জুলাই আন্দোলনের কিছু বিষয়
জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব ঘুরছে, এটা স্বাভাবিক। যেকোনো বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ থাকে না, বরং বিভিন্ন ক্ষোভ, অবিচার, ভুল সিদ্ধান্ত ও সামাজিক চাপের সমষ্টি বিস্ফোরণ ঘটায়। ইতিহাসে দেখা যায়—যেমন ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক অন্যান্য দেশের গণজাগরণ—সব ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসন্তোষ জমে একসময় বিশাল রূপ নিয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমার কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ হলো দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনা, রাষ্ট্রীয় দমননীতি, খুন-গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন, এবং তরুণ প্রজন্মের হতাশা। বিদেশি প্রভাব, দলীয় ষড়যন্ত্র বা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা—এসব হয়তো “অতিরিক্ত অনুঘটক” হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু মূল চালিকা শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ ও তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভ।
এখানে কি কি তত্ব কাজ করেছে। মানে এটা নিয়ে মার্কেটে যেসব কথা রটেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করা যাক:
১. ভোটাধিকার তত্ব:
বাংলাদেশ সরকার বিগত ৩ টি নির্বাচনে জনগনকে ভোট দিতে দেয়নি। ৫০ লাখ মানুষকে জেল জুলুম এবং ৫ হাজার মানুষকে হত্যার পর কোটা বিরোধী আন্দোলন এক হাজারের বেশী নিহত পর জনগন ধৈর্য্যহারা হয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কাউকে নামাতে হয়নি।
২. মানুষ খুন তত্ব
সরকারের কয়েকটি হত্যাকান্ড যেমন পিলখানা ৫৭ সেনা অফিসার হত্যা, শাপলা চত্বর ৩শ আলেম হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কতৃক দর্জি বিশ্বজিৎ হত্যা, বুয়েটে ছাত্রলীগ আবরার ফাহাদ হত্যা, ক্যাঙারু কোর্ট মাধ্যমে জামায়াতের ১১ নেতার জুডিশিয়াল কিলিং, ও এক হাজারের বেশী মানুষকে গুম করে হত্যার ঘটনায় সচেতন কিছু মানুষ গোপনে সরকারের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলনের রুপরেখা তৈরী করেছে। তারা শুধু অপেক্ষা করছিল কারো নেতৃত্বে সরকার বিরোধী আন্দোলন হলে তাকে সফল করে তুলবেন তারা।
৩. আমেরিকার ষড়যন্ত্র তত্ব
সরকার ও তাদের দলের লোকজন প্রকাশ্যে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূতকে কেটে হাস দিয়ে খাওয়ানোর কথাও বলেছে। এতে করে আমেরিকা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকারের পতন ত্বরান্বিত করেছে।
৪. প্রাসাদ ষড়যন্ত্র তত্ব
আওয়ামী লীগের ভেতর একটি গোপন সংষ্কারপন্থী গ্রুপ আছে। তারা মনে করেছে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন দরকার। সেজন্য শেখহাসিনার পতন হতে হবে। এজন্য তারা দলকে ভুলপথে পরিচালিত করেছে। যাতে হাসিনা রেজিমের অবসান ঘটে।
৫. শেখ রেহানা তত্ব
শেখ হাসিনার ছোটবোন এর ইচ্ছে ছিল শেষবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার। কিন্তু হাসিনা শেখ রেহানাকে ক্ষমতায় বলয়ে আনতে চায়না। তাই যারা শেখ রেহানার বলয়ের মধ্যে ছিল। তারা পুরো ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তাদের ধারণা ছিল হাসিনা পঁচে গেলে ফ্রেশ আওয়ামী লীগ দিয়ে নতুন করে দল গঠন করে তারা আবার বছরখানেক পর ক্ষমতায় ফিরবে। বলা হয়, এটা হাসিনা আগে একবার টের পেয়ে এই দলের নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে শায়েস্তা করেছিল। পরে মুচলেকা নিয়ে আবার ছেড়ে দেয়।
৬. নেতৃত্ব ও ঐক্য
বাংলাদেশে যখন কোনো সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দেয়। আর সে বিষয়ে সর্বদলীয় সমর্থ থাকে এবং জনসাধারণ অংশগ্রহণ থাকে। তাহলে আন্দোলন এমনিতে সফল হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। একে অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা করার উপায় নেই।
৭. তারুন্যের জোয়ার তত্ব
বিশেষ করে বাংলাদেশে ৬৫% তরুন। যারা বিগত ১৫ বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এই ক্ষোভের বিষ্ফোরণ সেটা স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা ছিল। যা হওয়ার তাই ছিল।
৮. জামায়াতের গুপ্ত রাজনীতি তত্ব
যেহেতু জামায়াতকে সরকার প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে দিচ্ছে না। তাই জামায়াদের লোকজনের গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার পতিত হয়।
৯. হাসিনার চোর ও খুনি তত্ব
যেহেতু হাসিনা দল ও সরকারে যারা খুন করতে পারে এবং লুট করে পার্টি তহবিলে অর্থ দিতে পারে। সেহেতু দল ও সরকারে খুন ও লুটের একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যখনি কোটা আন্দোলন আসে তখনি পুলিশের একটা অংশ এবং দলের সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে হামলে পড়ে সাধারণ জনগনের উপর। যখন দলমত নির্বিচারে খুন হচ্ছে তখন সাধারণ জনগন মাঠে নামে। কারণ সরকারী হত্যকান্ডে নিহতদের ৭০% সাধারণ যারা কোনো দলের নয়। ৬৫% মাথায় গুলি করে মারা হয়েছে। ১৬৭ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। রয়েছে ১০ বছরের নিচের শিশু। রয়েছে শত শত মাদ্রাসার ছাত্র। এমনকি ৯ জন সংখ্যালঘু হিন্দু। শুধু তাই নয় সবুজ নামের এক আন্দোলনকারী হত্যা করে ছাত্রলীগের কর্মী বানিয়ে নোংরা রাজনীতিও আওয়ামী লীগ করেছে।
১০. নির্যাতীতদের বিশাল সংখ্যা তত্ব
খুন, গুম, হত্যা, মামলা হামলার কারণে লাখ লাখ পরিববার ক্ষতিগ্রস্থ তারা আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছিলনা। তাই ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটেছে।
১১. ২৪/২৫ বছর তত্ব
পাকিস্তানের ২৪ বছরে যে বাংলার মানুষ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে। তারাই পাকিস্তানকে ছুড়ে ফেলেছে। আওয়ামী লীগের ২৪ বছর (১৯৭২-১৯৭৫=৪ বছর+৯৬-২০০১=৫ বছর+২০০৮ থেকে ২০২৪=১৬ বছর== মোট = ২৫ বছর) এই সময়ে মানুষ আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডের কারণে তাদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে দিয়েছে।
১২. ছাত্রদের সততা তত্ব
জনগন আসলে জুলুম নির্যাতনে অতীষ্ঠ হয়ে অপেক্ষা করছে। কখন একটি দল এসে তাদেরকে ঘর হতে বের হয়ে জালিমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়তে বলবে। জনগন যখন দেখলে েএখানে প্রথমে ৬ টি ছেলে ও পরে ১৫৭ জনের একটি কমিটি করেছে। তাদের ঘুম, জিম্মি টাকা দিয়ে আন্দোলন থেকে সরানো যায়নি। তখন জনগন মনে করলো এবার এমন কাউকে পাওয়া গেছে যাদের উপর ভরসা করা যায়।
১৩. ২০১৮ সালের সফল আন্দোলন তত্ব
২০১৮ সালে যখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়। তখন স্কুলের বাচ্চারা ১৭ দিন ঢাকার রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়। কিন্তু সরকার বলপ্রয়োগ না করে বুদ্ধিমানের পরিচয় দেয়। সেদিনের স্কুলের বাচ্চারা ২০২৪ সালে েএসে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে। তাদের সে আত্ম বিশ্বাস ও একটা এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। সে সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকড সংখ্যক নারী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে খালি হাতে পুলিশের গুলির সামনে অনবরত ৩৬ দিন ধরে লড়াই চালিয়ে যায়। যা এই ফলাফল এনে দেয়।
১৪. জেনারেশন জি তত্ব
এই আন্দোলন মুলক জেনারেশন জি এর বহি:প্রকাশ। শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জেনজিরা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন করেছে এবং করবে। কারণ এরা হলো ইন্টারনেট প্রজন্ম এরা অবাধ তথ্যপ্রবাহ দেখে বড় হচ্ছে। তারা স্বাধীনতা চায়। তাদের এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে তারা তা মেনে নিবে না।
১৫. নাগরিক সাংবাদিকতা তত্ব
নাগরিক সাংবাদিকতা এক নতুন বিপ্লব এনে দিয়েছে। তরুনদের যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ছিল। কিন্ত ইউটিউবার অনুপ্রেরণাদায়ী কয়েকজন ব্যক্তি তাদেরকে অনুপ্রাণীত করেছে। তাদের সাধারণ দাবী আদায়ের আন্দোলনকে তারা সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত নিয়ে গেছে।
১৬. ঘুণে ধরা কাঠামো তত্ব
আসলে শেখ হাসিনা যে নীতিতে দেশ ও সরকার চালিয়েছে। তাহলে তুমি চুরি কর অন্যায় কর আমি কিছু বলবনা। তুমি শুধু আমার ক্ষমতাকে সমর্থন কর। তাহলে আমি তোমার সব কাজ বৈধতা দেব। ন্যায় বিচারের বদলে হাসিনাচার থিয়রীতে দেশ চলছে। মানে যে হাসিনাকে সমর্থন দিবে তার ২২ খুন জায়েজ। (২২জন প্রমাণিত খুনীর ফাসির আদেশ বাতিল করেছে তারা) ফলে রাষ্ট্র ও সংগঠন এর ভেতরে সবকিছু ঘুনে খেয়ে কেবল কংকাল দাড়িয়ে ছিল। আর একটি ঝড়ে সেটিও ভেঙ্গে গিয়েছে। যেহেতু সব গুনে খেয়ে ফেলেছে বাকী ছিল শুধু কাঠামো। আর ভেঙ্গে পড়ার সাথে সাথে সে কাঠামো ভেসে গিয়েছে জনতার স্রোতে। ছাত্র জনতার প্রতিরোধে পালিয়েছে সরকার ও দলের নিপীড়কেরা।
১৭. রাশি ও সংখ্যা তত্ব
বাংলাদেশে এই শতকে প্রতি ১৯ বছর পর পর পরিবর্তন আসে। ২০২৮ সালে আসবে সে কাংখিত ও চূড়ান্ত পরিবর্তন। তারই অংশ হিসেবে শুরু হলো ভাঙন।
১৮. প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম
এত কিছুনা। অত্যাচারী কখনো টিকে থাকে না। তার ধ্বংস অনিবার্য। তাই পতন হয়েছে হাসিনাশাহীর। আর সাথারণ জনগনের একতাই তাদের পতনের কারণ।
এটা এক ধরনের সামাজিক বিস্ফোরণ, যেখানে মানুষ মনে করেছে আর অপেক্ষা করলে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। তাই তারা ভরসা পেয়েছে তরুণদের নেতৃত্বে, এবং মাঠে নেমে এসেছে। এই আন্দোলনের শিক্ষণীয় দিক হলো—অত্যাচার, দমন, ও অবিচার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি মানুষের মৌলিক অধিকার, বিশেষত ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে আগে হোক পরে হোক জনগণই নতুন ইতিহাস রচনা করে।
ছবি: প্রথম আলো

