ই-কমার্স নির্দেশিকা

ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১: সহজ সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন, পর্ব : ১

ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১: সহজ সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন

পর্ব : ১

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

গত ৪ জুলাই সরকার ঘোষনা করে ‘‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’’। ২ মাসের বেশী সময় অতিবাহিত হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো এটি মেনে চলছেনা। অনুসন্ধানে দেখা যায়। অনেকে পুরো নীতিমালা পড়ে দেখেনি আবার অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কারো ক্ষেত্রে দেখা গেছে তিনি বিষয়গুলো বুঝতে পারছেন না। তাই নির্দেশিকা মেনে চলার সুবিধার্থে কোন ধারায় কি করনীয় তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো। যাতে ই-কমার্স উদ্যোক্তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। জাহাঙ্গীর আলম শোভনের লেখনিতে জেনে নেব ‘‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’’ এর নানাদিক। আজ তার প্রথম পর্ব।

 

অধ্যায়  ৩.১:  সাধারণ নিয়মাবলী

ধারা ৩.১.২

এই ধারা অনুযায়ী ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজে বিক্রয়ের জন্য পণ্য উপস্থাপন কালে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ লেখা থাকতে হবে।  যেমন-

ক) ধরণ  খ) সাইজ, গ) রং  ঘ) মান  ঙ) গ্রেঢ  চ) ওজন ছ) মডেল, জ) নারী পুরুষ শিশুর ভিন্নতা ঝ) তৈরীর উপাদান ঞ) ব্রান্ড ট) কোন দেশে উৎপাদিত ঠ) মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ঢ) মজুদ পন্যের পরিমাণ ড) ডেলিভারীর সাম্ভাব্য সময় সীমা উল্লেখ করতে হবে।

এসব বিবরণ প্রযোজ্যক্ষেত্র অনুযায়ী প্রযোজ্য হবে। যেমন, যদি গরুর মাংস হয় তাহলে মান বা গ্রেড, গরুর জাত, হাড়ের পরিমাণ এসব থাকতে পারে। আবার যদি গরু হয় তাহলে গরুকে কি ধরনের খাবার খাওয়ানো হয় তা থাকতে হবে। ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের ক্ষেত্রে কনফিগারেশন মোবাইলের ক্ষেত্রে ফিচার, বইয়ের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠা, কাগজ, বাধাই ইত্যাদি বিবরণীতে থাকতে হবে।

এছাড়া যা উল্লেখ থাকতে হবে

১) সময়মতো পণ্য দিতে না পারলে কতদিন পর ক্রেতার মূল্যফেরত দেয়া হবে।

২। ক্রেতা পণ্যটি গ্রহণ না করে ফেরত পাঠালে কতদিন পর মুল্যফেরত দেয়া হবে।

২) ক্রেতা পণ্যটি গ্রহণ করে কোনো সমস্যার কারণে ফেরত দিলে কত দিন পর মূল্য ফেরত দেয়া হবে?

এখানকার কিছু তথ্য পণ্য বিরবরণীতি কিছু তথ্য টার্মস এন্ড কন্ডিশনে থাকতে পারে।

 

ধারা ৩.১.৩

নির্দেশিকায় উল্লেখিত সংজ্ঞানুসারে এমএলএম বা এমএলএম সদৃশ কোনো ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। এছাড়া পন্যের পরিবর্তে পন্যের দামকে একক ধরে অর্থব্যবসা করাও এক ধরনের এমএলএম। পণ্য ও সেবা ব্যতিত অন্যকোনোভাবে ই-কমার্স ব্যবসা করা যাবেনা।

ধারা ৩.১.৪

ক) নেশাদ্রব্য বিক্রি করা যাবে না

খ) বিষ্ফোরক দ্রব্য বিক্রি করা যাবে না

ঘ) অবৈধ বা বেআইনি পণ্য বিক্রি করা যাবেনা

ঙ) অনলাইনে জুয়ার আয়োজন করা যাবে না।

চ)  Online betting বা online gambling করা যাবে না।

 

ধারা ৩.১.৫

বিশেষ পন্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ঠ লাইন্সেন্স লাগবে। যেমন ঔষধ বিক্রির জন্য অনলাইন ড্রাগ লাইসেন্স।

ধারা ৩.১.৬

বিক্রেতারা ওয়েবসাইটে কোনো সফটওয়ার বা কুকিজ থাকলে ক্রেতা ভিজিট করার শুরুতে যেন সেটা দেখতে পায় সেভাবে ক্রেতাকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে।

ধারা ৩.১.৭

ক্রয় করার সময় বিক্রেতার যেসব তথ্য নেয়া হচ্ছে সেগুলো কেন নেয়া হচ্ছে। কি কাজে লাগবে? কোথায় কিভাবে কতদিন সংরক্ষিত থাকবে তা জানিয়ে চেকবক্সে ক্রেতার সম্মতি নিতে হবে।

ধারা: ৩.১.৮

দি পেনাল কোড ১৮৬০ এর ২৯৪ বি মেনে চলতে হবে।

ধারা ৩.১.৯

অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হতে পারে এমন কোনো ওয়ালেট, গিফট কার্ড, ক্যাশ ভাউচার  ইস্যু করা যাবেনা যা অর্থের পরিবর্তে ব্যবহার করা যায়। (এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মেনে চলতে হবে)

ধারা ৩.১.১০

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ব্যতিত ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো অর্থ ব্যবসা করা যাবে না। যেমন অর্থের বিনিময়ে অর্থ দেয়া, বিভিন্ন শর্ত দিয়ে ক্রেতার অর্থ জমা করে রাখা তার বিপরীতে লাভ দেয়া ইত্যাদি।

ধারা: ৩.১.১১

ক্রেতাকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে কোনো পণ্য/সেবা ক্রয় করতে বাধ্য করা যাবে না।

প্রত্যক্ষভাবে বাধ্য করা যাবেনা আমরা সেটা সবাই বুঝি। পরোক্ষভাবে বাধ্য করা কিভাবে যাবেনা। সেটা বোঝা দরকার। যেমন, ক্রেতা একটি মোবাইল ফোন ক্রয় করলেন কোনো কারণে সেটা বিক্রেতা সময়মতো দিতে পারেননি অথবা ক্রেতা ফেরত দিয়েছেন এমতাবস্থায় ক্রেতার অর্থ ফেরত না দিয়ে অন্য পণ্য/সেবা ক্রয় করার শর্তযুক্ত করা যাবে না।

ধারা ৩.১.১২

অবশ্যই ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানকে অন্তত একটি লাইসেন্স বা নিবন্ধন নিতে হবে। যেমন: ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, টিআইএন, বিআইএন, ইউবিআইডি, পিআরএ যেকোনো ১টি।

ধারা ৩.১.১৩

ইউবিআইডি (ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন) পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামুলক হবে। অর্থাৎ অন্য লাইসেন্স বা রেজিস্টেশন থাকলেও এটি লাগবে। তবে সেটা UBID চালু হওয়ার পর এবং পর্যায়ক্রমে। এ ব্যাপারে পরে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। তাই অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত অন্য যেকোনো একটি রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। UBID চালু হলে এটি বাধ্যতামূলক হবে অথবা এ সংক্রান্ত নির্দেশনা বা সার্কুলারে বিস্তারিত জানা যাবে।

ধারা ৩.১.১৪

ব্যবসার সকল তথ্য ৬ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ অন্য একটি আইনে ৬ বছরের কথা বলা রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এটা সংরক্ষণ এর ভাল উপায় হলো ক্যাশমেমো, ডেলিভারী স্লিপ ও ব্যাংক নথিসমূহ সংরক্ষণ করা।

ধারা ৩.১.১৫

পণ্য বিক্রয় করে টাকা হাতে পাওয়ার পর কত দিনের মধ্যে পন্যের মুল বিক্রেতাকে টাকা দেয়া হবে তা উভয়ের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক ঠিক হবে। তবে অবশ্যই চুক্তিতে উল্লেখিত সময় মধ্যে অর্থ প্রদান করতে হবে। চুক্তি না থাকলে এই সময়সীমা হবে সর্বোচ্চ ১০ দিন।

ধারা ৩.১.১৬

মার্কেটপ্লেস এর বিক্রেতা ও কতৃপক্ষের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তাতে বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, পরিচয়, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নাম্বার উল্লেখ থাকবে। মার্কেটেপ্লেস কতৃপক্ষ অবশ্যই এসব তথ্য সংরক্ষণ করবে। চুক্তিতে বেআইনী বা ‘‘ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা ২০২১’’ এর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় থাকতে পারবেনা।

ধারা ৩.১.১৭

রিফান্ড এবং রিটার্ণ পলিসি বাংলা ও ইংরেজীতে লেখা থাকতে হবে। এতে বেআইনী বা ‘‘ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা ২০২১’’ এর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় থাকতে পারবেনা।

 

ধারা ৩.১.১৮

বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে হলে বাংলাদেশে নিবন্ধন নিতে হবে।

ধারা ৩.১.১৯

বিক্রয়ের সময় বা ক্রয়াদেশের সময় পণ্য বা সেবার যে মূল্য থাকবে। কোনোভাবে তার বেশী মূল্য গ্রহণ করা যাবে না। ডেলিভারী চার্জ ও অন্যকোনো চার্জ থাকলে সেটা বিক্রয়ের সময় ক্রেতাকে জানাতে হবে।

*** (পেনাল কোড, ১৮৬০ এর ধারা ২৬৯ মতে, “জীবনের পক্ষে মারাত্মক রোগের সংক্রমণ বিস্তার করিতে পারে এমন অবহেলামূলক কাজের জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ড হইতে পারে, সাথে অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড”!!!

এবং যদি বিদ্বেষপ্রসূত কাজ সহকারে মারাত্মক রোগের সংক্রমণ ঘটিতে পারে এমন কাজ করিলে ধারা ২৭০ মতে দুই বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ড হইতে পারে, সাথে অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড!!!

পেনাল কোড, ১৮৬০ এর ধারা ৫০৫ মতে, জনসাধারণের অনিষ্ট হইতে পারে এমন ধরণের বিবৃতি যা ক্ষেত্র বিশেষে সাত বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হইতে পারে!!!

ধারা ৫০৯ মতে, কোন নারীর শালীনতার অমর্যাদাকর হইতে পারে এমন কোন মন্তব্য, অঙ্গভঙ্গী বা তৎরূপ অন্যকোন কাজ হইলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হইতে যার মেয়াদ হইতে এক বৎসর পর্যন্ত বা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড!!!

এবং ধারা ৫০৪ মতে, যদি অনৈতিক ও শান্তিভঙ্গের প্ররোচনা দানের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে অপর কাউকে অপমান করে তাহা হইলে তা অপরাধ হইবে যার দণ্ড হইবে দুই বৎসর মেয়াদের কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড কিংবা এতদুভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হইবেন)

চলবে

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply