পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি: মানসা মুসা
ধনসম্পদের মালিক হওয়ার স্বপ্ন হয়তো কমবেশি আমাদের সবার মধ্যেই কাজ করে। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ধন-সম্পদে এতটাই সমৃদ্ধ ছিলেন যে, তার সঙ্গে আজকের বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তুলনা করাও কঠিন। তিনি হলেন চতুর্দশ শতাব্দীর মালির সম্রাট মানসা মুসা। মানসা মুসার ধনসম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা সহজ নয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, তার মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া সম্পদ বর্তমানে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য হতে পারে। এটি তাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
‘মানসা’ শব্দটির অর্থ রাজা। মানসা মুসা পশ্চিম আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন, যার শাসনকালের সময়কাল ছিল ১৩১২ থেকে ১৩৩৭ সাল পর্যন্ত। তার শাসনাধীনে মালি সাম্রাজ্য পৃথিবীর অন্যতম ধনী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ১৩৭৫ সালে তৈরি কাতালান অ্যাটলাস মানচিত্রে মানসা মুসাকে সিংহাসনে বসা অবস্থায় দেখানো হয়। তার এক হাতে ছিল সোনার লাঠি, আরেক হাতে সোনার টুকরো। এ চিত্রটি তার অগাধ সম্পদের সাক্ষ্য বহন করে।
১৩১২ সালে, মানসা মুসা তার পূর্বসূরি রাজা দ্বিতীয় আবু বকরের স্থলাভিষিক্ত হন। আবু বকর আটলান্টিক সাগরে অভিযানের সময় নিখোঁজ হলে, মুসা মাত্র ৩২ বছর বয়সে মালি সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। তখন মালি ছিল বিশ্বখ্যাত লবণ ও সোনার বাণিজ্যকেন্দ্র। মানসা মুসার শাসনামলে মালি সাম্রাজ্য ২৪টি নতুন জনপদ অধিগ্রহণ করে। তার দেশে ছিল পৃথিবীর সেরা সোনার খনি এবং লবণ উৎপাদনের বিশাল ব্যবস্থা। সে সময় পৃথিবীর মোট লবণের অর্ধেক মেটাতো তার দেশ।
মানসা মুসার উদ্যোগে মালি শুধু বাণিজ্যিকভাবে নয়, শিক্ষায়ও অগ্রণী হয়ে ওঠে। তিম্বুকতু এবং গাও শহর দুটি ছিল উন্নত নগরীর উদাহরণ, যেখানে তিনি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সেরা স্থপতিদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নগর উন্নয়ন করেছিলেন। তিম্বুকতুতে স্থাপিত মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানার্জনের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসতো।
১৩২৪ সালে মানসা মুসা মক্কায় পবিত্র হজ্ব পালন করতে যান। তার বিশাল বহরে ছিল ৬০ হাজার মানুষ এবং ১২ হাজার ব্যক্তিগত দাস। প্রতিটি দাস পারস্যের সিল্কের পোশাক পরিধান করেছিল, আর তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল সোনার ছড়ি। যাত্রাপথে, বিশেষত কায়রোয়, তিনি সোনা এতটাই দান করেন যে, মিশরের সোনার মূল্য এক যুগ ধরে অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
মানসা মুসার শাসনামল শুধু তার অগাধ সম্পদের জন্যই নয়, বরং শিক্ষা, বাণিজ্য এবং নগর উন্নয়নে তার অবদানের জন্যও স্মরণীয়। তার গল্প একদিকে চমকপ্রদ, অন্যদিকে অনুপ্রেরণামূলক।
লেখক: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
তথ্যসূত্র: রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট

