লোকঐতিহ্য: তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ

লোকঐতিহ্য: তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ

বাংলা নববর্ষে বিশেষ রচনা

লোকঐতিহ্য: তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন
(তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পায়ে হেটে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা)

তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরে সরকারী ডাক বাংলোটির পাশে আরেকটি ডাকবাংলো আছে। যেটা কুচবিহারের রাজা স্থাপন করেছিলেন। যাতে মহানন্দার এপারে এলে তিনি রাতযাপন করতে পারেন অথবা আমলারা থাকতে পারে। এটা কিছুটা নস্টালজিক করে, ভাবুক মনকে। এই বাংলোর নির্মাণ কৌশল অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাচের। জনশ্রুতি আছে যে, প্রাচীন কালে এ এলাকায় প্রচুর তেতুল বৃক্ষ ছিল। তেঁতুল গাছের ছায়ায় বসে পথিকেরা বিশ্রাম নিতেন। কুচবিহারের রাজার এখানে অবকাশ যাপনের কথা জানা যায়। বাংলোটি এখনো আছে।

ভারতীয় বাংলা উপন্যাসগুলোতে জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি এসব এলাকার যে বিবরণ রয়েছে। আমরা যারা যেসব বই পড়েছি মুহুর্তে চোখ বন্ধ করে সে চা বাগান সে বাংলা সে ইটের মেঝে বিছানো পথ। সেখানকার সৌন্দর্য, অন্ধকার কিংবা গা ছমছম যা কিছু আছে। এক নিমিষে মনের অন্দরে ঘুরে আসা যায়। আর তেঁতুলিয়ার চা বাগান তার পাশে পুরনো বাংলো আর রবীঠাকুরের আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে টাইপের মহানন্দা নদীকে পাশকাটিয়ে সূর্যযোবার দৃশ্য কিছুটা কল্পনার থেকে ধার করে ভুতুড়ে করে নিলেই হয়ে যাবে কোনো বইয়ের দূর্দান্ত প্লট।
এখানকার জনবসতির একটা অংশও ওপার বাংলা থেকে আসা। তেঁতুলিয়া এমন একটি জনপদ যা মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস যাবত ছিল স্বাধীন ভূখন্ড। এখানকার কৃষ্টি কালচারসহ নানাকারণে অনন্য। সমুলভূমির চা বাগান এক ভিন্ন দ্যোতনা দেবে দেহ ও মনে। শুধু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল নয়, অবিভক্ত ভারতের উত্তরাঞ্চল কোচবিহার, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর প্রভৃতি এলাকার সাধারণ মানুষের ভাষা একই বা কোচ রাজবংশী ভাষা। এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠি পলিয়া ও কোচ রাজবংশীর বংশধর।

তেঁতুলিয়া পঞ্চগড় জেলার শেষ প্রান্ত। এখানে থেকে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্গা দেখা যায়। আর দেখা যায় মহানন্দার উপর ভারতের একটি সুন্দর ব্রীজ। পঞ্চগড় জেলায় বছরজুড়ে মেলা বসে। যদিও মেলাকে এই এলাকায় বলে হাটি। যেমন, বান্নিহাটি, দেবীহাটি, গোমিরাহাটি, ঢুলিয়াহাটি। ‘‘খোলাহাটির বালুচরে সাইমানা টাঙাইছে রে, সুন্দরময়না তোরি কারণেরে’’ এই লোক গানটিকে সে তথ্যের একটা সুত্রধর মনে করা যায়।

উত্তর অঞ্ছলের অন্যান্য জেলার মতো আপনার মন ভরাবে এখানকার ভাওয়াইয়া, পালাটিয়া গান, সত্যপীরের গান, সাধু গোঁসাইদের গান, চোরচুন্নির গান, মেছেনীর গান, ঢুলিয়াহাটির গান। আছে হরিলুট কীর্তণ আর মৌসুমী নাটকের উৎসব। পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণের সময় ‘‘প্রেমিকা হলো মা’’ এই নামে এক নাটকের প্রচারপত্র দেখেছিলাম রংপুরে। এখানকার লোকনাট্যদলগুলো পালাগান পরিবেশন করতো কাছে দূরে সর্বত্র। চারণ কবিদের লেখা অলিখিত পান্ডুলিপির পালাগান বাংলার লোকসাহিত্যের বিশাল একটা অংশ দখল করে আছে। আর এই অলিখিত থাকার কারণেই এদের একটা বিরাট অংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চর্চা কমেছে কিন্তু এসবের ভাব ও জৌলুস কমেনি মোটেও। যদিও বৈদ্যুতিন মাধ্যমের শিল্পীদের চোখ ধাঁধানো পোষাক ও রংচঙা দামী সাজসজ্জার কাছে হয়তো গ্রামীন শিল্পীদের বস্ত্রের উজ্জলতা কমই দেখায়।

এখানকার আরেকটি সম্পদ জারিগান, যদিও এর ব্যাপ্তি সারা বাংলাদেশ জুড়েই। ‘জারি’ অর্থ বাংলায় বিলাপ বা ক্রন্দন। বিরহী ঘটনা বিয়োগাত্মক গল্পের সুরেলা প্রকাশই জারিগান। বিশেষ করে কারবালার ঘটনা আমাদের দেশে জারিগানের প্রধান বিষয়বস্তু। চোর-চুন্নির গান পঞ্চগড় জেলার লোকসঙ্গীতের জনপ্রিয় একটি ধারা। চোর ও চোরের স্ত্রী চোরনীকে পটভূমিকায় রেখে চোরচুন্নীর গান পরিবেশিত হয়। এখানকার বিয়ের গান বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই মূলত মেয়েলিগীত। বছরের পর বছর নারীদের মুখে মুখে গীত হয় বিয়ের গানগুলো বিশেষ লোকজ ঢংএ বিয়ের আনন্দ বেদনার গল্প স্খান পায়। নারী হৃদয়ের নানা অনুরনন এসব গানে ফুটে উঠে।

এছাড়া ধামের গান, কবিগান, বাউলগান, মুর্শিদী, বিচার গান, কোয়ালী গান, বিষহরি গান, সত্যপীরের গান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির বিভিন্নরকম গান। এখনো কালে ভদ্রে হয় তবে আগের সেই তাগদ আর নেই। রাত জেগে লোকজন পুঁথিপাঠ, পাঁচটাকার কিসমা বা রাতজেগে গল্প শোনা। গ্রামীন নানা খেলাধুলাও চলত সমান তালে। এখন নগর সংস্কৃতির অনেক আয়োজন সেখানে ভর করেছে স্বমহিমায়।
পঞ্চগড়ের মতো দিনাজপুরে মেলা বসে প্রচুর। যুগেরধল দীঘি, চিন্তামন, জোয়ার, কুকুরামনি, আলোয়া খাওয়া, ঢেমঢেমী কালীর মেলা, নেকমর্দ পীরের মেলা প্রভৃতি। মেলায় অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, খেলনা, মেয়েদের প্রসাধন ছাড়াও উন্নতজাতের গবাদি পশু, হাতি, ঘোড়া কেনাবেচার হয় দেদারসে।

মহরম উপলক্ষ্যে লাঠিখেলা, তাজিয়া, মিছিল, মহরম মেলা ও মাতম চলে। পূজায় গানবাজনা, নাচ প্রভৃতি শিল্প ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক’দিনের কর্মসূচী খুব জাকজমক করে উদযাপিত হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে নাটক মঞ্চস্থ হয় মহাসমারোহে।
নীল চাষের জন্য খ্যাত হয় নীলফামারি। এখানকার বিখ্যাত উপজেলা সৈয়দপুর। শুধু বংশগত নাম নিয়ে নয় অনেক কারণে খ্যাতি আছে সৈয়দপুরের। একদিকে রেলওয়ে জংশন অন্যদিকে বিমান বন্দর। আছে চিনি মসজিদ আর ভারতের কোচবিহার ও মুর্শিদাবাদ এলাকা থেকে আগত লোকদের বসতি। নীলফামারীতে হিন্দু মুসলিম ছাড়াও কিছুসংখ্যক সাঁওতাল, কোচ, রাজবংশি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে। নীলফামারীর সংস্কৃতিতে মেয়েলী গীত লোক ঐতিহ্যের অংশ। এখানে একসময় বিনোদন মাধ্যম হিসেবে নীলফামারীতে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা বন্ধ হতে বসেছে।

উত্তরে নবান্ন উপলক্ষে কৃষকের আঙ্গিনা ঝকঝকে চকচকে করা হয়। নুন কাস্তে, ঝুড়ি, কুলা, চালনি, চাটাই, গোলা তৈরি করা হয়। লবন চালে আসলে বানানো হয় পিঠা, পুলি, ক্ষীর, পায়েস ইত্যাদি। দেশের অন্যান্য অনেক এলাকার মতো এখানেও নবান্নে মেয়েকেও বাপের বাড়ীতে ‘নাইওর’ আনা হয়। নবান্ন উপলক্ষে অনেক গ্রামে লোকমেলার আয়োজন হয়। এই মেলায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, মন্ডা মিঠাই,-পুতুল আর মাটি-বাঁশ, বেত, কাঠের তৈরী নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। পালাগান, লোকনাট্য, কেচ্ছা-কাহিনী, বাউল গানের আসর বসতো মেলাকে ঘিরে একসময়।
ভাওয়াইয়া রংপুরের লোকসঙ্গীত ধারায় সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ শাখা। ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিন ভাওয়াইয়াকে উচ্চ মাত্রায় সম্মানিত করেন নিয়ে যান বিশ্ব দরবারে। ‘বাপুত চেংরা রে ওমুত গাছত চড়িয়া একখান জলপাই পারিয়া দে’ এমন অনেক গান কালজয়ী স্বাক্ষী হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ফিরতো একসময়। এখনো সেসব ভোলেনি সমঝদারেরা।

বলা হয়ে থাকে যোগাযোগ সুবিধার কারণ সাহিত্যে ও সাংস্কৃতির ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জের সম্পর্ক রংপুর, বগুড়া, পাবনা সদর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনার সঙ্গে। সিরাজগঞ্জের থিয়েটার বা নাটক বেশ সমৃদ্ধ। এখানকার মানুষ সংস্কৃতিপ্রেমী তা তাদের কবিতা ও সঙ্গীতচর্চা দেখেই বোঝা যায়। দেশের যেকোনো এলাকা থেকে এখানে নাটক, যাত্রা বেশী হয়ে আসছে। কলিকাতার বিখ্যাত নটরাজ ছবি বিশ্বাসের বাড়ী সিরাজগঞ্জ থানার বাগবাটি গ্রামে ছিল।

ঢাকার বয়স চারশ বছর একথা প্রতিষ্ঠিত হলেও কিছু তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ৮০০ বছর আগেই ঢাকায় নাগরিক জীবনের সূচনা ঘটে। শিলালিপি সূত্যে স্পষ্ট হয় যে, প্রায় ৬০০ বছর আগে সুলতানি যুগে স্বাধীন বাংলার একটি ইকলিম বা প্রদেশের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর, সাভারের রাজাসন, হরিশচন্দ্র রাজার ঢিবি থেকে শুরুকরে ডগরমুড়া প্রত্নস্থানের ঐতিহাসিকতা যেহেতু বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত, সেহেতু রাজধানী ঢাকার ইতিহাস রচনা করলে অবশ্যই কমপক্ষে পাল যুগ থেকে শুরু করতে হবে।

সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৬-১৪৫৯ খ্রি.) সময় উত্কীর্ণ এ শিলালিপি দুটির একটি থেকে স্পষ্টতই ধারণা করা যায়, ঢাকা তখন ‘ইকলিম মুবারকাবাদের’ অন্তর্গত ছিল। ইকলিম মুবারকাবাদ নামাঙ্কিত শিলালিপিটি পাওয়া গেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের কিছুটা পশ্চিমে গিরিদাকিল্লা নামের মহল্লা নাসওয়ালা গলি মসজিদের সামনের একটি তোরণের গায়ে। মসজিদ আর তোরণের অস্তিত্ব এখন নেই। শিলালিপি সূত্রে জানা যায়, মসজিদটি ৮৬৩ হিজরি অর্থাত্ ১৪৫৯ সালে নির্মিত হয়েছিল। এটি সরকারি উদ্যোগে নির্মিত হওয়ায় সমকালীন সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের নাম উত্কীর্ণ করা হয়েছে।

১৭৬৬ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা লক্ষীনারায়ণ প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি দলিলের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত বাজারকে দেবসম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে এ স্থানের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ। মুসলিম আমলের সোনার গাঁ নামের উদ্ভব প্রাচীন সুবর্ণগ্রামকে কেন্দ্র করেই। সোনারগাঁয়ের অন্যতম আকর্ষণ লোকশিল্প জাদুঘর। গ্রামীন জীবনের নানা তৈজসপত্র, আমাদের লোকজ ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পের অনেক কিছুই স্থান পেয়েছে এখানে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর লোকশিল্প ফাউন্ডেশ এর তত্বাবধানে পরিচালিত হয়। পানাম নগরী ও লোকশিল্পন জাদুঘরের অবস্থান পাশাপাশি। সোনারগাঁও অঞ্চলের জামদানি ও মসলিনের কাপড় তৈরির ইতিহাস প্রায় সাড়ে ৪ শত বছরের পুরোনো। ইতিহাস খ্যাত মসলিন কাপড় প্রচীনকালে এখানে তৈরী হতো। আজকের প্রজন্ম গর্ব করতে পারে যে, গবেষনায় দেখা গেছে মিশরের মমির শরীরে পেচানো মসলিন এই সোনারগাঁয়ে তৈরী। বর্তমানে রুপগঞ্জের দিকে জামদানি শিল্প টিকে থাকলেও মসলিন শিল্প আজ পুরোপুরি বিলুপ্ত।

