত হয়েছে আজ।

চট্টগ্রাম দিবস ঘোষণার যৌক্তিকতা

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের ৯২% বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ততম বন্দর। এটি দেশের জিডিপিতে বিশাল অবদান রাখে, যা চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে পরিণত করেছে।

২৫ এপ্রিল শুধু একটি বন্দরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, এটি চট্টগ্রামের আধুনিকায়নের সূচনাকাল। প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ “বন্দর দিবস” হিসেবে পালন করে থাকে 3, যা ইতিমধ্যেই একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

চট্টগ্রাম শুধু একটি বন্দর নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণার স্থান (কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র)। শহরটির নামকরণের ইতিহাস (আরাকানি রাজার “চেৎ-ত-গৌঙ্গ” শিলালিপি) এবং এর সংগ্রামী অতীত (সূর্য সেনের বিপ্লবী আন্দোলন) এটিকে জাতীয় ইতিহাসের অঙ্গীভূত করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বব্যাপী “গেটওয়ে টু বেঙ্গল” হিসেবে পরিচিত 8। ২৫ এপ্রিলকে দিবস হিসেবে পালন করলে এর বৈশ্বিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।

১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। এই দিনটি শুধু একটি বন্দরের জন্মদিন নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তাই সরকারীভাবে ২৫ এপ্রিলকে চট্টগ্রাম দিবস ঘোষণার দাবী তুলুন।  এই দিনে চট্টগ্রামবাসী একতা ও উন্নয়নের শপথ নিন। নিজস্ব কৃষ্টি কালচারগুলোকে তুলে ধরুন।

-জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply