সরকারী প্রশাসনের সমস্যা
- জাহাঙ্গীর আলম শোভন
আমি একবার আমার এক জাপানফেরত বন্ধুকে প্রশ্ন করি। যে এক কথায় জাপান ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে। যে আমাকে যা বলে তা হলো ‘‘ জাপানে ১০০ টাকা চুরি করার চেয়ে ১ লাখ টাকা আয় করা সহজ’’ বাংলাদেশে ১০০ টাকা আয় করার চেয়ে এক কোটি টাকা পাচার করা সহজ’’।
এই কথাটি ২০ বছর আগে শোনার পর আমি প্রতিনিয়ত বিষয়টা নিয়ে দেশের বিভিন্ন ঘটনার সাথে মিল খুজে পেলাম। পরে আইন প্রশাসন ও বিভিন্ন কাঠামো পরীক্ষা করে আরো কিছু বিষয় অনুসন্ধান করলাম। যা এই লেখায় তুলে ধরছি। যদিও এসব সমস্যা আলোকে আমি সমাধানও পেশ করেছি অন্যত্র।
১) ব্রিটিশ আইনের দূর্বলতা
যেহেতু দেশের আইনগুলো ব্রিটিশ আমলে তৈরী এবং পরবর্তী আইন ও সংবিধান পুরনো আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছে। তাই ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশরাই বেশীরভাগ আমলা ছিল। তাদের ক্ষমতা বেশী দেয়ার জন্য। আইনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে। যাতে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। একজন বিচারক যাকে খুশি বাচাতে পারবেন আর যাকে খুশি ফাসাতে পারবেন। ফলে সে আইনে কোনো স্বচ্ছতা নেই। আর এই কারণে দেশে যত অপরাধ হয় তাতে কখনো কখনো অপরাধি ধরা পড়লেও সরকারী সরকারী কর্মকর্তার কিছু হয় না। আর এটা এই দেশের ধ্বংসের মুল কারণ।
২) বাহাত্তরের সংবিধান
বাহাত্তরের সংবিধান এক বিশাল শুভংকরের ফাঁকি। এই সংবিধানের সাথে মুজিবনগর সরকার এবং স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো সামঞ্জস্য নেই। তারউপর এটা ভাসা ভাসা বিষয়ে লেখা। এখানে অনেক কিছু স্পষ্ঠ করা নেই। রয়েছে নানারকম ঘাটতি। কিছু একটা হলে সাংবিধানিক ঘাটতির কথা আসে। এবং মুল কাজটা বাধাগ্রস্থ হয়। হয়তো এই সময়ে এরচেয়ে ভালো কিছু করার সুযোগ ছিলনা। কিন্তু জরুরী মলম দিয়ে একটা জাতি ৫৫ বছর চলতে পারে না।
৩) দাপ্তরিক সমন্বয়ের অভাব
কিছু সিদ্ধান্ত রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের পারষ্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় দরকার হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এই সমন্বয়গুলো কিভাবে সেটি ঠিক করা হয়না। ফলে হাজারো সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা বছরের পর বছর অবাস্তবায়িত থেকে যায়। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
৪) বাংলাদেশের সরকারী প্রশাসন চলে এবিসি পদ্ধতিতে
বলা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের সরকারী কর্মকর্তারা এবিসি ফরম্যাটে কাজ করে। কোনো ইস্যু তৈরী হলে প্রথমে তার অ্যাভয়েড করে বা এড়িয়ে চলে। এভাবে চলতে চলতে যখন বিষয়টি জটিল হয়ে যায় বা বড়ো ইস্যু হয়ে যায় তখন বাইপাস করে বা একে অন্যের দিকে চাপিয়ে দেয়। যখন এটা নিয়ে শোরগোল শুরু হয় এবং অন্য কারো উপর ছাপানোর সুযোগ থাকে না। তখন কনফিউশন তৈরী করে। কাজটি এভাবে নাকি ওভাবে। এভাবে সবকিছু দিনশেষে ফলাফল শুণ্য হয়। তাই এই বিষয়টি নজর দিতে হবে।
৫) পুরনো ও ভুল কাঠামো
প্রশাসনে পদোন্নতি ও বেতনবৃদ্ধির কাঠামো পুরনো ও দূর্বল বিধায়। অযোগ্য, অলস, কূটিল ও কাজ না করা কর্মকর্তারা তাদের লবিং ক্ষমতা দিয়ে ব্যাপক দূর্নীতি ও পদায়ন পায়। অন্যদিকে সৎ ও নিরপেক্ষরা বঞ্চিত হয়। ফলে বিশাল একটা গ্রুপ কাজের মোটিভেশন হারিয়ে তারা শুধু রুটিন কাজ করে। তারা বেশী কাজ, ইনোভেশন এবং দায়িত্ব নিয়ে কোনো কাজ করে না। ফলে তার ফল পুরো জাতিকে ভোগ করতে হবে।
৬) নোংরা রাজনীতি:
