Metonic Cycle, মেটোনিক টক্র

মেটোনিক চক্র মহাকাশ পঞ্জিকার যোগসূত্র

মেটোনিক চক্র: মহাকাশ ও ক্যালেন্ডারের এক বিস্ময়কর যোগসূত্র

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশের বিগত ২/৩ বছরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও ঘটনা প্রবাহের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সূত্র আছে কিনা? তা নিয়ে একটি ছোট গবেষণা করতে গিয়ে আমি বেশকিছু চমকপ্রদ বিষয়কে জানতে পারি। যা আমার জন্য রীতিমত আবিষ্কার। আপাতত বিষয়গুলো আমি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নথিবদ্ধ করে রাখছি। আমার গবেষণাটি গুচিয়ে আসলে আমি এটিকে একটি গুচ্ছবদ্ধ রুপদান করবো।

এই লেখায় চন্দ্রমাস ও সৌরমাসের বিন্যাস ও চক্রের একটি ধারণা তুলে ধরা হলো।

মহাকাশের বিশালতায় সূর্য আর চাঁদ যেন দুই চিরন্তন ঘড়ি। একটি নির্ধারণ করে আমাদের দিন ও ঋতু, অন্যটি সাজায় রাতের আকাশ আর জোয়ার-ভাটা। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই ঘড়ির কাঁটা আলাদা মনে হলেও, প্রতি ১৯ বছর অন্তর এরা এসে এক বিন্দুতে মেলে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিস্ময়কর মিলকেই বলা হয় ‘মেটোনিক চক্র’ (Metonic Cycle)

মহাজাগতিক সেই গাণিতিক জাদু

আমরা জানি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫.২৫ দিন। অন্যদিকে, পূর্ণিমা থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত একটি চান্দ্র মাসের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯.৫ দিন। এই দুইয়ের পার্থক্যের কারণে প্রতি বছর আমাদের ইংরেজি ক্যালেন্ডার এবং চান্দ্র ক্যালেন্ডারের মধ্যে প্রায় ১১ দিনের ব্যবধান তৈরি হয়।

কিন্তু গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেটন খ্রিস্টপূর্ব ৪৩২ অব্দে এক অদ্ভুত মিল আবিষ্কার করেন। তিনি দেখলেন, ঠিক ১৯টি সৌর বছর এবং ২৩৫টি চান্দ্র মাস প্রায় একই সময়ে (প্রায় ৬,৯৪০ দিন) গিয়ে শেষ হয়। অর্থাৎ, আজ যদি আপনার জন্মদিনে আকাশে গোল থালার মতো পূর্ণিমা দেখা যায়, তবে ঠিক ১৯ বছর পর আপনার জন্মদিনে চাঁদ আবারও ঠিক একইভাবে ধরা দেবে।

গোল্ডেন নাম্বার: পঞ্জিকার চাবিকাঠি

মেটোনিক চক্রের ১৯টি বছরের মধ্যে কোনো একটি বছর কততম অবস্থানে আছে, তাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন নাম্বার’। প্রাচীনকালে গ্রিসের নাগরিকেরা এই চক্রের বছরগুলোকে মন্দিরের দেয়ালে সোনার অক্ষরে লিখে রাখতেন বলে একে গোল্ডেন নাম্বার বলা হয়।

গণিতটি বেশ সহজ। কোনো সালকে ১৯ দিয়ে ভাগ করলে যে ভাগশেষ থাকে, তার সাথে ১ যোগ করলেই পাওয়া যায় সেই বছরের গোল্ডেন নাম্বার। যেমন, ১৯৭১ সালের গোল্ডেন নাম্বার ছিল ১৫। অর্থাৎ, এটি ১৯ বছরের একটি চক্রের ১৫তম বছর ছিল।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

মেটোনিক চক্র কেবল একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, এটি মানব সভ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে:

  • ধর্মীয় উৎসব: ইসলামি পঞ্জিকা বা হিব্রু ক্যালেন্ডারের মতো চান্দ্র পঞ্জিকাগুলো ঋতুর সাথে সমন্বয় করতে এই ১৯ বছরের হিসাব ব্যবহার করে। বিশেষ করে ইহুদি ক্যালেন্ডারে এই চক্রের ৩, ৬, ৮, ১১, ১৪, ১৭ এবং ১৯তম বছরে একটি অতিরিক্ত ‘১৩তম মাস’ যোগ করা হয়, যাতে তাদের উৎসবগুলো সবসময় সঠিক ঋতুতে পড়ে।

  • ইস্টারের তারিখ: খ্রিস্টান ধর্মে ‘ইস্টার’ উৎসবের তারিখ নির্ধারণে শত শত বছর ধরে এই মেটোনিক চক্রই প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।

  • প্রাচীন সভ্যতা: ব্যাবিলনীয় থেকে শুরু করে প্রাচীন চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও এই ১৯ বছরের রহস্য জানতেন এবং তাদের কৃষি কাজ ও রাজকীয় নথিপত্র সংরক্ষণে এটি ব্যবহার করতেন।

১৯ বছরের স্মৃতিরেখা

আপনি যদি আপনার জীবনের দিকে তাকান, দেখবেন ১৯৭১ সাল থেকে প্রতি ১৯ বছর পর পর (১৯৯০, ২০০৯, ২০২৮…) চাঁদের দশাগুলো একই ইংরেজি তারিখে ফিরে আসছে। বারের (শনিবার বা রবিবার) মিল না থাকলেও, তারিখ ও চাঁদের এই মিতালি একদম নিখুঁত।

মেটোনিক চক্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলার মাঝেও রয়েছে এক সুশৃঙ্খল গণিত। সূর্য আর চাঁদের এই ১৯ বছরের লুকোচুরি খেলা আসলে প্রকৃতির এক মহাকাব্যিক ছন্দ, যা হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে সময় চিনিয়ে আসছে।

বক্স আইটেম: মেটোনিক চক্রের সহজ হিসাব

  • ১৯টি সৌর বছর ৬৯৩৯.৬ দিন

  • ২৩৫টি চান্দ্র মাস ৬৯৩৯.৭ দিন

  • পার্থক্য: মাত্র ২ ঘণ্টা (প্রায়)

  • এই সামান্য পার্থক্যের কারণেই ২১৯ বছর পর ক্যালেন্ডারে মাত্র ১ দিনের হেরফের হয়।

আমার পরবর্তী অনুসন্ধান হলো এই ঘটনা আবহাওয়া, জলবায়ু, মানুষের মস্তিস্ক ও পৃথিবীর মানবীয় পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক বিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখে কিনা? সেটা জানতে সঙ্গে থাকুন। আশা করি হতাশ হবেন না। প্রাথমিকভাবে জানিয়ে রাখি যে, আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, প্রতি ১৯ বছর বা তার কাছাকাছি সময়ে (যেমন: ১৯৩৩, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০০৯) এই অঞ্চলে বড় ধরনের শাসনতান্ত্রিক বা সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে। ইতিহাসের এই ছন্দটি অনেকটা মেটোনিক চক্রের মতোই—একটি পর্যায় শেষ হয় এবং নতুন এক সম্ভাবনার জন্ম দেয়।

তথ্যসূত্র ইন্টারনেট, ছবি: জেমিনি

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply