প্রতারক যখন ক্রেতার রুপ ধরে আসে
-জাহাঙ্গীর আলম শোভন
আমরা হরহামেশা শুনতে পাই বিক্রেতা ক্রেতাকে ঠকাচ্ছে। মানে তার টাকা নিয়ে তাকে পণ্য দিচ্ছে না অথবা সঠিক পণ্য দিচ্ছে না অথবা সময়মতো পণ্য দিচ্ছে না অথবা পণ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও কিংবা পণ্য ফেরত দেয়ার পরও টাকা ফেরত দিচ্ছে না।
আমরা খুব স্বাভাবিক বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারি যে, এ ধরনের ঘটনা যদি হাজারে ২/৪টা হয় তাহলে সেটা অনিচ্ছাকৃত কিন্তু যদি শতকরা ২০% থেকে ৮০% হয় তাহলে এখানে কোনো ঘাপলা আছে। ক্রেতাকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য সরকারের আইন আছে ‘‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’’ আছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আছে কনজুম্যার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অন্যান্য সংস্থা ও আদালতও রয়েছেই।
প্রকৃত অর্থে অস্বাভাবিক বিঘ্নিত সেবা যারা প্রদান করে তাদের আসল উদ্দ্যেশ্যে ব্যবসা করা বা সেবা দেয়া নয়। তারা এক ধরনের সুযোগ সন্ধানী। তারা কখনোই প্রকৃত ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হতে পারে না। একজন সেবাদাতা বা পেশাদার কখনো এধরনের আচরণ করবেনা বা এই মডেলে ব্যবসা পরিচালনা করবেন না। ঠিক একইভাবে একজন প্রকৃত ক্রেতাও কখনো কোনো ছল চাতুরির আশ্রয় গ্রহণ করেন না। যারা করেন তারা প্রকৃত ক্রেতা নয়। তারা ক্রেতার ছদ্মবেশী দূস্কৃতিকারী। আমরা একজন ই-কমার্স উদ্যোক্তাকে সতর্ক ও সচেতন করার লক্ষ্যে এসব ছদ্মবেশী ক্রেতাদের প্রতারণার কিছু ঘটনা তুলে ধরবো।
অর্ডার দিয়ে পণ্য গ্রহণ না করা
এরা মনখুশি মতো বিভিন্ন পণ্য অর্ডার করে তারপর ডেলিভারীর সময় ফোন ধরে না অথবা ফোন ধরলেও নানা অজুহাত দেখায়। তবে কারো কারো সত্যিকার সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে দুষ্টু লোক বোঝার উপায় হলো, এ ধরনের ব্যক্তি পূর্ণ ঠিকানা দেয়না এবং বার বার ঠিকানা ও সময় পরিবর্তন করার চেষ্টা করে। এদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে পণ্য পাঠানো উচিৎ।
বিনাকারণে পণ্য ফেরত দেয়া
এধরনের দুষ্টুবুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা আবার এক কাঠি সরেস। এরা পণ্য গ্রহণ করে কিন্তু নানা দোষ দিয়ে পণ্য ফেরত দিতে চায়। অনেকে আবার পণ্য ব্যবহার করে ফেরত দেয়। দেখাগেল জামা পরে মানে ব্যবহার করে একটা সেলফি তুলে ফেরত দিলো বা শাড়ি পরে একটা পার্টিতে গিয়ে ১ দিন পর ফেরত দিল। এরা এটাকে অপরাধ মনে করেনা বরং এটাকে তাদের চালাকি বা বুদ্ধিমত্তা মনে করে। এধরনের ক্রেতাদের ক্ষেত্রে পণ্য ফেরত নেয়ার সময় চেক করা উচিৎ এবং বার বার এ ধরনের ঘটনা ঘটালে তাকে কালো তালিকা করে দেয়া যেতে পারে। তবে সরাসরি ও সুন্দরভাবে কথা বলে কাউন্সেলিং করতে পারলেও খারাপ হয়না।
পণ্য পরিবর্তন করে অভিযোগ করা
এরা খুব বিপদজনক হয়ে থাকে। কখনো কখনো এরা চক্রবদ্ধ হয়ে এই কাজ করে। এরা মূলত পণ্য গ্রহণ করে তারপর আড়াল করে চালাকি করে পণ্য বদলিয়ে ফেলে। নতুন ও ভাল পণ্য রেখে পুরনো পণ্য দিয়ে তারা দাবী করে তাদেরকে পুরনো পণ্য দিয়ে ঠকানো হয়েছে। তারপর এরা নানারকম হম্বিতম্বি করে। পণ্যের দাম দিতে চায়না। উল্টো আরো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নামে অভিযোগ করে বসে। যাতে তাকে বেশী না ঘাটায়। এদেরকে ছাড় না দিয়ে তাদের সাথে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। ২/১ জন শাস্তি পেলে বাকীরা ঠিক হয়ে যাবে। তবে এজন্য যথাযথ প্রমাণ থাকা চাই।
কৌশলে চুরি ও ছিনতাই
এই দলের ক্রেতারুপী প্রতারকেরা আসলে পেশাদার চোর ও ছিনতাইকারী। এরা বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারীম্যানকে বেছে নেয় তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য। এরা প্রথমে ক্রেতা সেজে পণ্য অর্ডার করবে। ঠিকানা দেবে তার নিজের ঠিকানার কাছাকাছি অথবা ভুল ঠিকানা। তারপর পণ্য ডেলিভারীর সময় ইনিয়ে বিনিয়ে নানা কথা বলে ডেলিভারীম্যানকে এমন এক জায়গায় দাঁড়াতে বলবে যেখান থেকে ছিনতাই করা সহজ হয়। তারপর তাদের লোক গিয়ে কখনো মোটর সাইকেলে থেকে পণ্য ছিনিয়ে নেয়, কখনো অস্ত্র দেখিয়ে পণ্য ও টাকা নিয়ে যায় কখনো ডেলিভারী বাইক নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। এ ধরনের ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে সতর্ক হওয়া উচিৎ এবং আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সাহায্য নেয়া উচিৎ।
জিম্মি করা ও মুক্তিপণ চাওয়া
এরা মুলত এলাকার গুন্ডা ও পেশাদার সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ। এরা পণ্য অর্ডার করার পর পণ্য নিয়ে ডেলিভারীম্যান আসলে তার পণ্য সঠিক নয় এটা দাবী করে সব পণ্যসহ ডেলিভারী ম্যানকে আটকে রেখে মালিকের কাছে মুক্তিপণ চায় যা আসলে চাঁদা ও তোলাবাজি। কখনো কখনো ডেলিভারী ম্যান এর পকেটে ইয়াবা গুঁজে দিয়ে তাকে আটক করে মুক্তিপণের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করেছে এমন ঘটনাও অনেক হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে কুরিয়ার কোম্পানীগুলো কিছু এলাকাকে রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করে রাখে এবং এসব এলাকায় পণ্য সেবা সরবরাহ করতে সতর্ক থাকে।
একজন ই-কমার্স বা লজিস্টিক সেবা প্রদাকারীর জন্য শিক্ষনীয় হতে পারে এই লেখাটি। হাঁ ক্রেতা হিসেবেও ছদ্মবেশী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা কিংবা স্ক্যামার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রতারিত হওয়ার হাজার হাজার ঘটনা আছে। সেগুলো কি ধরনের হয়। কিভাবে সেগুলো থেকে নিরাপদ থাকা যাবে এই বিষয়ে অন্য লেখায় আলোচনা করা যাবে বৈকি?
লেখা:জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি: গোআর্ট
বই: ই-কমার্স প্রারম্ভিবা

