Conference_room, ্Gov
Conference_room

সরকারী প্রশাসন যেসব উল্টো নীতিতে চলে

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনের সমস্যাবলি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সরকারি প্রশাসন। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই খাত কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও আধুনিকায়ন পায়নি। বরং ঔপনিবেশিক আমলের জটিল আইন, অকার্যকর সংবিধানিক কাঠামো, দাপ্তরিক সমন্বয়ের অভাব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে সরকারি প্রশাসনকে করেছে দুর্বল ও অকার্যকর। এর ফলে প্রশাসন জনগণের সেবা দেওয়ার পরিবর্তে প্রায়ই জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যখন এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনার বিষয় আসে। তখন আমরা কখনো ব্যক্তিকে, কখনো দলকে, কখনো প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করি। কিন্তু আসল সমস্যাটা হচ্ছে শত শত বছরের পুরনো এবং ভুল সিস্টেম। চলুন জেনে নেয়া যাক-

পুরোনো আইন ও জবাবদিহিতার অভাব

বাংলাদেশের অনেক আইন এখনো ব্রিটিশ আমলের ধাঁচে চলে। এসব আইনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ আমলাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া, সাধারণ মানুষের অধিকার নয়। ফলে এখনো বিচারক বা সরকারি কর্মকর্তা যাকে খুশি রক্ষা করতে বা ফাঁসাতে পারেন—এর কোনো জবাবদিহিতা নেই। অপরাধ প্রমাণিত হলেও কর্মকর্তাদের তেমন ক্ষতি হয় না। এতে অপরাধ দমন নয় বরং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।

আইনের মাধ্যমে এই ফাঁক রাখা হয়েছে। প্রথমত বৃটিশ তরুনরা যেন এদেশে চাকরী করতে আসার জন্য আগ্রহী হয়। দ্বিতীয়ত এখান চাকরী করে তারা যেনো কোনো দায়বদ্ধতা তাদের না থাকে। ফলে আইনগুলো এমন ডিজাইন করা হয়েছে।

যেহেতু বিচারক বা আমলার কাউকে বাচানোর ও ফাঁসানোর ক্ষমতা রয়েছে এবং কোনো দায়বদ্ধতা নেই। সূতরাং কিছু মানুষতো সে সুবিধাটা নিবে এটাই স্বাভাবিক।

যেহেতু জবাবদিহিতা নেই। সেহেতু তাদের আর ভয় নেই। তাই তারা মানুষকে ফাইল আটকে রেখেও তাদের কাজসিদ্ধি করতে পারে। আবার অন্যায়ভাবে ফাইল পাস করেও করে অন্যায় সুবিধা দিতে পারে। যেহেতু তাদের জবাবদিহিতা সীমিত। তাই অন্যায়ভাবে কোনো কিছু করলে জনগন বিপদে পড়ে কিন্তু অনুমোদনকারী অফিসারের কিছু হয়না। হিসেবটা একবার মিলিয়ে দেখুন।

সংবিধানের ঘাটতি

১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। মুজিবনগর সরকারের প্রেক্ষাপট ও স্বাধীনতার ঘোষণার সাথে এর সামঞ্জস্য নেই। অনেক অনুচ্ছেদ অস্পষ্ট এবং অপূর্ণ। এ কারণে বাস্তবে নানা ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ঘাটতির অজুহাত তুলে নীতি বা সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করা হয়।

সংবিধান তৈরী করা হয়েছে এমনভাবে যাতে কিছু ভাল কথা আছে। কিন্তু দিক নির্দেশনা নেই। আবার দেখবেন ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের আইনের সাথে সংবিধানের কোনো সংঘর্ষ বা সমন্বয়হীনতা নেই। তাই পরবর্তী সকল আইন ও বিধি আগেরগুলোর সাথে সমন্বয় করে তৈরী করা হয়। তাই যাহা বায়ান্ন তাহাই তেপান্ন।

দাপ্তরিক সমন্বয়ের অভাব

বাংলাদেশে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বহু দপ্তরের পারস্পরিক সহযোগিতা দরকার হয়। কিন্তু নীতি প্রণয়নের সময় এ সমন্বয় ঠিকমতো নির্ধারিত হয় না। এর ফলে অসংখ্য সিদ্ধান্ত বছরের পর বছর ফাইলবন্দি থেকে যায়, বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলে না।

প্রতিদিনের ঢাকায় রাস্তা খোড়াখুড়ির অবস্থা দেখলে বোঝা যায়। এই সমন্বয়হীনতা কত মারাত্বক। আরেকটা উদাহরণ দিই। বাংলাদেশের পর্যটন খাত মোট ১৭টি দপ্তর এবং উপদপ্তর এর সাথে সম্পর্কিত। পর্যটন খাতের সমস্যা সমাধান ও বাস্তবায়নের জন্য এই ১৭টি খাতের কোনো সমন্বয় কমিটি পর্যন্ত সরকার আজ পর্যন্ত করতে পেরেছে বলে জানা নেই।

তারউপর এখানে বিমান মন্ত্রণালয়কে এক করে একটা জগাখিচুড়ি বানিয়ে দিলো। পর্যটন কর্পোরেশন থেকে বোর্ডকে ছোট বানানো হলো। মানে উল্টা নীতির বাস্তব প্রয়োগ হলো। ব্যাপারটা হলো কর্পোরেশন যদি পাতিল হয় বোর্ড হতো ঢাকনা। এখন ডাকনা পাতিল ঠিক আছে। কিন্তু ডাকনা নিচে আর পাতিল উপরে।

