Education System

বাংলাদেশের শিক্ষার ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি সমূহ

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থারত্রুটি সমূহ

১। কর্মমূখী শিক্ষার অভাব:
বেশীরভাগ ক্লাস ও কোর্স কর্মমূখী নয়। ব্যবহারিকের চেয়ে তাত্ত্বিক বিষয় বেশী। যেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় চাকরী ক্ষেত্র নেই। আবার চাকরী ক্ষেত্রে যেসব কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে। সেসবের সাথে সমন্বয় করে নতুন সিলেবাস পাঠ্যত]ক্রম ও কোর্স চালু হয়না। আর যখন কিছু কিছু হয় তখন অনেক দেরী হয়ে যায়। কারণ ৫/১০ বছরে পৃথিবী অনেক দূর এগিয়ে যায়।

২। মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব:
শিক্ষকদের নিজেকে আপডেট রাখার কোনো মানসিকতাই নেই। সরকারী প্রশিক্ষণ জোরদার নয়। আবার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে শিক্ষকদের অনীহা থাকে। কখনো বাধ্যতামূলক করা হলে দায়সারা ভাবে সেসবে অংশগ্রহন করে কিন্তু পাঠদানের সময় তারা তাদের পুরনো পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। একজন শিক্ষকের কাছে এই বার্তা নেই যে, তাকে প্রতিদিন নিজেকে আপডেট করতে হবে। স্কুল কলেজে দেশী বিদেশে বিষয়ভিত্তিক জার্নালও রাখা হয়না।

৩। পদ্ধতিগত ভুল ও মুখস্থবিদ্যা:
প্রতিটি জায়গায় পদ্ধতিগত ভুল রয়েছে। ১০টি বই থাকলে তারমধ্যে ৭-৯টি বই থাকে কেবল তাত্বিক আলোচনা, একাডেমিক ডিসকাশন আর বিশ্লেষণ। এগুলো শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে কোনো কাজে আসে না। পরীক্ষার ৯০ ভাগ পদ্ধতি হলে লিখিত পরীক্ষা। বাকী ১০ ভাগ ব্যবহারিক, এসাইনমেন্ট ও মৌখিক। অথচ এটা হওয়ার প্রয়োজন ছিলো প্রতিটি সাবজেক্টে এবং কমপক্ষে ৪০ ভাগ। মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও শত শত বছরের পুরনো পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। সৃজণশীল নামে একটি অসৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ দূর্বল হয়ে উঠছে। শিক্ষার মান গিয়ে ঠেকেছে তলানীতে। আর নানা গল্প কবিতা, সারাংশ, সারমর্ম রচনা মূখস্থ করে শিক্ষার্থীদের মগজ দখল করে রাখে।

৪। পুরনো আমলের পাঠ্যপুস্তক কাঠামো:
পাঠ্যপুস্তকের বিষয় সাজানো হয়েছে। আবেগের ঢালি দিয়ে যার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। পৃথিবীর সর্বশেষ তথ্য ও সর্বশেষ আবিষ্কার কিংবা সাহিত্য কোনোটারই সেখানে স্থান নেই। যেসব টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে সেগুলোর মান এত নিন্মমুখী যে, সেখান থেকে বের হয়েও শিক্ষার্থীরা কর্মউপযোগী হয়না। প্রশ্ন উত্তরগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে তাতে মুখস্থ করে উত্তর দেয়ার প্রবণতা তৈরী হয়। আবার ক্লাসে পড়া নেয়া হয় মুখস্থ বিদ্যার উপর, পরীক্ষা পদ্ধতিও তাই। সাথে থাকে নানা গাইড বই আর টিচারের নোট। দিনশেষে না বুঝে মুখস্থ করে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কয়েকটা প্রজন্ম।

৫। দূর্বল সিলেবাস ও পাঠদান পদ্ধতি
বিশে^র অন্যান্য দেশের সাথে সিলেবাস মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে। সেটা কতটা দূর্বল ও পুরনো। ইংরেজী সিলেবাসে থাকলেও তার সিলেবাসের ঘাটতি ও প্রয়োগের দূর্বলতায় স্কুল কলেজের এই ইংরেজী শিক্ষার্থীদের কোনো কাজেই আসছেনা। সাথে রয়েছে ইংরেজী শিক্ষকের অভাব। পুরনো পদ্ধতিতে শেখা শিক্ষকেরা পাঠদানের সময় পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যায়। তাদেরকে সে পদ্ধতি ভোলানো যায়না।

৬। পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি
বিভিন্ন সময়ে সিলেবাসে কিছু পরিবর্তন আনলেও মূলত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি একই রয়ে গেছে। ফলে সেসব পরিবর্তন কোনো কাজে আসেনি। বহুমাত্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়ন না করলে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।

৭। সহপাঠ ও বিভ্রান্তিমুলক চিন্তার প্রয়োগ
সহপাঠ কার্যক্রমগুলো দেখা যায় হয়তো পাঠ্য বইয়ের বর্ধিত অংশ নয়তো সেগুলো খেলাধুলা ও সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেখানে নেই কোনো বাস্তবজ্ঞান, ব্যবহারিক প্রয়োগও নেই। কিছু বিষয়কে শুধু নাম্বার বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে করানো হয় শিক্ষার মাধ্যম নয়। এমনকি সেসব বিষয় নির্বাচনেও রয়েছে মান্দাতার ছাপ। একজন শিক্ষার্থীকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কিংবা বড়ো কিছু হওয়ার জন্য চিন্তার ছাপ ফেলবে এমন কোনো পাঠ্যসুচীও নেই কর্মসূচীও নেই। ফলে যেসব শিক্ষার্থী স্ব-প্রণোদিত হয়ে নিজেকে উন্নত করেনি তারা ব্যতিত বাকীরা হয়ে উঠেছে বোঝা, নয়তো শিক্ষিত বেকার অথবা স্রেফ শ্রমিক বা দিন এনে দিনে খাওয়ার কারিগর। আর আত্মবিশ^াস হীনতায় ভোগা এদের বিরাট অংশ সমাজ, রাজনীতি ও বিভিন্ন পেশায় গিয়ে অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে দেশকে করছে কুলুষিত।

৮। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিবেশ দেখে মনে হয় এটা শুধু একটা কিতাবিস্তান। এখানে মানুষ ও জীবন গড়ার কোনো উপাদান নেই। ফলে সিলেবাস থেকে তরুনরা কিছু শিখতে পারে না এমনকি পরিবেশ ও পরিস্থিতি থেকেও কিছু জানতে পারে না। তাদের শিক্ষাজীবন হয় ২% বুঝা, ৫% মুখস্থ, ৩% এসাইনমেন্ট, পরীক্ষা ও কপি করার মতো বিষয়, ৫% আড্ডা গল্প গান। বাকী ৮৫% তাদের শেখার বাইরে থেকে যায়। এই ১৫% শিক্ষা দিয়ে কোনোরকম টেনে টুনে কিছু মার্ক তুলে তারা হাজির হয় কর্মজীবনে। তারপর তারা বুঝতে পারে তারা কাজের জন্য উপযুক্ত নয় এমনকি মানুষ হিসেবে যে, তারা সৎ হবে সেটাও তাদেরকে কেউ বিশ^াস করে না। এভাবে তারা হারিয়ে যায় প্রথমে হতাশায় তারপর ভুল পথে।

লেখা জাহাঙ্গীর আলম শোভন, ছবি ইন্টারনেট, পরের অংশে সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হলো।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply