অভ্যুত্থান

সংসদ নির্বাচনের প্রচলিত পদ্ধতি, তাদের সুফল-কুফল

সংসদ নির্বাচনের প্রচলিত পদ্ধতি, তাদের সুফল-কুফল এবং বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত মডেল

গণতন্ত্রের মূল চেতনা হলো — “জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।”
আর এই শাসনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন জনমতের যথাযথ প্রতিফলন।
কিন্তু জনগণের সেই রায় কোথায়, কেমন পদ্ধতিতে, কতটা বিশুদ্ধভাবে প্রতিফলিত হবে — সেটি পুরোপুরি নির্ভর করছে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর।

তাই সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি ঠিক করা শুধুমাত্র একটি কারিগরি প্রক্রিয়া নয়, বরং তা হলো একটি দেশের গণতন্ত্রের মানদণ্ড স্থাপন।

 দেশে দেশে সংসদ নির্বাচনের প্রধান পদ্ধতিগুলো

বর্তমানে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রধানত চারটি বড় পদ্ধতি প্রচলিত:

বিদ্যমান সর্বাধিক ভোটে পদজয় (FPTP) বা Plurality System

Plurality System বা সংখ্যাগুরু পদ্ধতি  কী?

এটি সবচেয়ে সহজ এবং প্রাচীন পদ্ধতি। প্রতিটি সংসদীয় আসন থেকে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী নির্বাচিত হয়।
তাতে সে প্রার্থী মোট ভোটের ৩০-৩৫% পেলেও বাকিরা ভাগ হয়ে গেলে তিনিই বিজয়ী। যাতে প্রতিটি আসনে দল ও বেদল মিলিয়ে যত প্রার্থী থাকবে তাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশী আসন পায় তিনি জয়লাভ করে।

  যদি কোনো আসনে ১০ জন প্রার্থী থাকে এবং একজন ২০% ভোট পায় তিনি জিতবেন। যদি অন্যরা তারচেয়ে কম পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২০% ভোট পাওয়া মানে তাকে ৮০% লোক চায়নি। যাতে ৮০% লোক চায়নি। তিনি যদি নেতা হোন তাহলে সব জায়গায় একটা অন্যায্যতার ছাপ থাকার আশংকা থাকে। তাছাড়া তাকে যদি ৮০% লোক সহযোগিতা না করে সেতো দেশই চালাতে পারবেনা। বা ঠিকমতো চালাতে পারবেনা।  এছাড়া দেখা যায় কোনো দল ১৪% ভোট পেয়েছে আর আসন পেয়েছে ৩টা ৫% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে ১টা বা ১টাওনা। ৫% ভোট কিন্তু ১৫টি আসনের সমান। এর পদ্ধতির ফলে জনগনের সঠিক মতামত প্রতিফলিত হয়না।

এছাড়া বিদ্যমান পদ্ধতিতে দলকে পছন্দ না হলেও অনেক সময় ব্যক্তির কারণে ভোট দিচ্ছে ভোটারগণ অথবা পছন্দ হলেও ব্যক্তির কারণে ভোট দিচ্ছে না। আবার ব্যক্তিকে পছন্দ হলেও দলের জন্য তাকে ভোট দিচ্ছে না বা পছন্দ না হলেও দলের কারণে ভোট দিচ্ছে। বা পদ্ধতিটাই এমন ভোটারকে ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল মতামত দিতে প্ররোচিত কখনো কখনো বাধ্য করে যদি সে ভোট দিতে চায়।

এর সুবিধা হলো, সহজ, দ্রুত ফল ঘোষণা করে সরকার শপথ নিতে পারে।  ভোটার ও প্রার্থীর সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ভারত,  যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র (কংগ্রেস নিম্নকক্ষ), বাংলাদেশ, কানাডা এসব দেশে এই পদ্ধতি রয়েছে।

 আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR)

যে দল যে শতাংশ ভোট পায়, সে প্রায় সেই অনুপাতেই সংসদে আসন পায়। ভোটার দলকেই ভোট দেয়, প্রার্থীকে নয়।  এখানে ব্যালটে কোনো প্রার্থী বা প্রার্থীর নাম থাকে না। জনগন দলকে ভোট দেয়। দল তাদের আনুপাতিক হারে আসন পায়। কেউ ৫% ভোট পেলে ৫% শতাংম আসন পায়, ২৫% শতাশ ভোট পেলে ২৫% আসন পায়। এতে ভোটারদের মধ্যে কোনো দ্ধিধা থাকে না। তারা বিনাসংকোচে ভোট দেয়। ফল দলগুলো ইতিবাচক রাজনীতি করতে বাধ্য হয়।  এতে টাকার খেলা, পেশীশক্তির ব্যবহার ও কেন্দ্র দখলের মোটিভেশণ থাকে না। দল চাইলে যোগ্য ও আইন প্রণয়নে অভিজ্ঞদের আইনসভায় প্রেরণ করতে পারে এবং করেও।  বিশেষ করে যেসব দেশে এই পদ্ধতি আছে-  ইসরায়েল (Pure PR), নেদারল্যান্ডস,  সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম।

এতে ভোটের প্রকৃত অনুপাত সংসদে প্রতিফলিত হয়। এবং ছোট দল, সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বরও উঠে আসে। তবে এর দ্বারা সরাসরি এলাকার এমপি থাকে না। প্রার্থী নয়, দল বাছাই করে কাকে সংসদে পাঠাবে — বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এতে মনোনয়ন বাণিজ্য ও দলতন্ত্র প্রবল হওয়ার আশংকা আছে।

 মিশ্র পদ্ধতি (MMP)

এটি FPTP + PR এর সংমিশ্রণ। ভোটার দুটি ভোট দেন — এক ভোট প্রার্থীকে (তার এলাকার জন্য), আরেক ভোট দলের জন্য। মানে দুটো ব্যালট পেপার রাখা হয় একটাতে ভোটার তার পছন্দের দল অন্যটিতে পছন্দের প্রার্থী ঠিক করেন।

এর ফলে FPTP ও PR দুটো পদ্ধতির মধ্যে একটার অসুবিধাগুলো আরেকটা দিয়ে দূর হয়ে যায় আর দুটো পদ্ধতির সুবিধা ভোগ করা যায়।

 জার্মানি, নিউজিল্যান্ড,  লেসোথো. বোলিভিয়া স্কটল্যান্ড, ওয়েলসের আঞ্চলিক পার্লামেন্টেও এই পদ্ধতি বহাণল রয়েছে।

এতে প্রার্থী-ভোটার সম্পর্ক অটুট থাকে।  দল ভোটের শতকরা হারে সংসদে আনুপাতিকভাবে আসন পায়। মেধাবী ব্যক্তিরা লিস্টের মাধ্যমে সংসদে যেতে পারেন।

 দ্বি-দফা নির্বাচন (Two-Round System / Runoff)

প্রথম দফায় কেউ ৫০% ভোট না পেলে শীর্ষ দুই প্রার্থী নিয়ে দ্বিতীয় দফায় ভোট হয়। এর দ্বারা ৮০ ভাগ জনতার অপ্রিয় হয়ে কেউ সংসদে যেতে পারে না কারণ পরের বার কেউ একজন ৫০%+ পায় বা পেতে হয়।

 ফ্রান্স (রাষ্ট্রপতি).  ব্রাজিল,  তুরস্ক দেশে রয়েছে।   সুবিধা হলো- বিজয়ী সর্বাধিক ভোট না হলেও অন্তত ৫০% ভোট পায়।

 অসুবিধা  হলো-

  • বিজয়ী সর্বাধিক ভোট না হলেও অন্তত ৫০% ভোট পায়। খরচ ও সময় দ্বিগুণ।  নির্বাচনী উত্তাপ দীর্ঘায়িত হয়।

কেন এমএমপি?

এতে দুটি ভোট দেয়া যাবে — একজন প্রার্থীকে, আরেকটি ভোট শুধুমাত্র দলের জন্য। ফলে জনগণ এলাকার ভালো প্রার্থীকে বেছে নেবে, আবার তার মতের দলও সংসদে আনুপাতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব পাবে।

সংসদে ছোট দল ও নতুন শক্তিও সুযোগ পাবে, যাতে সংসদে নীতি, নতুন ধারণা ও মতাদর্শের বৈচিত্র্য আসে।

দলীয় লিস্ট থেকে মেধাবী, শিক্ষিত, নীতি-প্রধান নেতারা সংসদে আসবেন — যারা সরাসরি ভোটের রাজনীতি করতে না পারলেও রাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থ ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের একাধিপত্য দিনকে দিন মজবুত হচ্ছে। ফলে দেশের মেধা, তারুণ্য, বিকল্প চিন্তা — সবকিছু গুটিয়ে যাচ্ছে।  এ প্রেক্ষাপটে MMP পদ্ধতি একটি সময়োপযোগী, শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, যা একদিকে ভোটারের প্রার্থীকে সরাসরি বাছাইয়ের অধিকার নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ভোটের অনুপাত অনুযায়ী সংসদে দলের সঠিক প্রতিফলন ঘটাবে।

এভাবে জনগণের প্রকৃত মনের ভাষা হবে সংসদের ভাষা, যা হবে সত্যিকারের “গণতন্ত্র”। আর সেটিই আমাদের স্বপ্ন —

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply