অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ত্বরান্বিত করতে চাই ‘‘ভোটগ্রহণ বিধি’’ বা নির্দেশিকা।
সুন্দর নির্বাচনের জন্য সরকারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী। তারপর যে ভূমিকাটা সবচেয়ে জরুরী সেটা হলো রাজনৈতিক দলের ভূমিকা। রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান কাঠামো ও চর্চার মধ্য থেকে এটা তাদের কাছ কতটা ইতিবাচক ভূমিকা পাওয়া যাবে। সেটি পরিষ্কার নয়। এই সংকট থেকে উত্তরণে ইতোপূর্বে রাজনৈতিক সংগঠন বিধিমালা প্রস্তাব করেছি।
অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ভোটের মাঠে নানা ধরনের অনিয়ম, জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল, ভোটারকে বাধা প্রদান, প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ব্যবহার প্রভৃতি কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়া বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসব অনিয়ম শুধু ভোটারদের আস্থা নষ্ট করে না, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। তাই একটি কার্যকর ও শক্তিশালী ভোটগ্রহণ বিধিমালা প্রণয়ন করা জরুরি, যেখানে অনিয়মের ধরনগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকবে, অনিয়ম প্রতিরোধে করণীয় ব্যবস্থা নির্ধারিত থাকবে, অনিয়ম সংঘটিত হলে তার প্রতিকার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান থাকবে। এর মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষিত হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া হবে আরও স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক।
প্রথমে দেখা যাক কি কি অনিয়ম হয়?
- ভোটা তালিকা জালিয়াতী: কাউকে বাদ দেয়া হয়, কারো নাম একাধিক জায়গায় থাকে। ভূয়া ভোটার, মৃত ভোটারের নাম রাখা, ভুয়া আইডি।
- ভোটার ভয় দেখানো: ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য বলা হয়।
- প্রার্থীকে ভয় দেখানো, অপহরণ বা হত্যা: কখনো কখনো বিজয় নিশ্চিত করার জন্য এগুলো করতে দেখা গেছে।
- ভোটকেন্দ্র দখল – সন্ত্রাসী বাহিনী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ।
- ভোটার বাধাদান – প্রকৃত ভোটারকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া বা ভয়ভীতি প্রদর্শন।
- ভোট জালিয়াতি – অন্যের হয়ে ভোট প্রদান, একাধিকবার ভোট প্রদান।
- ভোট বাক্স ছিনতাই বা ভরানো (Ballot Stuffing)।
- ইভিএম ম্যানিপুলেশন (যদি ব্যবহৃত হয়) – সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত করা।
- সরকারি যন্ত্রপাতি ও প্রশাসনের অপব্যবহার – পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট বা কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক ব্যবহার।
- প্রার্থীদের পোস্টার/প্রচার সামগ্রী সরানো বা ক্ষতিগ্রস্ত করা।
- ভোটার কেনা-বেচা (Vote Buying) – নগদ অর্থ, উপহার বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেওয়া।
- প্রতিক্ষ এজেন্টকে নিয়ন্ত্রণ: প্রার্থী ও প্রার্থীর এজেন্ট ভয় দেখানো, বের করে দেয়া এবং মারধর করা।
- ফলাফল ঘোষণায় কারচুপি – গণনার সময় প্রভাব খাটানো, ফলাফল পরিবর্তন।
- পর্যবেক্ষক/গণমাধ্যম প্রবেশে বাধা।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (নিয়ম ও শর্তে রাখতে হবে)
- কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা – পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা/বিজিবি প্রয়োজনে মোতায়েন।
সরকার চাইলে প্রাইভেট সিকিউরিটিও নিয়োগ করতে পারে। তবে তারা বুথে প্রবেশ করতে পারবেনা। বাইরের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবে। ভোটারদের তথ্য ও সেবা দেয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। উভয়ক্ষেত্রে কোনো বিতর্কিত ও পক্ষপাতমূলক প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা যাবে না।
- CCTV লাইভ মনিটরিং – প্রতিটি কেন্দ্রে ক্যামেরা স্থাপন ও সরাসরি সম্প্রচার।
এখানে প্রাইভেট সেক্টরের সহযোগিতা নেয়া যায়। একেক কেন্দ্রে একেক স্টেক হোল্ডার। এদের নির্বাচন প্রকিয়া স্বচ্ছ ও পরামর্শমূলক হবে। যাতে এর মাধ্যমে কেউ নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে।
- ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের কঠোর নিয়ন্ত্রণ – শুধুমাত্র ভোটার, প্রার্থী প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক প্রবেশ করতে পারবে।
গণমাধ্যম প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি গাইড লাইন থাকতে হবে। কারণ দেখা গেছে কিছু প্রার্থী নামকাওয়াস্তে মিডিয়া সাজিয়ে নিজেদের ক্যাডারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে।
- ভোটার শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি – জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক যাচাই।
ভোটার তালিকা থেকে দুটি তথ্য জানতে চাওয়া। ছবি মেলানো স্বাক্ষর মেলানো যেতে পারে। যদি বায়োমেট্রিক সকল কেন্ত্রে দেয়া না যায়। আজকাল গলির মাথার দোকানেও মোবাইল কোম্পানী বায়োমেট্রিক এর ডিভাইস দিয়ে রেখেছে। এগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে।
- ভোটার তালিকা আপডেট ও প্রকাশ – মৃত ভোটার বাদ, ভুয়া নাম মুছে ফেলা।
ভোটার তালিকা কমপক্ষে ৫ ধাপে প্রকাশ করতে হবে।
ক) বর্তমান ভোটার তালিকা- নির্বাচনের ১৫০ দিন আগে: তারপর সবাই ভোটার তালিকায় যুক্ত হতে আবেদন করবে।
খ) প্রস্তাবিত ভোটার তালিকা- নির্বাচনের ৯০দিন আগে: আবেদিত ভোটার সহ প্রকাশ করা হবে। যেকোনো নাগরিকের কাছ থেকে সংশোধন গ্রহণ করা হবে তবে প্রমাণকসহ
গ) প্রাথমিক ভোটার তালিকা- নির্বাচনের ৭৬ দিন আগে: এখানে বাদপড়ারা যুক্ত হবে, ভুল ত্রুটি ঠিক হবে, এলাকা পরিবর্তন হবে। যার যার সংশোধন সে আবেদন করবে।
ঘ) খসড়া ভোটার তালিকা- নির্বাচনের ৬০ দিন আগে: এর উপর সকল কার্যক্রম শুরু করা যাবে। এক্ষেত্রে কোনো সংশোধনী চাইলে তা শুনানীর মাধ্যমে করতে হবে।
গ) চূড়ান্ত ভোটার তালিকা: নির্বাচনের ৪৫ দিন আগে।
- ভোটের আগে, চলাকালীন ও পরে প্রার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
যেকেনো অভিযোগ শুনানির দ্বারা সমাধান করতে হবে। অভিযোগ থাক বা না থাক নিয়মিত শুনানির আয়োজন করতে হবে। উপজেলা অফিসে।
নির্বাচনের ৬০-৩০ দিন আগে প্রতিমানে ২ দিন।
নির্বাচনের ৩০-১৫ দিন আগে সপ্তাহে ১ দিন
নির্বাচনের ১৫-৭ দিন আগে সপ্তাহে ২ দিন
নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে একদিন পর।
নির্বাচনের ৩ দিন আগে প্রতিদিন
- ভোটকেন্দ্র দখল প্রতিরোধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী (Rapid Action Team) মোতায়েন।
( কেউ বাঁধা পেলে সেটার জন্য একটা সাইন ঠিক করা। যেন মুখে বলতে না পারলে সাইন দেখাতে পারে)
- ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা – আলাদা নারী বুথ, লাইন ম্যানেজমেন্ট।
( লাইনে দাঁড়ানোর বদলে ওয়েটিং রুম সিস্টেম করে সেখানে টোকেন পদ্ধতির ব্যবস্থা করা।
- ইভিএম হলে কোড অডিট ও পরীক্ষণ বাধ্যতামূলক। সে সাথে স্ক্রিণে ১ ঘন্টা পর পর শো করানো।
- ভোটগ্রহণ শেষে সরাসরি অনলাইনে ফলাফল আপলোড – কেন্দ্র থেকে সরাসরি কমিশন ওয়েবসাইটে।
- পর্যবেক্ষক ও মিডিয়ার স্বাধীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত ও নিরাপদ করা। ভূয়া মিডিয়ার প্রবেশ রোধ করা।
প্রতিকারের ব্যবস্থা (অনিয়ম হলে)
- তাৎক্ষণিক ভোট বন্ধ করা – কেন্দ্র দখল বা ব্যাপক অনিয়ম হলে পুনঃভোট।
- সরাসরি প্রার্থীর অযোগ্য ঘোষণা – যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি বা তার সমর্থক অনিয়ম করেছে।
- ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বাতিল – জালিয়াতি হলে কেন্দ্রভিত্তিক ফল বাতিল করে পুনঃভোট।
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির ক্ষমতা প্রদান।
- প্রতিটি অনিয়মের রেকর্ড রাখা ও জনসমক্ষে প্রকাশ।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে)
- ভোটকেন্দ্র দখল/ভোট বাক্স ছিনতাই – ন্যূনতম ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড + বড় অঙ্কের জরিমানা। সাথে জীবনে কখনো প্রার্থী না হতে পারা।
- ভোট জালিয়াতি/ভোট কেনা – ৩-৫ বছরের জেল + প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল। সাথে জীবনে কখনো প্রার্থী না হতে পারা এবং কোনো প্রারথীর পক্ষে পর্যবেক্ষক বা পোলিং অফিসার হতে না পারা। এটা সারা জীবনের জন্য।
- ভোটার বাধাদান/ভয়ভীতি – ২-৩ বছরের জেল + প্রার্থীর শাস্তি। ৫ বছরের জন্য কালো ভোটার তালিকায় অন্তভূক্ত করা য়াতে ৫ বছর ভোট সংক্রান্ত কোনো কিছুতে অংশ নিতে না পারে।
- সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীর পক্ষপাতমূলক ভূমিকা – চাকরি থেকে বরখাস্ত + ফৌজদারি মামলা। পাশপাশি হুইসেল ব্লোয়ারদের জন্য সম্মানি, ভাতা, পুরষ্কার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।
- ফলাফল কারচুপি – ৫ বছরের জেল + স্থায়ীভাবে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। স্থায়ীভাবে কালোতালিকাভূক্ত করা।
- পর্যবেক্ষক/মিডিয়া বাধা – ২ বছরের জেল + প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল। ১০ বছরের জন্য নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা।
- ইভিএম ম্যানিপুলেশন – সাইবার অপরাধ হিসেবে ১০ বছরের জেল পর্যন্ত। এবং সারাজীবনের জন্য সব ধরনের নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষলা করা।
সক্ষমতা যা রাখতে হবে
- ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা (CCTV, অনলাইন রিপোর্টিং, লাইভ ফলাফল আপলোড)।
- পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও বিশেষ টিম (দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম)।
- প্রশিক্ষিত নির্বাচনী কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
- স্বাধীন ও শক্তিশালী আপিল বোর্ড/ট্রাইব্যুনাল।
- জনগণের আস্থা রাখার মতো স্বচ্ছতা।
ভোটগ্রহণ বিধিমালা হবে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি মৌলিক পদক্ষেপ। অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা, অনিয়ম সংঘটিত হলে দ্রুত প্রতিকার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে নির্বাচন হবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। এভাবেই কিছু নতুন পদক্ষেপ এর মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সুসংহত, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি: ইন্টারনেট

