বিদেশে শ্রমিক ও অভিবাসী গমন: সমস্যা চিহ্নিত করে কাঠামোগত সমাধান
আমরা জানি—বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ ও অভিবাসন ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় জটিলতা রয়েছে। দক্ষতার ঘাটতি, ভাষা ও আচরণগত দুর্বলতা, রিক্রুটিং প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণ কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, দূতাবাসের সেবা-অদক্ষতা—এসব সমস্যা নতুন নয়। প্রশ্ন হলো, যখন সমস্যাগুলো জানা, তখন কেন সমন্বিত ও ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নিয়ে সমাধান করা হবে না? বাস্তবতা হলো, সঠিক নীতি, মানদণ্ডভিত্তিক যাচাই ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব। নিচে সমাধানগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যাতে সমস্যা ও উত্তরণের পথ একসঙ্গে স্পষ্ট হয়।
১) দক্ষতা-ভিত্তিক নিবন্ধন, গ্রেডেশন ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ
বিদেশগমনেচ্ছু কর্মীদের একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করে দক্ষতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন (অদক্ষ, স্বল্পদক্ষ, কর্মদক্ষ, মাঝারি দক্ষ, সুদক্ষ) নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করে প্রোফাইলভিত্তিক ডাটাবেস তৈরি করতে হবে।
-
অদক্ষ ব্যতীত সকল স্তরের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
-
প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীদের জন্য সরকারিভাবে ভাতা/প্রণোদনা।
-
ভাষা ও আচরণকে প্রতিটি কোর্সের আবশ্যিক উপাদান করা।
২) সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে জীবনমুখী দক্ষতা যুক্তকরণ
প্রতিটি নাগরিকের জন্য অন্তত একটি কর্মমুখী দক্ষতা শেখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। স্কুল পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে একটি জীবনমুখী/হার্ডস্কিল বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে।
-
প্রশিক্ষণ দেবেন পেশাজীবীরা; সরকার/কারিগরি দপ্তর শুধু পরীক্ষা নিয়ে সনদ দেবে।
-
মৌখিক ভাষা ও ব্যবহারিক দক্ষতায় আলাদা নম্বর।
-
শুদ্ধ বাংলা চর্চা ও ইংরেজি স্পিকিং বাধ্যতামূলক অনুশীলন।
৩) বাছাই প্রক্রিয়ায় ইন্টারভিউ ও আবাসিক প্রশিক্ষণ
বিদেশে শ্রমিক বাছাইয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইন্টারভিউ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে—যেভাবে VFS Global বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রক্রিয়ায় কাজ করে।
-
গ্রেডভিত্তিক বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ।
-
আবাসিক প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার।
-
অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ কর্মীদের জন্য ভাষা, আচরণ ও কর্মসংস্কৃতি মডিউল সংযুক্ত করা।
৪) রিক্রুটিং এজেন্সি সংস্কার ও জবাবদিহিতা
রিক্রুটিং খাতে স্বচ্ছতা আনতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
-
প্রমাণিত অভিযোগে লাইসেন্স স্থগিত/বাতিল।
-
জামানত শক্তিশালী করা; অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ।
-
সরকার নির্ধারিত ফরম্যাটে ফি গ্রহণ বাধ্যতামূলক; প্রয়োজনে ট্যাক্স-ভ্যাট সুবিধা।
-
এজেন্সি রেটিং ও গ্রেডেশন; পেশাভিত্তিক বিশেষায়িত এজেন্সি।
-
নিজস্ব ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে এমন এজেন্সিকে অগ্রাধিকার।
-
কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল এজেন্সি-নির্ভরতা বাধ্যতামূলক না রাখা।
৫) দূতাবাসে সেবার মানোন্নয়ন ও টাইম-ফ্রেম
প্রবাসী সুরক্ষায় দূতাবাসের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
-
দেশভেদে প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সিলর: শ্রম/মানবাধিকার, শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি, দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি।
-
সেবা মনিটরিং সেল; দেশ থেকেও অভিযোগ জানানোর তাৎক্ষণিক চ্যানেল।
-
প্রতিটি সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ।
-
নিয়োগে যোগ্যতা, মানবিকতা, আচরণ ও সামাজিক সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব।
৬) ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের রেটিং, কারিকুলাম সংস্কার ও ইন্টার্নশিপ
কারিগরি শিক্ষার বর্তমান কাঠামো আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
-
ইনস্টিটিউট রেটিং ও গ্রেডেশন।
-
১০–২০% স্থায়ী শিক্ষক; বাকিরা শিল্পখাতের পেশাজীবী।
-
ব্যবহারিক ও ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক; সুযোগ না পেলে সেলফ-ইন্টার্নশিপ অপশন।
-
ব্যবহারিক পরীক্ষায় আলাদা পাসের বিধান।
-
প্রতিবছর সিলেবাস ও শিক্ষক তালিকা নবায়ন।
৭) বিদেশি বিনিয়োগ, স্কলারশিপ ও বহুমাত্রিক কোর্স
প্রশিক্ষণ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা; ৫–১০% বিদেশি প্রশিক্ষক অনুমোদন।
-
মেধাভিত্তিক ভাতা/স্কলারশিপ।
-
স্কুলে ৬ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স; কলেজে ১ বছরের ডিপ্লোমা/হার্ডস্কিল।
-
স্বল্পশিক্ষিতদের জন্য বিশেষ ভাষা-আচরণসহ কোর্স।
-
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে জেলা-উপজেলা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে নীতিগত সহায়তা।
৮) রেমিটেন্স প্রণোদনা, পেনশন ও এক-ছাতার সেবা
রেমিটেন্সের পরিমাণভিত্তিক স্তরভিত্তিক উপাধি/স্বীকৃতি চালু করা যেতে পারে।
-
প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পেনশন স্কিম।
-
সকল সেবা এক-ছাতার নিচে—ঘুরে ঘুরে দপ্তর বদল নয়; ওয়ান-স্টপ সার্ভিস।
বিদেশে শ্রমিক ও অভিবাসন খাত শুধু রেমিটেন্সের উৎস নয়; এটি দেশের মানবসম্পদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উপস্থাপনের ক্ষেত্র। দক্ষতা-ভিত্তিক নিবন্ধন, স্বচ্ছ রিক্রুটিং, আধুনিক প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী দূতাবাস সেবা ও প্রণোদনাভিত্তিক কাঠামো—এই পাঁচ স্তম্ভে সংস্কার ঘটাতে পারলে খাতটি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ হবে। সমস্যাগুলো আমরা জানি; এখন প্রয়োজন সমন্বিত প্রয়োগ, সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা এবং কঠোর জবাবদিহিতা।