এবিসি ফরম্যাট

সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের একটি পরিচিত ধাঁচ হলো এবিসি পদ্ধতি

  • প্রথমে Avoid (এড়িয়ে চলা),

  • পরে Bypass (অন্যের ঘাড়ে চাপানো),

  • শেষে Confuse (বিভ্রান্তি সৃষ্টি)।

ফলাফল হয়, কোনো সমস্যার কার্যকর সমাধান না হয়ে সবকিছু শূন্যে মিলে যায়।

ধরেন, ই-কমার্স সেক্টরে অনিয়ম হচ্ছে। একটা বছর চলে গেলে। কেউ কিছু করছেনা।  একবছর পর যখন সবাইকে চাপ দেয়া হলো।

বাংলাদেশ ব্যাংক: ব্যাংক আইনে ব্যাংকের ভেতর যাওয়ার ক্ষমতা আছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢোকার ক্ষমতা নেই। তার পরের ধাপে তারা কিছু লেনদেন বন্ধ এবং তদন্ত করেছিল।

বিএফআইইউ: কোনো সন্দেহজনক লেনদেন দেখতে পাচ্ছি না। যেগুলো পেয়েছি সেগুলো সিআইডি তদন্ত করতেছে। আর এ যেগুলো হলো- যারা অলরেডি টাকা নিয়ে ভেগে গেছে। পরের ধাপে কিছু মানি লন্ডারিং বের করেছিল।

সিআইডি: আমাদের কাছে যে অভিযোগ এসেছে। বিবাদীরা সেগুলো তুলে নিয়েছে। তাই চার্জশীট দেয়া সম্ভব হয়নি। পরে কয়েকজনকে অভিযুক্ত করেছে। ততক্ষনে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

এসবি: আমাদের কোনো বাণিজ্য শাখা নেই। রাজনৈতিক শাখাই বাণিজ্য দেখে ফলে আমরা অনেক করতে পারি না।

ডিবি: আসলে যারা এসব কাজ করেছে। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাশালীদের সাথে উঠাবসা করে। তাই অনেকসময় অনেক কিছু করা যায়না।

পিআইবি: এখানে টাকা পয়সার ব্যাপার এবং কিছু কারিগরি দিক রয়েছে। আমাদের কয়েকজন প্রশিক্ষণ দিলে তারপর আমরা কাজ করতে পারবো।

এনএসআই: আমাদের এখানে যাদেরকে এনাইন করি ৬ মাস বদলি হয়ে যায়। ফলে আমরা নিয়মিত তদারকীর বাইরে কোনো অগ্রসর হতে পারি নি।

( একটা কাল্পনিকভাব লেখা হয়েছে, হুবহু না হলেও বাস্তবতা কিছুটা এরকম।

পদোন্নতির পুরনো কাঠামো

প্রশাসনে পদোন্নতি ও বেতন কাঠামোতে এখনো আধুনিক সংস্কার নেই। অযোগ্য ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা লবিংয়ের মাধ্যমে পদোন্নতি ও সুবিধা পান, আর সৎ ও দক্ষরা বঞ্চিত হন। এতে একটি বড় অংশ কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে কেবল রুটিনমাফিক কাজ করেন।

নোংরা রাজনীতি

প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার। ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীরা অগ্রাধিকার পায়, বিরোধীরা বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে এই রাজনৈতিক প্রভাব প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছে। ফলে প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।

অন্যায়ের অবারিত সুযোগ

বাংলাদেশে যদি কেউ অন্যায় করে অর্থ উপার্জন করে, তবে টাকায় সব জায়গা থেকে পার পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে সৎ ব্যক্তি প্রায়শই বিপদে পড়ে। এতে সৎ মানুষের নিরুৎসাহ হয়, আর দুর্নীতি পুষ্ট হয়।

স্থানীয় নেতাদের প্রভাব

যেহেতু সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের আস্থা পান না, তাই প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করে স্থানীয় নেতা ও ট্রেড ইউনিয়ন। ফলে নাগরিকরা প্রকৃত প্রশাসনের পরিবর্তে নেতাদের দ্বারস্থ হয়। এতে রাজনীতি আরও দূষিত হয় এবং প্রশাসনও তার স্বাধীনতা হারায়।

দুর্বল করনীতি

কর ব্যবস্থাতেও স্বচ্ছতা নেই। কর কর্মকর্তারা জবাবদিহিতার বাইরে থেকে কর ধার্য করেন, পরে করদাতাকে “ম্যানেজ” করতে বাধ্য করেন। এতে নতুন উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর নাগরিকরা কর ফাঁকির প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনকে সংস্কার ছাড়া উন্নয়নকে টেকসই করা সম্ভব নয়। পুরনো আইন সংস্কার, সংবিধান হালনাগাদ, দাপ্তরিক সমন্বয় জোরদার, পদোন্নতির কাঠামো আধুনিকায়ন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধ ও কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা—এসব বাস্তবায়ন না হলে প্রশাসন জনগণের সেবক নয়, শোষকে পরিণত থাকবে। একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ প্রশাসনই টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply