ক্রস বর্ডার ই-কমার্স

বাংলাদেশ ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স টাস্কফোর্স

বাংলাদেশ ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স টাস্কফোর্স (BCETF)

দীর্ঘদিনের নীতিগত স্থবিরতা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতা দূর করে বাংলাদেশের ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স খাতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে উন্নীত করতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং নির্বাহী কর্তৃত্বসম্পন্ন “বাংলাদেশ ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স টাস্কফোর্স (BCETF)” গঠনের বিস্তারিত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ভিশন ও মূল লক্ষ্য

  • ভিশন: ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোক্তাদের (SMEs & Large Enterprises) জন্য একটি নির্বিঘ্ন, ডিজিটাল ও বৈশ্বিক কাস্টমস-বান্ধব ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স ইকোসিস্টেম তৈরি করা।

  • মূল লক্ষ্য: দ্বিমুখী আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সহজ করা, কাস্টমস প্রক্রিয়া পেপারলেস করা, শিপিং খরচ কমানো এবং আগামী ৩ বছরের মধ্যে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।

২. টাস্কফোর্সের সাংগঠনিক কাঠামো (Governance Structure)

টাস্কফোর্সটি কোনো সাধারণ পরামর্শক কমিটি হবে না; এটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে একটি ‘স্পেশাল পারপাস বডি’ হিসেবে কাজ করবে, যাতে এর সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নে কোনো মন্ত্রণালয় আমলাতান্ত্রিক বাধা তৈরি করতে না পারে।

                  [ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO) ]
                                 │
                 ┌───────────────┴───────────────┐
                 ▼                               ▼
       【 স্টিয়ারিং কমিটি 】             【 সচিবালয় / পিএমইউ 】
 (নীতিনির্ধারণী ও নির্বাহী অনুমোদন)     (সমন্বয় ও দৈনিক কার্যপরিচালনা)
                 │
 ┌───────────────┼────────────────┬───────────────┐
 ▼               ▼                ▼               ▼
【আর্থিক উইং】 【কাস্টমস ও রাজস্ব উইং】 【লজিস্টিকস উইং】 【প্রযুক্তি ও পলিসি উইং】

ক) স্টিয়ারিং কমিটি (নীতিনির্ধারণী ও নির্বাহী পর্যায়)

  • চেয়ারপারসন: মুখ্য সচিব/সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

  • কো-চেয়ারপারসন: সভাপতি, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (e-CAB) এবং সিনিয়র সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

  • স্থায়ী সদস্যবৃন্দ:

    • ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক (বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ)।

    • সদস্য (কাস্টমস: নীতি ও আইসিটি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)।

    • সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।

    • সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ।

    • সভাপতি, বেসিস (BASIS) এবং সভাপতি, বাফেডা (BAFFA)।

খ) ওয়ার্কিং গ্রুপ (বাস্তবায়ন পর্যায়)

প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য ৪টি ডেডিকেটেড ওয়ার্কিং গ্রুপ থাকবে, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা এবং বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন।

৩. চার উইং বা ওয়ার্কিং গ্রুপের সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধি (Action Plan)

উইং ১: আর্থিক ও পেমেন্ট ইকোসিস্টেম (Financial Wing)

  • টার্গেট ১ (আউটবাউন্ড পেমেন্ট): ফেসবুক, গুগল, টিকটক বা আমাজনে বিজ্ঞাপনের (Ad-spend) জন্য এবং বৈশ্বিক সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশনের জন্য বাৎসরিক ডলার এনডোর্সমেন্টের সীমা বর্তমানের চেয়ে যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি ও প্রক্রিয়া সহজ করা।

  • টার্গেট ২ (ইনবাউন্ড রেমিট্যান্স): পেপ্যাল (PayPal) বা সমমানের আন্তর্জাতিক মার্চেন্ট পেমেন্ট গেটওয়ে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ কার্যকরের আইনি জটিলতা দূর করা। স্ট্রাইপ (Stripe) বা ওয়াইজ (Wise) এর সাথে লোকাল ব্যাংকের সরাসরি এপিআই (API) ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করা।

  • টার্গেট ৩ (রিফান্ড ম্যানেজমেন্ট): কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেতা পণ্য ফেরত দিলে বা অর্ডার ক্যানসেল করলে কাস্টমারকে কীভাবে দ্রুত এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রিফান্ড পাঠানো যাবে, তার জন্য পৃথক ‘এসক্রো (Escrow) ও রিফান্ড গাইডলাইন’ তৈরি।

উইং ২: কাস্টমস, ভ্যাট ও শুল্কায়ন নীতি (Customs & Revenue Wing)

  • টার্গেট ১ (ডি মিনিমিস নীতি): বাংলাদেশে ইনবাউন্ড ই-কমার্স পার্সেলের জন্য অন্তত ১৫০ ডলার (বা সমপরিমাণ) পর্যন্ত শুল্কমুক্ত (De Minimis) সুবিধা দেওয়া। একইভাবে আউটবাউন্ড (রপ্তানি) ই-কমার্স পার্সেলের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শুল্ক বা কাগজপত্র ছাড়া পণ্য ছাড়করণের সীমা ১,০০০ ডলারে উন্নীত করা।

  • টার্গেট ২ (রিভার্স লজিস্টিকস ফ্রেমওয়ার্ক): বাংলাদেশ থেকে পাঠানো পণ্য বিদেশে রিজেক্ট বা রিটার্ন হলে, তা যখন বাংলাদেশে ফেরত আসবে, তখন ট্র্যাকিং আইডি যাচাই করে তাকে ‘পুনরায় আমদানি’ (Re-import) হিসেবে গণ্য না করে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া।

  • টার্গেট ৩ (ই-কমার্স কাস্টমস কোড): সাধারণ কমার্শিয়াল বাল্ক রপ্তানির HS Code থেকে আলাদা করে ই-কমার্স রিটেল পার্সেলের জন্য একটি বিশেষায়িত বা সমন্বিত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স কোড চালু করা।

উইং ৩: লজিস্টিকস ও অবকাঠামো (Logistics Wing)

  • টার্গেট ১ (গ্রিন চ্যানেল স্থাপন): হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রধান প্রধান এয়ার কার্গো কমপ্লেক্সে ই-কমার্স পার্সেল দ্রুত স্ক্যান ও খালাসের জন্য ডেডিকেটেড ‘ই-কমার্স গ্রিন চ্যানেল’ স্থাপন।

  • টার্গেট ২ (ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন): বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে (BPO) আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত করা। সরকারি ডাক সেবার মাধ্যমে কম খরচে ট্র্যাকিং সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক ডেলিভারি নিশ্চিত করতে ‘ই-প্যাকেট’ (e-Packet) সেবা চালু করা।

  • টার্গেট ৩ (বন্ডেড ওয়্যারহাউজ নীতি): বিদেশি লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের লক্ষ্যণীয় আন্তর্জাতিক বাজারে (যেমন- আমেরিকা বা মিডল ইস্ট) ‘ওভারসিজ ওয়্যারহাউজ’ স্থাপনের জন্য নীতিগত ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া।

উইং ৪: প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি (Tech & Policy Wing)

  • টার্গেট ১ (ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ইন্টিগ্রেশন): কাস্টমস (Asycuda World), বাংলাদেশ ব্যাংক, এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যাক-এন্ড ডাটাবেজ এক সুতোয় বাঁধা, যাতে পণ্য বিক্রির সাথে সাথে কাস্টমস ও ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাটা পেয়ে যায় (Paperless Pre-clearance)।

  • টার্গেট ২ (এসএমই অনবোর্ডিং): দেশের প্রান্তিক হস্তশিল্প, জামদানি, মৃৎশিল্প বা পাটজাত পণ্যের উদ্যোক্তাদের আমাজন, ইবে বা ইtsy-র মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়া।

৪. বাস্তবায়ন সময়সীমা ও জবাবদিহিতা (Timeline & Accountability)

টাস্কফোর্সের কাজকে গতিশীল রাখতে এটিকে “১০০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান” মডেলে পরিচালনা করতে হবে:

সময়সীমা লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা
প্রথম ৩০ দিন টাস্কফোর্স গঠন, গেজেট প্রকাশ এবং ৪টি ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম যৌথ সমন্বয় সভা। বাধাগুলো চিহ্নিত করে খসড়া আইনের সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি।
১ থেকে ৬০ দিন বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর কর্তৃক ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের জন্য বিশেষ সার্কুলার/এসআরও (SRO) জারি (পেমেন্ট ও রিটার্ন পলিসি সহজীকরণ)।
৬১ থেকে ৯০ দিন বিমানবন্দর কাস্টমসে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ‘ই-কমার্স গ্রিন চ্যানেল’ ও ডাক বিভাগের ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক উদ্বোধন।
১০০তম দিন পূর্ণাঙ্গ “জাতীয় ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নির্দেশিকা” বাস্তবায়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রথম প্রোগ্রেস রিপোর্ট পেশ।

৫. সফলতার প্রধান শর্তাবলি (Key Success Factors)

১. আইনি বাধ্যবাধকতা: টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তসমূহ কেবল সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্টিয়ারিং কমিটির অনুমোদিত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করতে বাধ্য থাকবে।

২. নিয়মিত জবাবদিহিতা: প্রতি ৩ মাস পর পর টাস্কফোর্সের অগ্রগতি প্রতিবেদন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিকট পেশ করতে হবে।

৩. তহবিল বা বাজেট বরাদ্দ: আইসিটি বিভাগ বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই টাস্কফোর্সের কার্যক্রম পরিচালনা এবং ডাক বিভাগের অবকাঠামো আধুনিকায়নের জন্য একটি বিশেষ ‘ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ গঠন করা।

উপসংহার: এই রূপরেখা অনুযায়ী একটি সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা হলে তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার “সাইলো” (Silo) বা দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলবে। এর ফলে দেশের ই-কমার্স উদ্যোক্তারা অতি দ্রুত বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূলধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

লেখাটি ধারাবাহিক প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আলোকে লেখা হয়েছে।

আইডিয়া জাহাঙ্গীর আলম শোভন