জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে

জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে

জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অসাধারণ ঘটনা। এত অল্পসময়ে দেশে রাষ্ট্রীয় ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে এত প্রাণহানি স্বাভাবিক অবস্থায় মানে যুদ্ধাবস্থা ব্যতিত কখনো ঘটেনি। ১৭ বছরে ধরে চলমান আন্দোলন সংগ্রাম ৩৬ দিনের অভ্যুত্থানে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী স্বৈরশাসক বিতাড়িত হয় তার সমস্ত সংগঠনসহ। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তাই জুলাই বিপ্লবকে যদি কেউ মূল্যায়ন করতে, কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় হয় অথবা ব্যর্থ করার প্রয়াস চালায় অথবা সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে এর সুফল জনগন ভোগ করতে না পারে। তাহলে আমাদের মতো অভাগা জাতি পৃথিবীতে আর থাকবেনা।

হাজার মানুষের আহাজারী, নির্যাতন ভোগ, লক্ষ জনতার মামলা নির্যাতন, দেশের ১৭ কোটি জনতার উপর অর্থণৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে চলা ১৭ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম ৩৬ দিনের অভ্যুত্থানে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছে। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে খুনি রাক্ষস তার চামচিকাদের নিয়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছে। কিশোর তরুনদের অসীম সাহসিকতা তাদের ১৬শ প্রাণের আত্মাহুতি মানুষকে ভরসা দিয়েছে, আস্থা দিয়েছে। নানা পেশা, দল, ধর্ম, এলাকা, বয়স, মত এমনকি ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের মানুষকে এক কাতারে এনে ধাবিত করেছে হিংস্র রাক্ষসের অস্ত্রের মুখে। স্বৈরশাহীন সমস্ত দেয়াল ধসে পড়েছে রক্তের স্রোতে। এই ঘটনা হাজার বছরের বাঙালী ও বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করবে।
আপনারা অবগত আছেন যে, ১৬শ শহীদ পরিবার আজো তাদের অফিসিয়াল স্বীকৃতি ও সম্মান পায়নি। হাজারো আহতযোদ্ধা এখনো কাতরাচ্ছে কেউ বাসায় অঙ্গ হারিয়ে কেউবা বেকার। সরকার চিকিৎসার ঘোষণা দিয়েও ঠিকভাবে বিষয়টি ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি। জুলাই ফাউন্ডেশনে জনসাধারণ ও প্রবাসীদেরকে অনুদান দেয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়েছে কিনা সেটাও পরিষ্কার করা হয়নি।

দেশের দেশের বিরাট অংশ লুটপাটে ব্যস্ত ছিল, আরো একটা বড় অংশ তাঁবেদারীতে ছিল নিমজ্জিত, দেশের বেশীরভাগ মানুষ ছিল চুপ, যারা প্রতিবাদ করেছিল তারা নির্যাতিত। সেখানে ছাত্ররা কোনো অবস্থায় নতি স্বীকার করেনি। পিছু হটেনি, আপোষ করেনি, তাদের এই অগ্রগামী মনোভাব আমাদের অনেক বড় সম্পদ। আজ এই বীরদের সঠিকভাবে সম্মানিত করতে না পারলে জাতিকে অনেক বেশী মূল্য চুকাতে হবে।
তাই, আমি সম্মিলিতভাবে এই বিষয়ে সরকারকে করনীয় সম্পর্কে তুলে ধরছি। একজন স্বেচ্ছাসেবি হিসেবে এই বিষয়ে আমার কিছু করার থাকলে আমি তা কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়া করতে প্রস্তুত রয়েছি।

প্রথম অধ্যায়: ধারণা ও পটভূমি
পরিচ্ছেদ -১: কেন জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কদের আলাদা সম্মান দেখানো প্রয়োজন?
• জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
• জুলাই আন্দোলনের নায়কেরা নিজেরা নিজেদের গরজে আন্দোলনে এসেছে।
• যে সময় দেশে মানুষকে টাকায় কেনা সহজ সে সময় তারা আন্দোলন থেকে সরে দাড়ায়নি।
• যে সময় বেশীরভাগ মানুষ মুখ খুলতে ভয় পায় সে সময় তারা আন্দোলনের ডাক দেয়া।
• যে সময় বিশাল জনগোষ্ঠি চামচামি আর লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত সে সময় আন্দোলন ধরে রাখে।
• নির্যাত প্রলোভন কোনো কিছুতে তারা রাজপথ থেকে সরে দাঁড়ায়নি।
• লাশের সারি দেখেও তারা নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যায়নি।
• তারা কোনো বিনিময় ছাড়াই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
• তারা ভবিষ্যতে কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা ছাড়াই নিজেদের জীবন বাজি রেখেছে।
• কোনো বদ নেতা ছাড়াই রাক্ষস শাহীর বিরুদ্ধে দাড়ানোর সাহস দেখিয়েছে।

পরিচ্ছেদ ২: কেন জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে?
• জুলাই আন্দোলন নির্দলীয় নিরপেক্ষ হওয়ায় সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন পেয়েছে।
• আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ব্যক্তিরা আপোষ রফা করেনি।
• আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ছিল। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
• এই প্রথম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়ে আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
• নারী ও ছাত্রীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল।
• ছাত্রলীগের প্রতিরোধ আন্দোলনকে বেগাবান করেছিল।
• ডিবি হারুনের ষড়যন্ত্র আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
• আবু সাইদ ও মীরমুগ্ধের মৃত্যু আন্দোলনে বারুদ লাগিয়ে দিয়েছিল।
• সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা আন্দোলনের পরিসমাপ্তি টেনে দিয়েছিল।

পরিচ্ছেদ ৩: আন্দোলন ব্যর্থ হলে কি পরিণতি হতো
• সন্ত্রাসী ও জঙ্গি আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ঘটনার সাথে জড়িয়ে শ’খানেক তরুনকে ফাঁসি দেয়া হতো।
• সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ক্রস ফায়ারের নামে হাজার দুয়েক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হতো।
• বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ তরুনের জীবন ধ্বংস করে দেয়া হতো।
• কয়েকহাজার পরিবারকে হামলা মামলা দিয়ে তছনছ করে ফেলা হতো।
• কয়েক হাজারের পরিবারের সম্পত্তি লুট ও জবর দখল করা হতো।
• হামলা ও আটকের নামে হাজারো ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হতো।

দ্বিতীয় অধ্যায়:
পরিচ্ছেদ ০১: আন্দোলনের বীর শহীদদের জন্য করনীয়: প্রথম ধাপ
• মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জুলাই আন্দোলন অধিদপ্তর গঠন করা। (কাঠামো পরবর্তিতে পেশ করা হবে)
• আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করা। ( এবং গবেষণার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা।
• আন্দোলনের সকল তথ্য সম্বলিত ওয়েবপোর্টাল চালু করা। ( ওয়েব ডিজাইনে সহযোগিতা করতে চাই)
• সকল শহীদের ছবি, জীবনী, বিবরণ ও তালিকা প্রকাশ করা। ( মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করবে)
• সকল আহতদের তালিকা ছবি, জীবনী ও ঘটনাসহ বুকলেট প্রকাশ করা। ( মন্ত্রণালয় এজন্য কমিটি গঠন করবে)
• এলাকাভিত্তিক স্মরনীকা প্রকাশ করে ঘটনাসমূহ তুলে ধরা। ( সামাজিক সংগঠনকে এজন্য দায়িত্ব দেয়া)
• সকল শহীদদের কবরকে অভিন্ন ফলকে চিহ্নিত করা। (জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে)
• সকল শহীদের নামে কোনোকিছুর নাম করণ করা, রাস্তা, গ্রাম, পাড়া, মহল্লা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভবন ইত্যাদি।
• সকল আহতদের নামে যার এলাকার রাস্তার নামকরণ করা। ( জেলাপ্রশাসক কাজটি করবেন)
• সকল আহতদের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা। ( এটি কিভাবে সম্পন্ন হবে তা উল্লেখ আছে সেকশান ০০ তে)

পরিচ্ছেদ ০২: আন্দোলনের বীর শহীদদের জন্য করনীয়: দ্বিতীয় ধাপ

• জুলাই ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে অনুদান গ্রহণ করা হবে। খাত ভিত্তিক ও ব্যক্তি পরিচয় ভিত্তিক।
• নিহতদের পরিবারের জন্য ভাতা ও তাদের ভাই-বোন ও সন্তানের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা।
• আহতদের জন্য ভাতা, ঋণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা
• অংশগ্রহণকারীদের জুলাই ফাউন্ডেশন বা জুলাই আন্দোলন পরিষদ নামে মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পরিষদ গঠন করে তার সদস্যপদ প্রদান করা । কোন প্রকিয়া সদস্য চিহ্নিত ও পদপ্রদান করা হবে তা পরে করা যাবে।
• তালিকা থেকে যাচাই বাছাই করে সরাসরি ও সম্মখ মাঠে জড়িতদের ‘‘জাতীয় বীর’’ ঘোষণা করা।
• বিগত ১৭ বছর ধরে যারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত তাদেরকে ‘‘সহযোদ্ধা’’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া।

তৃতীয় অধ্যায়: বাস্তবায়ন কৌশল
পরিচ্ছেদ ১: জুলাই আন্দোলন অধিদপ্তরের পরিকাঠামো

মহাপরিচালক ১ জন: আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে নিয়োগ (শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বিবেচ্য)
সহকারী পরিচালক ৩ জন: আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে নিয়োগ (শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বিবেচ্য)
উপ-পরিচালক ৫ জন: আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে নিয়োগ (শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বিবেচ্য)
অন্যান্য কর্মকর্তা: বিধি মোতাবেক ( শিক্ষা ও অবদান অনুসারে)

পরিচ্ছেদ ২: জুলাই আন্দোলন গবেষণা সেল

প্রধান নির্বাহী ১ জন: ( শিক্ষা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে)
নির্বাহী সদস্যগণ ২ জন: শুধুমাত্র কার্যক্রম চলাকালীন নিয়োগ করা হবে।
অন্যান্য কর্মকর্তা: শুধুমাত্র কার্যক্রম চলাকালীন নিয়োগ করা হবে।

পরিচ্ছেদ ৩: জুলাই আন্দোলন পরিষদ এর কাঠামো

সভাপতি ১ জন: সরকার কতৃক মনোনীত
সহ-সভাপতি ২ জন: সরকার কতৃক মনোনীত
সাধারণ সম্পাদক ১ জন: সরকার কতৃক মনোনীত
সহ সাধারণ সম্পাদক ২ জন: সরকার কতৃক মনোনীত
অন্যান্য সম্পাদক ৭ জন: সরকার কতৃক মনোনীত
সদস্য: (সংখ্যাহীন)

পরিচ্ছেদ ৪: চিকিৎসার খরচ প্রদানের কৌশল ও প্রকিয়া

* যারা ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে তাদেরকে ১৫৮ সমন্বয়কের কমপক্ষে ২ জনের সুপারিশ ও ডাক্তারের সনদ নিশ্চিত করা।
* তাদেরকে চিকিৎসার খরচ বিল ভাউচার নিয়ে বাবদ ব্যাংক হিসেবের কিছু অর্থ প্রদান করা।
* আগামী দিনের খরচসমূহ প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের একটি টিমকে দায়িত্ব দেয়া।
* খরচ হাসপাতাল কতৃপক্ষকে সরাসরি দেয়ার ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া।
* হাসাপাতালকে এই ব্যাপারে নোটিশ করা যে দপ্তর থেকে অর্থ দিতে দেরী হলে যাবতীয় সেবা প্রদান করা।
* বিশেষ টিমকে তাৎক্ষনিকভাবে জরুরী খরচ প্রদানের ক্ষমতা দেয়া।

পরিচ্ছেদ ৫: নিহতদের পরিবারকে সুবিধা প্রদান করার প্রক্রিয়া

• নিহতদের তালিকা প্রস্তুত করা ও চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা।
• নিহতদের পরিবারের সদস্যদের চিহ্নিত করা তাদের সনদ প্রদান করা।
• আইন অনুসারে একজন নমিনি নির্বাচন করা ও তার নামে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা।
• একই প্রকিয়ায় অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা।

উপসাংহার:
সরকার কতদিন টিকবে, মেয়াদ কবে হবে? নির্বাচন এ বছর হবে না সে বছর হবে? এসব সিদ্ধান্তের জন্য অন্যান্য কাজ ও সিদ্ধান্তকে দিনের পর দিন বিলম্বিত করা হলে ধরে নিতে সরকার জেনে বা না জেনে কোনো ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে বসে আছে। তাই সরকার যতদিন থাকুক আর নির্বাচন যতদিনে হোক সেগুলো ভুলে গিয়ে কাজ শুরু করে করতে হবে। ছোট ছোট লক্ষ্য বা পরবর্তী লক্ষ্য ঠিক করে প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। জরুরী লক্ষ্যসমূহ পূরণে এক ধরনের কার্যক্রম, স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যপূরণে ভিন্ন পদক্ষেপ, মধ্যমেয়াদী কর্মসূচী বাস্তবায়নে আলাদা কর্মসূচী এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্য তদানুযায়ী কার্যবিধি বাস্তবায়ন করতে হবে।