বাংলাদেশী নার্সদের বিদেশে কর্ম সংস্থান
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
এই মুহুর্তে বাংলাদেশ থেকে নার্স পাঠানোর চাহিদা আছে বিশ্বের সব উন্নত দেশে এবং সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে। এই শ’খানেক দেশে লক্ষ লক্ষ নার্স পাঠানো যেতে পারে। নার্সিং সেবায় ভাল বেতন চাকরীর স্থায়িত্ব আছে বলে যারা ‘‘ব্রাদার’’ ও ‘‘সিস্টার’’ কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করবেন তারা চাইলে পরিবার নিয়েও সেসব দেশে বসবাস করতে পারে। এমনকি ভাল বেতনের কারণে অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি ভাল ছুটিও থাকে।
আমরা যেভাবে শ্রমিক ও গৃহকর্মী পাঠিয়ে একদিকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও তদারকী করা যায় না। অন্যদিকে রেমিটেন্স এর হারও খুব কম। নার্সদের দ্বারা রেমিটেন্সও আসতে পারে বেশী। দেশের সুনাম হতে পারে। দক্ষ নার্স চিকিৎসকের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিভিন্ন দেশে দক্ষ বাংলাদেশী নার্স থাকলে সেসব দেশে বাংলাদেশী রোগীদের চিকিৎসার সুযোগও অবারিত হবে। এছাড়া বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে যারা দেশে আসবে তারা দেশের এই খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারবে।
এক বছরে কুয়েত ও সৌদি আরবে প্রায় ১ হাজার নার্স পাঠানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, পেশাগত পরিবেশ এবং ভাষাগত দুর্বলতার কারণে ২০০ জনকে দেশে ফিরতে হয়েছে। এ ছাড়া জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০ হাজারের মতো দক্ষ নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। দক্ষতার অভাবে নার্সরা আবেদন করতে পারছেন না। সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া ২ হাজার নার্স নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে প্রার্থীকে ইংরেজি ভাষাগত দক্ষতার কোর্স ‘আইইএলটিএস’ থাকা লাগবে। এমন দক্ষ নার্স মিলছে না। এই সংকট নিরসনে কানাডা ও যুক্তরাজ্য ঢাকায় নার্সিং প্রশিক্ষণ একাডেমি তৈরিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। (সূত্র: সমকাল)
একটি মজার বিষয় হলো, আমরা অনেকে জানি না, বাংলাদেশ থেকে নার্স পাঠানোর বিষয়ে আন্তজাতিক নিষেধ রয়েছে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হতে হবে ১: ৩। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের সঙ্গে অন্তত ৩ জন নার্স থাকতে হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিবন্ধিত দেশে চিকিৎসক রয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৩। সেই অনুযায়ী দেশে নার্স প্রয়োজন ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৯।
তবে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি কর্মরত নার্স ৯৫ হাজার ১৬৮ জন, যা চাহিদার তুলনায় বেশ কম। বর্তমানে দেশে ৬৭টি সরকারি ও ৩৭২টি বেসরকারি নার্সিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিবছর ৩৫ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। পড়ালেখা শেষ করে প্রতিবছর বের হয় ২৫ হাজারের মতো নার্স।
দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে চেম্বারে ডাক্তারেরা শুধু শত শত রোগী দেশে আর টেস্ট দেয়। সেখানে নার্সতো নেই বরং সিরিয়াল দেয়ার জন্য ১০ জন ডাক্তারের ১ জন সহযোগী থাকে। সে আবার অল্পশিক্ষিত এমনকি সাধারণ আচরণ সম্পর্কিত জ্ঞানও তার নেই। দৈনিক ১০০০ টাকা করে ২শ রোগী দেখা ডাক্তার যদি ৩ জন নার্স এর পরিবর্তে ৫ জন ডাক্তারের সাথে শেয়ারে ১ জন পিয়ন নিয়োগ দেয় তাহলে দেশেইতো নার্সদের অবহেলা করা হয়।
তাহলে কিভাবে আমরা নার্সদের কাজে লাগাবো? এবং বিদেশ পাঠাবো। আসুন অন্যান্য সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
এবার আসি কেন আমরা এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছিনা?
• জালিয়াতি ও দূর্ণীতি
প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে জাল সনদ ও ভূয়া প্রশিক্ষণ দিয়ে নার্স বা কিছু স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হয়। যারা পরে কাজ করতে না পেরে ফিরে আসে। শুধু তাই নয়। সেখানে দেশের সুনাম নষ্ট হয়। পরে আর লোক পাঠানো যায় না।
• শিক্ষার মান ও দক্ষতার অভাব
বাংলাদেশে শিক্ষার সার্বিক মানের মতো নার্সিং শিক্ষার মানও ভয়াবহ রকমের খারাপ। এখানে ব্যবহারিক শিক্ষা কম এবং গ্রন্থগত শিক্ষা যা রয়েছে তা খুব দূর্বল। ফলে বিশ্বমানের নার্স তৈরী হচেছ না।
• ভাষাগত দূরত্ব
আমাদের দেশের কর্মীরা বাংলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভাষা জানেন না। বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যে মিশ্র ও জটিল বাংলায় কথা বলে তাতে তারা ভাল বাংলাও জানে না। বিশেষ করে ইংরেজী ও সংশ্লিষ্ঠ দেশের ভাষা না জানাতে তাদের কাজের ক্ষেত্র যেমন সীমিত হয়ে যায় তেমনি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি একটি বাঁধা।
বাংলাদেশ প্রাইভেট নার্সিং কলেজ অ্যান্ড অ্যালাইড হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার ইনস্টিটিউট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু হাসনাত মো. ইয়াহিয়া সমকালকে বলেন, দেশে দক্ষ নার্সিং জনবলের ব্যাপক ঘাটতি। এই পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহীদের সংখ্যা কম। তা ছাড়া নার্সিং শিক্ষা, সেবা প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো বিনিয়োগকারীও কম। তাহলে বুঝতেই পারছেন সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি গোলাম মোর্শেদ বলেন, দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নার্স পাঠানো যায় না। দেশের নার্সিং শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিদেশের নার্সিং শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। মানহীন নার্সিং প্রতিষ্ঠান এখন ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে, এটাও সংকটের কারণ।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশ বাংলাদেশে নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে চেয় কেন পারছেনা? সে হাড়ির খবরও একদিন লিখব যদি সম্ভব হয়।
এই সমস্যা থেকে নিষ্কৃতির উপায় কি?
• স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্স নিয়োগের কাজে আদম ব্যবসায়ী রিক্রুটিং এজেন্সিকে না দিয়ে সরাসরি নার্সিং ইনস্টিটিউটকে দেয়া দরকার। এবং নার্সদের গ্রেডেশান ও দক্ষতা নিশ্চিত করে আলাদা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো এজেন্সি দ্বারা তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নিশ্চিত করে তারপর বিদেশ গমনের ব্যবস্থা করতে হবে।
• সেবামূলক পেশায় বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে কর্মীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের বাড়তি অর্থ আদায় বা বাড়তি টাকা খরচ করা বন্ধ করতে হবে। শুধুমাত্র ভিসা ফি এর সাথে ২/৩ হাজার টাকা প্রসেসিং ফি এর বেশী কোনো এজেন্সি নিলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
• নার্সিং শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। বিদেশী মিশনারী হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটকে দেশে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে অন্তত ৫% বিদেশী ডাক্তার ও নার্সকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। যাতে করে তাদের সাথে একসাথে কাজ করে দেশীয় ডাক্তার ও নার্সদের পেশাদার মনোভাব ও দক্ষতা উন্নত হয়।
• নার্সিং প্রশিক্ষণে ৬ মাস থেকে ১ বছরের কোর্সে ইংরেজী শিক্ষা এবং ততোধিক সময়ের কোর্সে যেকোনো একটি তৃতীয় ভাষা শিক্ষার কোর্স অন্তভূক্ত করতে হবে।
• দেশীয় হাসপাতাল ও চেম্বারে ডাক্তারদের সহকারী হিসেবে নার্স নিয়োগ বাধ্যতামূলক বা ক্রমান্বয়ে শর্তসাপেক্ষ করতে হবে।
• বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১ ডাক্তার=৩ নার্স হিসেবে বাংলাদেশে নার্সএর সংখ্যা কম দেখাচ্ছে সেজন্য বিদেশের অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে নার্স নিতে চায়ও না। প্রথমত- যেসব ডাক্তার হাসপাতালে রোগী দেখেনা শুধু প্রেসক্রিপশন লিখে তাদের তালিকা ডাক্তার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের জন্য ১ ডাক্তার-৩ নার্স শিথিল করার আবেদনও করা যেতে পারে। তৃতীয়ত- দেশে ডাক্তারের সহযোগীদের জন্য নার্সিং শিক্ষা (৬ মাসের কোর্স) হলেও বাধ্যতামূলক করতে হবে। যারা কোর্স ব্যতিত ৩ বছরের বেশী কাজ করছে তাদেরকে মিডওয়াফারী সনদ বা দেশে কাজ করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী বা নার্স হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে প্রয়োজনে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে যদি নার্সের সংখ্যার অনুপাত বাড়ে তাহলে সহজে নার্সদের বিদেশে পাঠানো যাবে।
• মেডিক্যাল কলেজগুলোতে নার্সিং কোর্স অন্তভূক্ত করতে হবে। এটা কারিগরি শিক্ষাবোর্ড থেকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের অধীনে দিতে হবে।
• নার্সদের অবশ্যই ব্যবহারিক ও ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করতে হবে। নার্স হিসেবে চাকরী করার জন্য কমপক্ষে ৩ মাস কোনো সরকারী হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার বাধ্যতা রাখতে হবে।
* দেশে কমপক্ষে ৫ ধরনের নার্সিং কোর্স রাখতে হবে।
বাংলা। ইংরেজী। আরবি। কোরিয়ান। স্পেনিশ। জার্মান। এছাড়া ফ্রেন্স থাকতে পারে।
• দেশের ৮টি বিভাগে ৮ দেশের বিনিয়োগে ৮টি আন্তজাতিক মানের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল তৈরীর উদ্যোগ নিতে হবে। যেখানে অন্তত ১০% বিদেশী ডাক্তার, ১০% বিদেশী টেকনেশিয়ান ও ১০% বিদেশী পেশাদার নার্স কাজ করতে পারবে।
• দেশের ১৯টি বৃহত্তর জেলায় ১৯টি আন্তজাতিক মানের নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে দেশী বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে মাননীতি কঠোর করে বিনিয়োগ নীতি শিথিল করতে হবে। প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করতে সহযোগিতা করতে হবে।
• নার্সিং শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা, আচরণ ও বিভিন্ন দেশের আইন কানুন অন্তভূক্ত করতে হবে।
মোটকথা সার্বিক শিক্ষার মান উন্নয়ন ও পেশাগত মনোভাব উন্নত করার পাশাপাশি চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানের সাথে কাজ না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