প্রশানের ভেতরে চলে নোংরা রাজনীতি। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকারের লোকদের সুবিধা দেয়া হয়। বাকী বঞ্চিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য সরকারী কর্মকর্তাকে ব্যবহার করতে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা শুধু বহাল রাখেনি। এটিকে প্রায় পুরোটাই রাজনীতিকীকরণ করে নষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষ করে বিগত ১৫ বছর সব প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতিগত কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এবং সেটি এখনো চলছে।
৭) অন্যায়ের অবারিত সুযোগ
এখানে কেউ যদি অন্যায় করে কোটি টাকা কামাতে পারে। তাহলে সে টাকা দিয়ে সব জায়গা থেকে পার পেয়ে যায়। আর যদি কেউ সৎ থেকে বিপদে পড়ে। তাহলে তার জন্য সে বিপদ প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে।
৮) যেহেতু সরকারী আমলারা বিশ্বস্থ নয় এবং আন্তরিক সেবা দেয় না সেহেতু রাজনীতি এখানে হস্তক্ষেপ করে। সব এলাকায় ও খাতে স্থানীয় নেতা এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন জনগন সরকারী কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে নেতাদের পেছনে ঘুরে। আর সুযোগে রাজনীতিতে দূবৃত্তায়ন হয়। এভাবে রাজনীতি প্রশাসনকে নষ্ট করে প্রশাসন রাজনীতিকে নষ্ট করে। এভাবে বছরের পর বছর চলছে। কেউ কখনো বলতে পারেনি এটা অসাংবিধানিক। এতবড় বাজে সিস্টেম যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে সংবিধানে সমস্যা রয়েছে সেটা বুঝতে হবে। আইনেতো আছেই।
৯) দূর্বল অসম্পূর্ণ অস্বচ্চ ও হীন উদ্দেশ্যমূলক করনীতি
বাংলাদেশের করণীতিও একই অবস্থা। একদিকে বিভিন্ন আইনের সাথে সার সমন্বয় নেই। অন্যদিকে কর কর্মকর্তার ক্ষমতা অসীম কিন্তু জবাবদিহিতা নেই। ফলে এখানে পদ্ধতিটাই এমন এখানে দূর্নীতি ছাড়া আর কোনো নীতি নেই। নতুন প্রজন্মের অনেক উদ্যোক্তা সঠিকভাবে কর দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ কর্মকর্তা একটা ভুল কর ধার্য করে পরে। নাগরিক বাধ্য তাকে ম্যানেজ করে। এভাবে সবাই মিলে দেশকে ঠাকায়। যদিও জনগনের মধ্যে সার্বিকভাবে করফাঁকির প্রবণতাতো আছেই্।
সারাংশ (Summary)
বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনের মূল সমস্যাগুলো হলো—
- পুরনো আইন ও জবাবদিহিতার অভাব → ব্রিটিশ আমলের আইন ও কাঠামো এখনো বহাল, যেখানে কর্মকর্তারা জবাবদিহিতা ছাড়া ক্ষমতা ভোগ করেন।
- সংবিধানের ঘাটতি → অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ সংবিধান প্রশাসনিক কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
- দাপ্তরিক সমন্বয়ের অভাব → একাধিক দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অনেক নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না।
- এবিসি সংস্কৃতি → সরকারি কর্মকর্তারা এড়িয়ে চলা, দায় চাপানো ও বিভ্রান্তি তৈরি করে কাজ ফাঁকি দেন।
- পদোন্নতির পুরনো কাঠামো → দুর্নীতিপরায়ণরা অগ্রাধিকার পায়, সৎ ও দক্ষরা বঞ্চিত হয়।
- রাজনৈতিক প্রভাব → প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারিয়ে ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ার হয়ে পড়ে।
- দুর্নীতি ও অন্যায়ের প্রশ্রয় → টাকায় অপরাধীরা পার পায়, আর সৎরা বিপদে পড়ে।
- স্থানীয় নেতা ও ট্রেড ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ → আস্থাহীন প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে জনগণ নেতাদের দ্বারস্থ হয়।
- করনীতির দুর্বলতা → স্বচ্ছতার অভাব ও কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে।
উপসংহার: প্রশাসন সংস্কার ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না। আইন আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করাই জরুরি।

