চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান 

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান 

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আঞ্চলিক ভাষার আঞ্চলিক গানের বিবেচনায় সম্ভবত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানই সবচে বেশী সমৃদ্ধ। গানের ভাব ভাষা, আবেদন সুর এবং জীবনের নান্দনিকতায় এ অঞ্চলের গান স্বমহিমায় অদ্বিতীয়। আর জীবন, পেশা, প্রকৃতি ও পারিবারিক জীবনের সাথে চট্্রগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্পর্ক খুব পাকা পোক্ত। যদিও চট্টগ্রামের লোকেরাই আজকাল সেসব ভুলতে বসেছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে অনেকটাই ধরে রেখেছে বাংরাদেশ বেতার চট্টগ্রাম ক্র্রে। কয়েকটি জনপ্রিয় গানের কথা উল্লেখ করা যাক।
‘ ছোড ছোড ঢেউ তুলি, লুসাই পাহাড়তুল লামিয়ারে যারগই কর্তফুলী।’
‘ কর্তফুলীরে স্বাক্ষী রাখিলাম তোরে, অভাুগনীর দুঃখের কথা ক্বি বন্ধুরে।’
‘ শংখ নদীর সাম্পান আঁর মন কাড়ি নিলো।’
‘ ওরে সাম্পান ওয়ালা, তুই অনমারে করলি দেওয়ানা।’
‘ সোনা বন্ধু তুই আমারে করলিরে দিওয়ানা, মনেতো মানে না দিলেতো বুঝে না’
‘ যদি সুন্দর একখান মন পাইতাম, যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম। মহেশখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম।’
‘ কইলজার মইধ্যে বান্ধি রাইখুম তোঁয়ারে, ও ননাইরে, সিনার লগে বাঁন্দি রাইখুম তোঁয়ারে’
‘ বানুরে, জি, আঁই যাইয়ুম রেঙ্গুন শহর তোয়ালাই আইনুম কি?’
‘ আঁরা চাটগাইয়া নওজোয়ান, দইজার কুলাত বসতকরি সিনায় ঠেকাই ঝাড়তুফান।’
‘ বাইন দুয়ারদি ন আইসো তুঁই নিশিরকালে না-বাপেরে লাগাই দিবো মাইনষে দেখিলে।’
‘ সূর্য উঠেরে ভাই লালমারি, রইস্যা বন্ধু গেলভাই ছারি আঁর বুকত ছেল মারি।’
‘ ও পারানের তালতো ভাই। ছিড়ি দিলাম, পত্র দিলাম, ন আইলা কিল্লাই।’
‘ নাতিন বরইখা, বরইখা হাতত লইয়া নুন ডাইল ভাঙ্গিয়া পইস্যে নাতিন বরই গাছত তুন।’
‘ তুঁই আর দুয়ার দি য। আর ল কতা র্ল্লিাই ন্ক ঘন ঘন তোয়ার বাড়ীত র্ল্লিাই যাইতা ক্’
‘ বাঁশ খাইল্যা পুনা সুযারি,, মহেশ খনলীর পানরে আদর করি খাওয়াবই দিউন আঁর তালতো ভাইওরে।’
‘ পাঞ্জাবী ওয়ালারে দিলে বড়ো জ্বালা, দিলে বড়ো জ্বালারে লাল কোর্তা ওয়ালা।’

নরনারীর প্রেম বিরহ নিবেদন আবেগ ব্যাথা খুব সহজিয়া ঢংয়ে ধরা পড়েছে এসব গানে। এসব গানে স্থান পেয়েছে চটন্দগ্রাম বাসীর সুখ দুঃখের সাথী কর্তফুলী নদী, নদীতে ভাসমান সাম্পান (নৌকা) এবং সামাজিক ও গ্রামীণ সম্পর্কগুলো। মহেশখালীর পান আর অদূরে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন (রেঙ্গুন) শহরও চট্টগ্রামের জীবন ও সাহিত্যে বাঙময়।
চট্টগ্রামে আঞ্চলিক গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি ছিলেন শেফালী ঘোষ ও শ্যামানুন্দর বৈষ্ণব। তাদের কণ্ঠ ও গায়কীর জোরে এসব গান এতই জনপ্রিয় হয়েছিলো যে, সারা দেশেই এসব গান ছড়িয়ে পড়েছিলো।

যারা হৃদয়ের মাধুরী ঢেলে এসব গান রচনা ও সুর করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী, অজিত বরণ শর্মা, অমলেন্দু বিশ্বাস, আব্দুল গফুর হালি, আসকর আলী পন্ডিত, ইয়াকুব আলী, কাজল দাস, খাইরুজ্জামান পন্ডিত, কবিয়াল ফনী বড়ুয়া, মলয়ঘোষ দস্তিদার, রমেশ শীল, সনজিত আশ্চার্য্য, মোহাম্মদ নূরুল আলম প্রমূখ। মোহাম্দ নুরুল আলমের লেখা সাম্প্রতিক সময়ে ‘‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা, কোন কারণে ভালোবাসার দাম ন দিলা, কোন দোষকান পাই ভালোবাসার দাম ন দিলা’’ গানটা ব্যাপক জনপ্রিয়তার কথা পাঠক মাত্রই জানেন।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ এ ভাষাকে বাংলার সাথে উর্দু, ফার্সী, পালি, পূর্তগীজ এবং প্রাকৃত ভাষায় মিশ্র রুপ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মূল প্রবণতা হলো সংক্ষিপ্ত করণ এবং চন্দবিন্দুর ব্যবহার যেমন আমার = আঁর, আমাদের= আঁরার। দেশের মধ্যভাগের লোকেরা সবচে জটিল মনে করেন সিলেট এবং চট্রগ্রামের ভাষা। সিলেটের ভাষায় স্বতন্ত্র পটভুমি ও একসময় আলাদা বর্ণমালা থাকলেও চট্টগ্রামের ভাষা মূলত বাংলাভাষারই একটি শাখা বা রুপ।
বই: লোকজীবনের আয়না

ছবি: ইন্টারনেট

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply