শোভনের তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ
স্কুলের বইয়ের চেয়ে যে বালক বাইরের বই বেশী পড়েছে, মনতো তার ঘরের বাইরে থাকবেই। উত্তর–দক্ষিণ মেরু অভিযান, আমাজান অরন্যে অভিযাত্রা, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, নীলনদের উৎসমুখ আবিষ্কার, হিমালয় আর সাহারা অভিযানের রক্তহীমকরা সত্যিকার গল্পগুলো তাকে টানতো। বইয়ের পড়া শেষে স্বপ্নের ঘোরে হারিয়ে যেতেন কোনো নির্জন দ্বীপে কিংবা পিরামিডের গোপন গহবরে। এক নি:শ্বাসে পড়ে শেষ করতেন জেমস কুক, জোনাথন সুইফট, আরো নানা অভিযানের গল্প।
সুইস ফ্যামিলি রবিনসন, সার্কাসের কুকুর, হোয়াইট ফ্যাং, একশ আশি দিনে পৃথিবী ভ্রমণ, রবিনসন ক্রুশো, মা, কাশতানকা, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, আনা ফ্রাংকের ডায়রী।তাবত বই তার মনোজগতে ঝড় তুলতো।ড. আবদুল্যাহ আল মুতির বিজ্ঞান ভিত্তিক লেখা, ভবেশ রায়ের বিশ্বজয়ের কথা, সত্যজিত রায়ের ফেলুদা ও শরৎচন্দ্ররে শ্রীকান্ত, তাকে অনুপ্রানীত করতো। রোমনো আফাজ, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, বিভুতিভূষন বন্ধোপাধ্যায় এবং কাজী আনোয়ার হোসেনও কিংবা রকিব হাসানও বাদ পড়েনি।
বাংলাদেশের কোনো প্রান্তে থাকা এক কিশোরের জন্য এসব স্বপ্ন ছিলো অলীক কল্পনা মাত্র। তারপর পদ্মা মেঘনা যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়ালো। বাংলাদেশের ছেলেরা এভারেস্ট জয় করলো। ইংলিশ চ্যানেলতো আগেই জয় করা ছিলো। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল মাথা উঁচু করে দাড়ালো। বস্ত্রবালিকা আর প্রবাসী শ্রমিকরা ভিত গড়ে দিলো দেশের অর্থনীতির।
চারদিকে এতো এতো মানুষের সাফল্যের গল্প তাকে প্রতিনিয়ত উসকে দিতে থাকলো। কিন্তু আটপৌরে জীবনে লেখাপড়া শেষ করে হাতে টাকা এলে অনেক কিছু করা যাবে এই ভাবনায় ছাত্রজীবন কর্মজীবন শুরু হলো। হাতে টাকা আসে কিন্তু মাসশেষে টাকা হয়ে যায় হাওয়া।
শেষে একদিন পণ আঁটা হলো আর কোনো কথা নয়, আর কোনো স্বপ্ন নয়, এবার শুরু হবে বাস্তব অভিযান। ভাবলেন আর কিছু না হোক অন্তত তেঁতুলিয়া থেকে হেঁটে টেকনাফ যাওয়ার কাজটাতো করা যাবে। এরই মধ্যে শোভন ঘুরে বেড়িয়েছেন ৪২ টিরও বেশী জেলা এবং ভারত ও নেপালের কিছু স্থান।
ছোটকাল থেকেই দুঃসাহসিক কাজ পছন্দ করেন শোভন। আর ভ্রমণ তো নেশার মতো। ছুটে বেড়াতে পছন্দ করেন গ্রাম থেকে শহরে। দেশের আনাচে কানাচে ও প্রান্তিক সীমায়।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালকে পর্যটন বছর বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাই এই বছরই পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পাড়ি দেবেন বলে প্রস্তুতি শুরু করলেন জাহাঙ্গীর আলম শোভন।
অবশেষে ‘দেশদেখা’ নাম দিয়ে গত ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট থেকে পদযাত্রা শুরু করেন। ‘দেখবো বাংলাদেশ গড়বো বাংলাদেশ’ স্লোগান ধারণ করে গত ২৮ মার্চ ২০১৬ টেকনাফ ভ্রমণ সফলভাবে সম্পন্ন করেন ।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সহযোহিতায় ট্যুর ডট কম ডট বিডির পৃষ্ঠপোষকতায় ১১৭৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্য স্পর্শ করেন শাহপরীর দ্বীপের গোলারচরে ২৮ তারিখ বিকেল ৫টায়। এ সময় তিনি লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের।
এই সফরে দেশের ১৮টি জেলা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন সমাজকর্মী ও অনলাইন লেখক জাহাঙ্গীর আলম শোভন। এই পথে হাজার কিলোমিটার রাস্তা হলেও পথে পথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেখাও সামাজিক কর্মসূচীতে অংশগ্রহনের কারণে আরো দেড়শো কিলোমিটারেরও বেশী পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। পায়ে হেঁটে দেশভ্রমণের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ স্থানগুলোর তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করেছেন, চলার পথে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে সেখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং দেশের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের অনুপ্রাণিত করেন।
ই-কমার্স কনসালটেন্ট হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলম শোভন কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তা গোছালো পরিবার। সফর শেষে পুরো বিবরনী নিয়ে বই লিখেছেন। ‘দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ’’ শিরোনামে লেখা বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায়। সাহিত্যদেশ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা এটি প্রকাশ করে। প্রকাশনায় সহযোগিতা করেছে যথারীতি দেশের শীর্ষস্থানীয় ট্যুর অপারেটর tour.com.bd।
তিনি শুধু দেশই দেখেননি, দেশের প্রকৃতি পরিবেশ ও পর্যটনের সমস্যা ও সম্ভাবনা তিনি যা দেখেছেন তা তুলে ধরছেন এই বইতে। শোভন বিভিন্ন স্থানের শোভন ছবি তুলেছেন গুরুত্ব স্থানগুলোতে সেলফি তুলেছেন, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন এবং মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। এগুলো মূলত তার হাঁটার পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ বহণ করে। স্যাটেলাইটে থেকে তার অবস্থান ও গতিবিধি জানার জন্য ট্রেকিং সার্ভিস ছিলো সফরের একটা অংশ। এছাড়া তিনি ১৮ ইঞ্চি বাই ৩৬ ইঞ্চি মাপের একটি বেবী স্ট্রলার বা ট্রলি নিয়েছেন যাতে তার ব্যাগপত্র বহন করা যায়। প্রতিদিনের আপডেটগুলো তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইলে দিয়েছেন।
জাহাঙ্গীর আলম শোভন বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষদের প্রশংসা করেন। পাঁয়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ সফর সফল হওয়ায় শোভনকে সম্মাননা জানিয়েছে ই কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, দিনরাত্রি ডট কম, কিনেলে ডট কম ও ই কম ভয়েস। ৪৬ দিনে পায়ে হেটে তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ায় জাহাঙ্গীর আলম শোভনকে অভিন্ন্দন জানিয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।
