বাংলাদেশে ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। প্রায় এক দশক ধরে চলা এই আন্দোলনের ফলে সামরিক জান্তা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এ আন্দোলনে ছাত্র, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ ছিল ব্যতিক্রমী এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্দোলনের পটভূমি
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। সামরিক আইন জারি করে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সংবিধান স্থগিত করেন। তার শাসনামলে দমনপীড়ন, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলো এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, যা ক্রমে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনের বিস্তার ও সংগঠন
দীর্ঘ ৯ বছরব্যাপী আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৯০ সালে। এই সময় রাজনৈতিক দলগুলো ৮, ৭ এবং ৫ দলীয় জোট গঠন করে এবং আন্দোলন পরিচালনার জন্য তিন জোটের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও দুটি জোট গড়ে ওঠে: ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সংগ্রামী ছাত্রজোট।
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে, যখন জেহাদের মরদেহ সামনে রেখে ২৪টি ছাত্র সংগঠন মিলে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন করে। এরপর আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি
হরতাল: প্রায় ৩২৮ দিন
অবরোধ: ৭০ দিন
গুম ও শহীদ: প্রায় ৩৭০ জন
অর্থনৈতিক ক্ষতি: প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা
এই গণআন্দোলনের প্রভাবে এরশাদ সরকার ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ আরোপ করেন এবং সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে দেন। সাংবাদিকরা প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু করলে ২৮ নভেম্বর থেকে সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।
সংবাদপত্রের প্রতিক্রিয়া
যদিও আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ ছিল, তবে ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের পর সংবাদপত্রের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। পরবর্তী দুই সপ্তাহে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, সংবাদ এবং বাংলাদেশ অবজারভারের মতো পত্রিকাগুলোতে গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত বিশদ সংবাদ প্রকাশিত হয়। ১৪ দিনে মোট ৫৬টি সম্পাদকীয় এবং ৬৪টি পাঠক চিঠি প্রকাশিত হয়, যা গণঅভ্যুত্থানের প্রতি জনগণের ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায়।
৩ জোটের রূপরেখা ও ১০ দফা
আন্দোলনের সফল সমাপ্তির জন্য এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ৩ জোটের রূপরেখা প্রণয়ন করে। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার:
৩ মাসের মধ্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন
নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন
সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি
রাজনৈতিক আচরণবিধি:
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দলগুলোর প্রতিশ্রুতি
স্বৈরাচারের দোসরদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা
নির্বাচন পরবর্তী সরকারের করণীয়:
সংসদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা
কালো আইন বাতিল করা
সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর
আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি
১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
উপসংহার
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। স্বৈরাচারবিরোধী এই আন্দোলন গণমানুষের অংশগ্রহণে এবং ছাত্র-রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে সফল হয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার কাছে কোনো স্বৈরশাসন টিকে থাকতে পারে না। গণতন্ত্রের এই জয়গাথা ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

