পিআর নিয়ে বিতর্ক: সমাধান মিশ্র পদ্ধতি
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
আপাত দৃষ্টিতে গণতন্ত্র নিজে কোনো মতবাদ নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে একটা পদ্ধতি যার মাধ্যমে যুদ্ধ, হিংসা, স্বেচ্চাচারিতা ও ফ্যাঁসিবাদ ছাড়াই মানুষ তাদের মতামত ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে পারে। কিন্তু এই কাঠামো ও পদ্ধতিগত বিশেষ করে জনমত গ্রহণের কৌশলগত ত্রুটির কারণে কোনো কোনো দেশে গণতন্ত্র রীতিমতো একটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
একদিকে যেমন ভোটের রাজনীতি পেশী শক্তির খেলায় পরিণত হয়েছে এবং জনগন ভোট দেয়ার পর ৫বছর সে দল বা ব্যক্তি যাই করুক তাতে জনগনের কিছু করার থাকে না। অন্যদিকে অধিক প্রার্থীর মধ্যে কেউ একজন ২০% ভোট পেয়েও নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে তার বিপরীতে ৮০% ভোট পড়া সত্বেও। আশার কথা হলো সব সমস্যাই সমাধানযোগ্য এবং বহুদেশ এগুলো ইতোমধ্যে কাটিয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের গণতেন্ত্র আরো বাড়তি কিছু কৌতুক রয়েছে। বলা যায় পুরো ব্যবস্থার মধ্যে স্ববিরোধীতাই হলো মূল নীতি। যেমন, সংসদ নির্বাচন হয় আইন প্রণেতা নির্বাচন করার জন্য নির্বাচিত হয় মাঠনেতা। তার কাজ হলো, আইন তৈরী তিনি পোষ্টারে লেখেন ‘‘ এলাকার উন্নয়ন করার সুযোগ দিন’’ সারা বছর দৌড়ান নিয়োগ বাণিজ্য আর টেন্ডারবাজি নিয়ে। সবাই না করলে মোটামোটি চিত্র একই রকম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় সন্ত্রাসী হয় সাংসদ কারণ তিনি মাঠে বিরোধী দলকে অস্ত্র ও ক্ষমতা দিয়ে ঠেকাতে পারবেন।
একটি নির্বাচন শুধু কারো জয়-পরাজয়ের জন্য নয়। বরং জনমত যাচাইয়ের জন্য। সেখানে বাংলাদেশে কোনো ভাল প্রার্থী যদি বড় দলের হয়। প্রচারণা চালানো হয় ‘‘তার দল ক্ষমতায় যাবে না সে জিতে কি করবে’’? ভোটারগণ ভাবে ‘‘তিনি ভাল মানুষ কিন্তু জিতবেনা যখন তাকে ভোট দিয়ে ভোট পঁচাবো না’’। তার মানে পদ্ধতির কারণে ভোটার নিজের মতের বিরুদ্ধে ভোট দেয়।
তাহলে এর সমাধান কি?
পৃথিবীর অনেক দেশ এসব সমস্যার সমাধান করে অনেকদূর এগিয়েছে। যেসব প্রেসিডেন্টে এর ব্যাপক ক্ষমতা সেখানে তাকে ইমপিচ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ঠ সংসদও খুব কার্যকর। রয়েছে উপরাষ্টপ্রতি, ন্যায়পাল ও সাংবিধানিক আদালত। এগুলো দল ও সরকারকে দানবে রুপ নিতে বাঁধা সৃষ্টি করে।
জার্মানিতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে শক্তিশালী ফেডারাল সিস্টেম ও সাংবিধানিক আদালত রয়েছে। ফ্রান্সে রয়েছে- সেমি-প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম এতে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা হয়।
ব্রাজিল, তুরষ্ক, চিলি, ইউক্রেন, পূর্তগাল, রোমানিয়া, পোল্যান্ড ও মরক্কোতে প্রথম দফা ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয় হয়। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় দফা ভোট হয় তাতে বিজয়ী প্রার্থী ৫০%+ ভোট পান। তাতে কিন্তু কারও ২০% ভোট নিয়ে বা ৮০% ভোটারের বিরোধীতা নিয়ে ভোটে জিততে হয় না।
সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, আর্জেন্টিনা এই দেশগুলোতে মোটামোটি পিআর পদ্ধতি রয়েছে। প্রপোর্শনাল রিপ্রেজেন্টেশান নামের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সারা দেশে বা কোনো এলাকায় যে দল যত শতাংশ ভোট পায় সেখানে তার দলের তত শতাংশ প্রতিনিধি বা সাংসদ আসন পায়।
নেদারল্যান্ড ও জার্মানিতে মিশ্র পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়। একে বলা হয় এমএমপি বা মিক্স মেম্বার প্রপোর্শনাল সিস্টেম। এতে আমাদের দেশে প্রচলিত (First-Past-The-Post, সংক্ষেপে FPTP) বাংলায় ‘‘একক সদস্য সর্বাধিক ভোট পদ্ধতি’’ বলতে পারি এর সাথে পিআর পদ্ধতিও থাকে। তাতে দুটো পদ্ধতির সুবিধাগুলো পাওয়া যায়।
বেশ কয়েকটি দেশে না ভোট (বা NOTA) বিধান রয়েছে। কোনো কোনো দেশে খালি ব্যালটকেও বাতিল ভোট হিসেবে গণনা না করে মতামত বা ‘‘না ভোট’’ হিসেবে গণণা করা হয়। জনগনের সে নিরবতাকেও মতামত হিসেবে গণ্য করা হয়।
পিআর পদ্ধতি কি?
কয়েকটি দেশে সংসদ নির্বাচনে যদি এই পদ্ধতি রয়েছে। এতে তাহলে কোথাও কোনো নামীয় প্রার্থী থাকবেনা। সারা দেশে শুধু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে। তাতে যে দল সবচেয়ে বেশী ভোট পাবে তারা ভোটের হার অনুসারে সংসদে আসন পাবে। ৭০% ভোট পেলে ৭০% শতাংশ আসন, ১০% ভোট পেলে ১০% আসন।
এতে স্বতন্ত্র পার্থীর সুযোগ নেই। তবে এলাকাভিত্তিক মাঠ নেতার বদলে দল চাইলে বিভিন্ন বিষয়ে যোগ্যদের সংসদে প্রেরণ করতে পারবে।
এমএমপি পদ্ধতি কি?
এটা মূলত আগের দুটো পদ্ধতির মিশ্রণ। এখানে মূলত দুটো ব্যালট পেপার থাকবে। একটিতে দলের প্রতীক অন্যটিতে প্রার্থীর প্রতীক। এতে করে কোনো ভোটারের পছন্দের দল যদি ভাল প্রার্থী না দেয় তাহলে তার ভিন্নমতের সুযোগ থাকলো। এতে ৩শ আসন হবে পুরনো পদ্ধতিতে আর ১শ আসন হবে পিআর পদ্ধতিতে। দুই ধরনের সাংসদদের নিয়ে এক কক্ষ কিংবা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হতে পারে।
পাশাপাশি পিআর পদ্ধতির সংকীণর্ণতা একক সদস্য সর্বাধিক ভোট দ্বারা দূর হবে। আর বিদ্যমান পদ্ধতির সমস্যা পিআর দ্বারা দূর হবে।
অন্যান্য সংকীর্ণতা দূর করতে করনীয়
দক্ষিণ আফ্রিকায় বিরোধী দলের নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠিত হয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সহ-সভাপতি বিরোধী দল থেকে করা যেতে পারে। ব্রিটেনে বিরোধীদলের দলের নেতাদের নিয়ে ছায়া সরকার গঠিত হয়। আমরা চাইলে সকল আসনের নিকটতম প্রতিদ্ধন্ধি প্রার্থীদের নিয়ে ‘‘ছায়া সংসদ’’ গঠন করতে পারি। উপ-রাষ্ট্রপতি ও উপ-প্রধানমন্ত্রী এমনকি বিভাগীয় ‘‘স্থানীয় মন্ত্রী’’র পদও সৃষ্টি করা দরকার।
বিভিন্ন আসনে ১০% এর বেশী ভোট পাওয়া পরাজিতদের নিয়ে ‘‘বিভাগীয় ছায়া পরিষদ’’ গঠন করা যেতে পারে তাহলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটারের পছন্দকে গুরুত্ব দেয়া হবে। এজন্য মূল বিভাগীয় পরিষদ গঠনের দরকার হবে। সেটা প্রথম ও দ্বিতীয়কে নিয়ে করতে হবে। এতে যার যার ভোটার তাকে ভোট দিবে। ভোটারদের মাথায় থাকবে তার প্রার্থী সংসদে যেতে না পারলেও বিভাগীয় পরিষদ বা ছায়া পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
বিভাগীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এর ‘‘বিভাগীয় পরিষদ’’ করা যায়। তাতে একজন সভাপতি ও একজন আঞ্চলিক মন্ত্রী (রিজিওনাল মিনিষ্টার) থাকতে পারেন।
এ ছাড়াও রাজনীতির মান উন্নয়নের জন্য প্রার্থীদের শিক্ষা, সমাজসেবা, অতীতে অবদান ইত্যাদি বিষয় বিবেচনার জন্য প্রতিটি প্রার্থীর জন্য প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। হোক সেটা মৌখিক, লিখিত বা বহুনির্বাচনী বা অনলাইন। দলের আভ্যন্তরে শৃংখলা ও গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অন্তত ৩-৫টি স্তরে গণতান্ত্রিক প্রকিয়ায় নির্বাচিত কমিটি থাকতে হবে। তাদের আয়কর রিটার্ণ ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স থাকতে হবে। তারা অপরাধী ও ঋণখেলাপী হতে পারবেনা।
যেখানে বাণিজ্য সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনে এই বিধানগুলো রয়েছে তাহলে রাজনৈতিক সংগঠন কেন নয়। বরং রাজনৈতিক সংগঠনে এগুলো কেশী চর্চা করা দরকার।
ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা ঠেকাতে এবং উচ্চপর্যায়ের মতানৈক্য দূর করতে একজন ন্যায়পাল তার অধীনে একটি সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৭ স্তরের ব্যবস্থা থাকা দরকার। যেমন রাষ্ট্রপতি-উপরাষ্ট্রপতি-স্পিকার-ডেপুটিস্পিকার-ন্যায়পাল-সাংবিধানিক আদালনের প্রধান-প্রধান বিচারপতি-উপপ্রধান বিচারপতি। মানে এদের একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজন দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে।
আমরা চাই নীতি, পদ্ধতি ও কাঠামোগত সংষ্কারের মাধ্যমে দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে। অন্তত যারা এখন ক্ষমতায় আছে তারা না পারুক। অন্যরা যেন করতে পারে তারা যেন সে রাস্তাটা করে দিয়ে যান।
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
লেখক ও পরামর্শক