শোভনের মূল বক্তব্য হলো—এই দেশটা আমাদের, আমরাই এই দেশকে গড়ব। আমরা যার যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য কিছু করব। এ ছাড়া তিনি শিশু নির্যাতন বন্ধ, লোকসাহিত্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, বাল্যবিবাহ রোধ ও মাদকবিরোধী জনমত গঠনে কাজ করেছেন। শোভন বলেন, এটা একটা ভ্রমণ কর্মসূচী হলেও এর সামাজিক দিক রয়েছে। শোভন মনে করেন, আমরা আমাদের দেশ ও এর সৌন্দর্যকে দেখবো এর সম্পর্কে জানবো এবং দেশ গড়ার কাজে অংশ নেবো। সমাজের যে স্তরেই থাকিনা কেন আমাদের দেশ ও জাতির প্রতি আমাদের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে জাতি আমাদের কাছে তা প্রত্যাশা করে। আমারদের উচিত প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য কিছু না কিছু করা। অনেক কিছু করতে না পারলেও আমরা অন্তত এতটুকু করতে পারি যে আমরা এমন কোনো কাজ করবো না যাতে আমাদের দেশের ক্ষতি হয়।
তিনি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বলেন, আমরা বড়ো হয়ে দেশের হয়ে কাজ করবো, দেশের জন্য কাজ করবো, পরিবেশ সংরক্ষণ করবো, গাছ লাগাবো, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করবো শিশু অধিকার আদায়ের চেষ্টা করবো, প্রতিটি শিশুর শিক্ষার যে অধিকার রয়েছে তার জন্য চেষ্টা করবো, বাল্যবিবাহ সমাজের এক অভিশাপ এর প্রতিরোধ করবো, মাদক থেকে দূরে থাকবো মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখেবা। আমাদের দেশের যে নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে তার জন্য আমরা কাজ করবো। আমাদের দেশের জন্য আমাদেরকে কাজ করতেই হবে।
দেশদেখা ইভেন্টের স্পন্সর প্রতিস্ঠান .tour.com.bd, ট্রাকিং সার্ভিস দিয়েছে dinratri.com,
লজিস্টিক সেবা দিয়েছে keenlay.com ও Cholbe.com, লজিস্টিক সহযোগিতা করেছে www.walletmix ও ইউনিকো সলুশান। কমিউনিকেশান পার্টনার বড়ভাই ডট কম, ফটোগ্রাফি পার্টনার ফোকাস ফ্রেম। বিশেষ সহযোগী ছিলো জার্নি প্লাস।
সফর শেষে জাহাঙ্গীর আলম শোভন বলেন, প্রথম থেকেই আমি আমার পদযাত্রাকে সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার উপর জোর আমার এই শ্রমসাধ্য পদযাত্রা থেকে যদি দেশ ও সমাজ উপকৃত হয় তবেই তা স্বার্থক।
সম্প্রতি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন বিগত বছরে নিজেদের প্রশংসনীয় কাজের জন্য আলোচিত হয়েছেন এমন ৪২ জন বাংলাদেশীকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশে বিদেশে সাড়াজাগানো কৃতিমান মানুষদের সাথে স্থানপায় পায়ে হেঁটে ভ্রমণকারী শোভন। ডিজিটাল সময় ম্যাগাজিন তাকে নিয়ে ৮ পৃষ্ঠার কাভার স্টোরি প্রকাশ করে।
শোভনের কৃতিত্ব হলো তিনি একটা পায়ে হাঁটা ভ্রমণ কর্মসূচীকে একটি অনন্য অসাধারণ সামাজিক কর্মসূচীতে রুপদান করেছেন। বলাবাহুল্য তিনি পথে পথে অনেক দরিদ্র ও দুস্থ মানুষকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এই ইভেন্ট এর মিডিয়া পার্টনার ছিলো যথাক্রমে দৈনিক ইত্তেফাক, রেডিও ফূর্তি, দৈনিক ঢাকা রিপোর্ট, বাংলামেইল২৪, ঢাকাবিডি, বাংলাদেশদর্পন২৪, ই পত্রিকা, ইকমভয়েস, ডিজিটাল সময়, আলোকিত বার্তা, আজকের সময়, চ্যানেল আগামী, দি বাংলাদেশ মনিটর ও দি ট্রাভেল বাংলাদেশ এছাড়া শতাধিক সংবাদ মাধ্যম দেড়শোরও বেশী সংবাদ ও ফিচার প্রকাশ করে।
একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় জেগে উঠুন সকলের প্রাণে।

