ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের একটি সরকারের পতন ঘটে। এই প্রবন্ধে আমরা এই আন্দোলনের পটভূমি, ঘটনাপ্রবাহ, বিভিন্ন পর্যায় এবং এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আন্দোলনের পটভূমি
বাংলাদেশে কোটাব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭২ সালে। সরকারি চাকরিতে তখন ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা ছিল – সব মিলিয়ে মোট কোটা ছিল ৫৬ শতাংশ 3। ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সাধারণ শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের ফলে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল ঘোষণায় পরিপত্র জারি করে 3। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবরের কোটা বাতিল-সংক্রান্ত পরিপত্রটি অবৈধ ঘোষণা করেন 2। এই রায়ের প্রতিক্রিয়াতেই নতুন করে আন্দোলনের সূচনা হয়।
আন্দোলনের সূচনা ও বিকাশ (৫ জুন – ৯ জুলাই)
৫ জুন হাইকোর্টের রায়ের পর ৬ জুন আদালতের রায়ের প্রতিবাদে ও কোটা বাতিলের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা বিক্ষোভ করে 2। ৯ জুন হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে 2। ১০ জুন আন্দোলনকারীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় ও ঈদুল আযহার কারণে আন্দোলনে বিরতি ঘোষণা করে 2।
৩০ জুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে মানববন্ধন করে 2। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে ও তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। একই দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে 2। ২ থেকে ৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে 2।
৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’-এর ডাক দেয় যার আওতায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল, মহাসড়ক অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে 2। ৮ ও ৯ জুলাই একই রকম কর্মসূচি পালন করা হয় 2।
আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি (১০-১৫ জুলাই)
১০ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হয়ে শাহবাগে গিয়ে স্থানটি অবরোধ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শিক্ষার্থীদের সামনে ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান করে 2। দুপুরে জানা যায় কোটাব্যবস্থা বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ে চার সপ্তাহ স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি শিক্ষার্থীদের ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন 2।
১১ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে শাহবাগ অবরোধের কথা থাকলেও বৃষ্টির ফলে শিক্ষার্থীরা শাহবাগে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধাকে অতিক্রম করে ৪:৩০ টায় শুরু করে 2। এদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ হামলা করে 2।
১২ জুলাই বিকেল ৫টায় শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে শাহবাগে জড়ো হয়ে অবরোধ করে 2। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতে থাকলে ছাত্রলীগের একদল কর্মী আক্রমণ করে 2। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারসংলগ্ন ঢাকা-রাজশাহী রেললাইন অবরোধ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা 2।
১৩ জুলাই রাজশাহীতে রেলপথ অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে 2। ঢাকায় ঢাবির শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করেন, তারা অভিযোগ করেন “মামলা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বাধার চেষ্টা করা হচ্ছে” 2।
১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে 2। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে মধ্যরাতে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এলাকায় বিক্ষোভ করে 2। চট্টগ্রামে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা 2।
১৫ জুলাই কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল, সূর্যসেন হল ও ক্যাম্পাসের বেশ কয়েকটি জায়গায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় 2।
আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় ও সরকারের পতন
১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পক্ষ ৯ দফা দাবি জানিয়ে ‘শাটডাউন’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় 3। ২২ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত করে 3।
আন্দোলন ধীরে ধীরে শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা দেশের অসংখ্য তরুণ, যুবক, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধসহ নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে 3। শেষ পর্যন্ত এটি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীরা সরকার পতনের এক দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন 3।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন 3। এই দিন সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকা অভিমুখে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সকাল থেকে সারা দেশের মানুষের মধ্যে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এরই মধ্যে ছাত্র-জনতার ঢাকামুখী প্রবেশের ঢল সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে 3।
আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য
এই আন্দোলনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল:
১. স্বতঃস্ফূর্ততা: আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে 3।
২. সামাজিক সম্প্রসারণ: এটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে 3।
৩. শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি: শুরুতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও অবরোধের মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল।
৪. নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ: একাধিক সমন্বয়ককে এর নেতৃত্বে দেখা গেছে 3।
৫. সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা: ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে 3। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এক অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে দেশের মানুষ যখন হতাশ ও দিশাহারা, ঠিক সেই সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিবাদ সরকারের পতন চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে 3।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। এটি প্রমাণ করেছে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান সম্ভব। সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ 3। এই আন্দোলন শুধু একটি সরকারের পতনই নয়, বরং এটি ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতার জন্য বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা রচিত
ছবি: ইন্টারনেট

