সেলিমা বিবি থেকে ভারতী: এক সংগ্রামী জীবনের গল্প
সেসময় কলকাতার বিখ্যাত ব্যায়ামবিদ ছিলেন বিষ্ণুচরণ ঘোষ। তিনি রাইচাঁদ বড়ালের বাড়িতে একদিন এক তরুণীকে নিয়ে এলেন। সে সময়ে ভদ্রঘরের মেয়েদের সিনেমায় আসার কল্পনারও অতীত। কিন্তু বিষ্ণুচরণ মেয়েটির পরিবারকে রাজি করিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মহামায়া পরবর্তীতে সেলিমা বিবি নাম নেন এবং ভারতী দেবী নামে সিনেমায় নাম লেখান।
রাইচাঁদ মশাই মহামায়াকে প্রথমে গান গাওয়ার জন্য বললেন। ভয়ডরহীন ছোট মেয়েটি কে এল সায়গলের গাওয়া ‘প্রেম নহে মোর মৃদু ফুলহার’ গেয়ে শোনাল। নাচতেও জানে সে। এই প্রতিভা দেখে রাইচাঁদ তাকে নিউ থিয়েটার্সের পরিচালক নীতিন বসুর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। সেখানে তার স্ক্রিন টেস্ট নেয়া হয়, এবং তাকে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। মানে কন্ঠ এবং সৌন্দর্য ২ পরীক্ষায় উতরে গেলেন। যা আশা করা যায়নি। কারণ ১২ বছরে বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়ে রুপ-সৌন্দর্য নিয়ে উদাসীন থাকার কথা। আর সাধারণ ঘরের মেয়ে হিসেবে গান জানা ছিল বাড়তি পাওনা।
মহামায়ার জন্ম ১৯২২ সালের ২৩ অক্টোবর। সংগীতের প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। তার মেজোকাকা ভোলানাথ তাকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে প্রশিক্ষণ দিতেন। আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটি মিশনারি স্কুলে তার পড়াশোনা শুরু হলেও পরে ভারতী বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে ঠিক করা হয় বারাণসীর মণি রায়ের সঙ্গে। সংসারে গিয়ে মহামায়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
মহামায়ার বাবা তাকে কলকাতায় ফিরিয়ে এনে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। তবে সে যুগে হিন্দু বিবাহ আইনে বিচ্ছেদের ব্যবস্থা না থাকায় মহামায়াকে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করতে হয়। তার নতুন নাম রাখা হয় সেলিমা বিবি। তারপর তিনি বিচ্ছেদের আবেদন করেন। সমাজের বাইরে গিয়ে নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে ধর্ম বদলে বিচ্ছেদ এবং সিনেমায় নাম লেখানো সবই ছিল একেকটি যুদ্ধ।
বিবাহবিচ্ছেদের পর, সেলিমা নিউ থিয়েটার্সে কাজ শুরু করেন। সেখানে তার নাম বদলে রাখা হয় ‘ভারতী’। তার প্রথম ছবি ছিল ডাক্তার। ছবিটি সুপারহিট হয়। ধীরে ধীরে ভারতী হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নায়িকা। নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তিতে তার মাসিক বেতন একশো টাকা থেকে বেড়ে পাঁচ হাজারে পৌঁছায়। ভারতী প্রথমবার উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন সহযাত্রী ছবিতে। তার অভিনয় দক্ষতা তাকে নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রীতে পরিণত করে।
চলচ্চিত্রের সাফল্যের পরও ভারতীর জীবনে পরিবর্তনের ঢেউ আসে। স্বাধীনতার আগে এবং পরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্র জগৎও টালমাটাল অবস্থায় পড়ে। নিউ থিয়েটার্সের কাজ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় ভারতী বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পেলেও কলকাতার টানে ফিরে আসেন।
ভারতী শুধু নায়িকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী নারী, যিনি জীবনের প্রতিটি বাঁকেই নিজের প্রতিভা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তার যাত্রা এক সাধারণ মেয়ের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