জানা যায় মোঘল শাসনামলে মুন্সিগঞ্জ এর নাম ছিল ইদ্রাকপুর । ইদ্রাকপুর দুর্ঘ সেই পরিচয় বহন করছে এখনো। পাতক্ষীরশা মুন্সিগঞ্জের বিখ্যাত খাবার। এখানকার বিক্রমপুর ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাতস্থান। চৈনিক পরিব্রাজক হিওয়েন সাংয়ের ভ্রমণ বৃত্তান্তে বলা হয় যে বিক্রমপুর সমতট আখ্যা প্রাপ্ত স্থানগুলির অন্তর্ভুক্ত ছিল। একসময় বিক্রমপুর শিক্ষায়, সভ্যতা ও বানিজ্যে সর্বজন পরিচিত ছিল। সেনযুগে বিক্রমপুর যখন রাজধানী, তখন ঢাকার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সোনারগাঁ। মুসলিম আমলের সোনার গাঁ নামের উদ্ভব প্রাচীন সুবর্ণগ্রামকে কেন্দ্র করেই।

কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনসমূহ। ময়নামতি এ জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে বহু মূল্যবান পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখনকার মাটি খুঁড়ে শালবন বিহার, কুটিলা মুড়া, চন্দ্রামুড়া, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, সতের রত্নমুড়া, রাণীর বাংলোর পাহাড়, আনন্দবাজারের প্রাসাদসমূহ, চন্ডীমুড়া ইত্যাদি নিদর্শণ মিলেছে।
ইতিহাস থেকে দেখা যায় মধ্যযুগে লেখায় এ অঞ্চলের স্রোতধারা হিসেবে ‘‘ফনী ’’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায় । ষোড়শ শতাব্দীতে কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর উল্লেখ করেন: “ফনী নদীতে বেষ্টিত চারিধার, পূর্বে মহাগিরি পার নাই তার”। সতের শতকে মির্জা নাথানের ফার্সী ভাষায় রচিত বাহরিস্তান-ই-গায়েবীতে ফনী শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ফেনী-তে পরিণত হয় ।

ফেনীর পূর্ব এলাকায় আদিকালে শিকারী মানুষের প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল। এর প্রমান মেলে ছাগলনাইয়াতে ১৯৬৩ সালে একটা পুকুর খননকালে পাওয়া নব্য প্রস্তর যুগের মানুষের ব্যবহৃত একটা হাতিয়ার বা হাতকুড়াল থেকে। ফেনী নদীর তীরে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বীর বাঙ্গালী শমসের গাজীর রাজধানী ছিল। তিনি এখান থেকেই যুদ্ধাভিযানে গিয়ে রৌশনাবাদ ও ত্রিপুরা রাজ্য জয় করেন।

সৌখিন বংশীবাদক শমেসের গাজী যিনি ত্রিপুরা অধিকার করেছিলেন এবং ফেনীর চম্পক নগর থেকে পুরো রাজ্য পরিচালনা করেছেন। উত্তর দিকে উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে রয়েছে একটি গভীর কুয়া, স্থানীয় নাম খৈল্লা দিঘী। ঐতিহাসিকদের ধারণা যুদ্ধের কোনো গুঢ় কৌশল হিসেবে এটা খনন করা হয়। দিঘীর কিছু অংশ রয়েছে ভারত অংশে। ধারণা করা হয় যে, ১০০০ থেকে ১৪০০ খ্রীস্টপূর্বে প্রথম এই এলাকায় মানববসতি গড়ে উঠে। ছাগলনাইয়া উপজেলায় শিলুয়া গ্রামে এক প্রাচীন শিলামূর্তির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। শিলামূর্তির গায়ে খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে প্রচলিত ব্রাক্ষ্মী হরফের লিপি রয়েছে। এ জেলায় ধাঁ-ধাঁ, কবিতা, গল্প, প্রবাদ, প্রবাদ, বচন, লোকজ খেলা লোককাহিনী, পালাগান, লোকগীতি যাত্রা এগুলো বেশ সমৃদ্ধ, তবে সংরক্ষণ এর কোনো উদ্যোগ নেই বললে চলে। আঞ্চলিক ভাষামিশ্রিত ভাটিয়ালী, রাখালী, মারফতী, মুর্শিদী গানের প্রচলন রয়েছে।

বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন গান চর্যাগীত। চর্যাকারদের মধ্যে কয়েকজন চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। পণ্ডিতদের অনুমান দশম শতাব্দীতে চট্টগ্রা