Horn meter

হর্নমিটারের মাধমে শব্দদূষণ রোধ

বাংলাদেশ ও হর্নমিটারের বাস্তবতা: শব্দদূষণমুক্ত স্মার্ট আগামীর সন্ধানে

ঢাকা শহরের রাজপথে কান পাতলে মনে হয় আমরা কোনো এক আদিম যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে কামানের গোলার বদলে আমাদের কানে বিঁধছে যানবাহনের তীব্র কর্কশ হর্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের কানের জন্য সহনীয় শব্দের মাত্রা হলো ৫৫ থেকে ৬০ ডেসিবল। অথচ ঢাকার রাজপথে এই মাত্রা অনেক সময় ১১০ থেকে ১২০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়। শব্দদূষণের এই নীরব ঘাতক আমাদের শ্রবণশক্তি কেড়ে নিচ্ছে, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং শিশুদের মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গতানুগতিক আইন আর পুলিশের বাঁশি এখন আর যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর এক আমূল পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের নাম হতে পারে ‘স্মার্ট হর্নমিটার’।

হর্নমিটার কী এবং কেন এটি সময়ের দাবি? হর্নমিটার হলো একটি ডিজিটাল সেন্সর যা প্রতিটি যানবাহনের হর্ন সিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকবে। এটি মূলত একটি ‘ডিজিটাল একাউন্ট্যান্ট’-এর মতো কাজ করবে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে ‘নয়েজ রাডার’ ব্যবহার করে উচ্চ শব্দকারী গাড়ি শনাক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেখানে ট্রাফিক জ্যামে শত শত গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে বাইরের সেন্সরের চেয়ে গাড়ির ভেতরের ‘হর্নমিটার’ বেশি কার্যকর হতে পারে। এটি কেবল শব্দ পরিমাপ করবে না, বরং চালককে হর্ন ব্যবহারের জন্য আর্থিকভাবে দায়বদ্ধ করবে।

বাস্তবায়ন কৌশল: একটি ত্রিমাত্রিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য তিনটি ধাপ অনুসরণ করা অপরিহার্য।

প্রথম ধাপ: সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও জনমত গঠন সরকারকে প্রথমে একটি সমন্বিত ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ২০২৬’ প্রণয়ন করতে হবে। যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে, একটি নির্দিষ্ট তারিখের পর হর্নমিটার ছাড়া কোনো যানবাহন রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না। বিআরটিএ-এর মাধ্যমে গাড়ির ফিটনেস সনদের জন্য এই মিটার সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান বিদ্যমান শব্দদূষণ আইনের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। শুধু জরিমানা নয়, বরং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সামাজিক শাস্তির বিধান রাখতে হবে। যেমন—বারবার নিয়ম ভঙ্গকারী চালককে ট্রাফিক সচেতনতামূলক কাজে বাধ্যতামূলকভাবে রাস্তায় নিয়োজিত করা বা তার ড্রাইভিং লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা।

তৃতীয় ধাপ: স্মার্ট হর্নমিটারের প্রযুক্তিগত প্রয়োগ প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় প্রতিটি যানবাহনকে একটি ডিজিটাল ওয়ালেটের আওতায় আনা হবে। একজন চালক প্রতিদিন ১০০টি হর্ন বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন, যা জরুরি অবস্থার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই সীমা অতিক্রম করলেই শুরু হবে আর্থিক মাশুল। পরবর্তী ২৫টি হর্নের জন্য ৫ টাকা, তার পরের ২৫টির জন্য ১০ টাকা এবং এরপর প্রতিটি হর্নের জন্য ২০ টাকা করে সরাসরি চালকের ওয়ালেট থেকে কেটে নেওয়া হবে। যদি ওয়ালেটে টাকা শেষ হয়ে যায়, তবে মিটার থেকে এক ধরনের সতর্কতামূলক ভিন্ন শব্দ তৈরি হবে যা ট্রাফিক সার্জেন্টকে সংকেত দেবে যে এই চালক আইন ভঙ্গ করছেন।

দেশীয় প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও বুয়েটের ভূমিকা এই পুরো প্রযুক্তিটি আমদানিনির্ভর হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের গর্বের বুয়েট (BUET) এবং অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাত্র কয়েক মাসেই এই মিটারের প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করলে প্রতিটি মিটারের খরচ ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব, যা একজন বাইক বা গাড়ি মালিকের জন্য খুব বেশি ব্যয়বহুল নয়। এটি একই সাথে আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে এবং তরুণ প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

নাগরিক অংশগ্রহণ ও অভিযোগ সেল শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি ‘সিটিজেন পোর্টাল’ বা মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে। কোনো নাগরিক যদি দেখেন কোনো বিশেষ এলাকা বা গাড়ি বারবার নিয়ম ভাঙছে, তবে তিনি ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে অভিযোগ দিতে পারবেন। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ভিডিও থেকে গাড়ির নাম্বার প্লেট শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকের ঠিকানায় ই-চালান পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। মিটার টেম্পারিং বা সিস্টেম হ্যাক করার চেষ্টা হতে পারে। এজন্য প্রতিটি মিটারে ডিজিটাল সিল এবং ট্রাফিক পুলিশের কাছে রিমোট মনিটরিং ডিভাইস থাকতে হবে। এছাড়া চালকদের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করতে হবে যে, হর্ন বাজালে জ্যাম কমে না, বরং শব্দদূষণ বাড়ে।

উপসংহার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ মানে কেবল দ্রুতগতির ইন্টারনেট বা আধুনিক ভবন নয়; স্মার্ট বাংলাদেশ মানে একটি সুস্থ ও শান্ত বাসযোগ্য পরিবেশ। হর্নমিটারের এই উদ্ভাবনী ধারণা যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে ঢাকা হবে এশিয়ার অন্যতম শান্ত মেগাসিটি। আমাদের মনে রাখতে হবে, শব্দদূষণ কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট। আর এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে ‘হর্নমিটার’ হতে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। সরকার, প্রকৌশলী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একদিন হয়তো আমরা একটি নীরব ও শান্ত রাজপথ উপহার পাব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply