স্বেচ্ছাসেবার শক্তিতে সমাজ বিনির্মাণ: স্কাউট নিয়োগের আদ্যোপান্ত
সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশের নির্বাচনে স্কাউট ও ন্যাশনাল ক্যাডেড কোর এর স্বেচ্চাসেবিদের নিয়োগের যে চিন্তা করেছে সরকার তা একটি রাজনৈতিক দলের বাঁধার মুখে বাস্তবায়ন হয়নি। তখন থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আসলে বিষয়টা কি তা নিয়ে আজ আলোচনা করা যাক।
বিশ্বব্যাপী স্কাউটিং একটি অনন্য শিক্ষা ও সেবামূলক আন্দোলন। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে স্কাউটরা অনন্য ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে দুর্যোগ মোকাবিলা পর্যন্ত প্রতিবারই স্কাউটরা নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থা এখন বড় কোনো আয়োজনে স্কাউটদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী হয়। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি প্রচলিত চাকরির চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।
স্কাউট নিয়োগের ক্ষেত্রসমূহ
সাধারণত কোনো বাণিজ্যিক কাজে স্কাউটদের সরাসরি শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তবে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে তাদের নিয়োগ বা সম্পৃক্ত করা হয়:
-
জনশৃঙ্খলা রক্ষা: মেলা, ধর্মীয় উৎসব, ক্রীড়া ইভেন্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভিড় সামলানো।
-
দুর্যোগ মোকাবিলা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণে।
-
পরিবেশ ও সচেতনতা: বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা জনস্বাস্থ্য সচেতনতা (যেমন: টিকাদান কর্মসূচি)।
-
প্রশাসনিক ও প্রশিক্ষণ: স্কাউট আন্দোলনের সাংগঠনিক কাজ পরিচালনার জন্য দক্ষ রোভার বা স্কাউট লিডারদের পেশাদার পদে নিয়োগ।
নিয়োগের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি
বাংলাদেশে স্কাউট কার্যক্রম পরিচালিত হয় “The Bangladesh Scouts Public Order, 1972” (President’s Order No. 111 of 1972) এর অধীনে। এটি একটি জাতীয় সংস্থা যার প্রধান বা ‘চিফ স্কাউট’ হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। ফলে কোনো সংস্থায় স্কাউট নিয়োগের ক্ষেত্রে এই সরকারি আদেশ ও গঠনতন্ত্রের (POR) বিধান অনুসরণ করতে হয়।
৩নয়োগের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া
যদি কোনো সংস্থা (সরকারি বা বেসরকারি) স্কাউটদের সেবাকে কাজে লাগাতে চায়, তবে প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
-
আবেদন: সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ‘বাংলাদেশ স্কাউটস’ এর জাতীয় সদর দপ্তর বা সংশ্লিষ্ট জেলা/উপজেলা স্কাউট অফিস বরাবর আনুষ্ঠানিক চিঠি দিতে হয়। সেখানে কাজের ধরন, কতজন স্কাউট প্রয়োজন এবং সময়কাল উল্লেখ করতে হয়।
-
অনুমোদন: স্কাউট কর্তৃপক্ষ কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণের অনুমতি দেয়।
-
তত্ত্বাবধান: সাধারণত একজন ‘স্কাউট লিডার’ বা ‘ইউনিট লিডার’ এর অধীনে নির্দিষ্ট সংখ্যক স্কাউট কাজ করে। সরাসরি কোনো ব্যক্তি একা স্কাউট নিয়োগ দিতে পারেন না; এটি সংগঠনের মাধ্যমেই হতে হয়।
নিয়োগের শর্ত ও দায়বদ্ধতা
স্কাউটদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক শর্ত মেনে চলতে হয়:
-
স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব: নিয়োগটি হতে হবে সেবামূলক। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা অপেশাদার কাজে তাদের ব্যবহার করা যাবে না।
-
ইউনিফর্ম ও শৃঙ্খলা: দায়িত্ব পালনকালে স্কাউটরা অবশ্যই নির্ধারিত ইউনিফর্ম ও স্কার্ফ পরিধান করবে এবং স্কাউট আইন ও প্রতিজ্ঞা মেনে চলবে।
-
নিরাপত্তা: দায়িত্ব পালনকালে স্কাউটদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়ভার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়।
সম্মানী ও ভাতার নিয়ম (Honorarium Policy)
যেহেতু এটি স্বেচ্ছাসেবী কাজ, তাই এখানে ‘বেতন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় না। এর পরিবর্তে দেওয়া হয় ‘সম্মানী’ বা ‘ভাতা’।
-
দৈনিক ভাতা (DA): স্কাউটদের যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক খরচের জন্য একটি নির্দিষ্ট দৈনিক ভাতা প্রদান করতে হয়। এটি সাধারণত সংশ্লিষ্ট স্কাউট অফিস বা আয়োজক কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে।
-
খাবার ও আবাসন: ইভেন্ট চলাকালীন উন্নত মানের খাবার এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা নিয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব।
-
স্বীকৃতি: কাজ শেষে প্রত্যেক স্কাউটকে কাজের অভিজ্ঞতার সনদ বা প্রশংসাপত্র প্রদান করা হয়, যা তাদের ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়োগকারীর করণীয়: একটি গাইডলাইন
যারা স্কাউট নিয়োগ দিতে চান, তাদের জন্য কিছু পরামর্শ:
১. কাজের অন্তত ১৫ দিন আগে স্থানীয় স্কাউট অফিসে যোগাযোগ করুন।
২. কাজের ঝুঁকি ও সময়সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
৩. তাদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার (First Aid) সরঞ্জাম এবং বিশ্রামের জায়গা রাখুন।
৪. নারী স্কাউট (গার্ল ইন স্কাউটিং) থাকলে তাদের জন্য আলাদা ও নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
স্কাউটরা কেবল একদল তরুণ নয়, তারা একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। সঠিক প্রক্রিয়ায় এবং সম্মানের সাথে তাদের নিয়োগ দেওয়া হলে তারা যেকোনো ইভেন্ট বা সামাজিক কার্যক্রমে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিতে পারে। “The Bangladesh Scouts Public Order” এর বিধান মেনে তাদের সেবাকে কাজে লাগানো হলে সমাজ ও জাতি উভয়েই উপকৃত হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ স্কাউটস গঠনতন্ত্র এবং সরকারি গেজেট।
ছবি: পিক্সেল থেকে জেমিনি দিয়ে সম্পাদনা করা

