ক্রসবর্ডার ই-কমার্সের সমস্যা ও সমাধান
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত দ্রুত বিকশিত হলেও ক্রস বর্ডার ই-কমার্সে সমস্যা রয়ে গেছে। প্রথমত, নীতি ও অবকাঠামোগত সমস্যা, দ্বিতীয়ত, পেমেন্ট ও রিফান্ড, ডাকসেবা ও কাস্টমসজনিত সমস্যা । কিন্তু কিছু সমস্যা সমাধান করলে চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ক্রসবর্ডার ই-কমার্স খাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা যেমন মুলেপ (মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস) জনপ্রিয় হওয়ায় অনলাইন কেনাকাটা আরও সহজ হচ্ছে। দেশীয় পণ্য বিশ্বভোক্তার কাছে সহজে পৌছানোর অন্যতম সহজ উপায় হতে পারে ক্রসবর্সডার ই-কমার্স। এই খাতের প্রধান সমস্যা ও তার সমাধানগুলো তুলে ধরা হলো।
সমস্যা ১: ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা
৪ জুলাই প্রকাশিত ডিজিটাল কমার্স গাইড লাইনের অনেক বিধি ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন ১০% এর বেশী অগ্রিম নেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ১০০ ভাগ অগ্রিম ও আনুসঙ্গিক খরচ দিয়ে পণ্য আমদানি করতে হয়। কিন্তু মাত্র ১০% অগ্রিম নেওয়ার ফলে গ্রাহক যদি পণ্য গ্রহণ না করে তাহলে ঝুঁকি থেকে যায়। যেহেতু এখানে প্রতিটি পণ্য নির্দিষ্ঠ গ্রাহকের জন্য আনা হয়।
১০ দিনের মধ্যে ডেলিভারী দেয়ার যে বিধান এসওপিতে রাখা হয়েছে তা ক্রস বর্ডারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারেনা। কারণ আন্তজাতিক পণ্য ১০ দিনের মধ্যে ডেলিভারী দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং পণ্য ডেলিভারির ক্ষেত্রে সময়সীমা শিথিল থাকা বাঞ্ছনীয়।
সমাধান
‘‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১’’ সংশোধন প্রয়োজন এবং ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের জন্য ভিন্নতর পলিসি প্রনয়ণ করা প্রয়োজন।
সমস্যা ০২: আন্তজাতিক ব্যয়সীমা
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ হাজার ডলার লিমিট নির্ধারণ করা হয়েছে। যা মোটেও প্রতুল নয়। বিশেষ করে ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের জন্য বিষয়টি ভিন্ন হওয়া উচিৎ। কারণ ক্রস বর্ডারের ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের মূল পণ্যটাই বিদেশ থেকে কিনতে হয় বা আমদানী করতে হয়। এখানে বৈদেশিক মূদ্রার ক্ষেত্রে কোনো লিমিট বা সীমা থাকলে সে সীমার মধ্যে পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।
সমাধান:
ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের জন্য বৈদেশিক মূদ্রার সীমা ও নীতি পরিবর্তন করতে হবে। আলাদা ও ভিন্নতর নীতি নির্ধারণ করতে হবে।
সমস্যা ০৩: কাস্টম চার্জ
ক্রসবর্ডারে পণ্য আমদানীর ক্ষেত্রে কাস্টমস চার্জ ধার্য করার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নিয়ম ও তালিকা একান্ত প্রয়োজনীয়। ডাক বিভাগের পণ্যের কাস্টমস চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আবশ্যক। ডাক বিভাগের পণ্যের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ট্যাক্স রেট নির্ধারিত থাকা উচিত। তাহলে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অনিশ্চিয়তা দূর হবে। কেননা ক্রেতার কাছ থেকে নির্ধারিত দাম ধরে পণ্যটি আমদানী করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কাস্টম চার্জ এর কারণে প্রায় লোকসান গুনতে হয়।
সমাধান
এ ব্যাপারে সুর্নিদিষ্ট নিয়ম থাকা উচিৎ। প্রয়োজনে সরকারকে রপ্তানীমুখী ই-কমার্স এক্ষেত্রে ভুর্তুকি ও প্রনোদেনা দেওয়া প্রয়োজন।
সমস্যা ৪: পণ্য বিনষ্ট
দেশের বাইরে থেকে ডাক বিভাগের মাধ্যমে পণ্য আনার ক্ষেত্রে কাস্টমস এ প্রচুর পণ্য হারিয়ে যায় এবং নষ্ট হয়ে যায় এ ব্যাপারে কেউ সরাসরি কোনো দায়িত্ব নেয়না।
সমাধান:
যেহেতু পন্যের শিপিং চার্জ নেয়া হয়। তাই পণ্য হারানো বা নষ্ট হয়ে গেলে তার দায়িত্ব ডাক বিভাগকে নিতে হবে। ১০০ ভাগ না হলেও পন্যের দামের ৮০ ভাগ প্রদানের বিধান যুক্ত করতে হবে।
সমস্যা-৫:দ্বৈত কর
বর্তমানে ফেসবুকে এড দেয়ার ক্ষেত্রে ডাবল ভ্যাটিং হচ্ছে। ১৫% এবং ১৫% করে দুইবার ভ্যাট দেওয়ার কারণে ১০০ টাকার বিজ্ঞাপনে ৩০ টাকা ভ্যাট দিয়ে এই খরচ ১৩০ টাকা হয়ে যায়। যেখানে ই-কমার্সে লাভের পরিমাণ ৫% থেকে ১০% বা তারও কম। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা বৈধভাবে বিজ্ঞাপন দেয়ার পরিবর্তে বিকল্প উপায় অনুসন্ধান করে থাকে। ফলে সরকার বিপুল পরিমানে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং মানি লন্ডারিং এর প্রবণতা বেড়ে যায়।
সমাধান
পরিপত্র জারি করে এই ব্যবস্থা রহিত করতে হবে। এবং যারা ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের সাথে জড়িত বিশেষ করে বৈদেশিক মূদ্রা আনে। তাদের জন্য ভ্যাট ১০০% রহিত করা যুক্তিযুক্ত হবে।
সমস্যা ০৬: পণ্য ফেরত সমস্যা
যেহেতু ক্রস বর্ডারের পণ্য প্রেরণের ক্ষেত্রে পণ্য ফেরত দেওয়া যায়না। সেহেতু ক্রেতারা পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়না।
সমাধান:
কাস্টম হাইজে আলাদা ওয়ারহাউজ রাখতে হবে। এবং পণ্য ফেরত আনার নিয়ম চালু করতে হবে।
সমস্যা ০৭: পেমেন্ট সমস্যা
বাংলাদেশ থেকে Payoneer এর একাউন্ট করার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। এমনকি Payoneer এর একাউন্টে সব ক্ষেত্রে লেনদেন করা সহজ হয়না। যেমনটা Paypal এর ক্ষেত্রে অসুবিধা লক্ষ্য করা যায় না ।
সমাধান:
ক্রস বর্ডার ব্যবসায়ের জন্য এবং আন্তর্জাতিক বিক্রেতাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য Paypal পেমেন্ট গেটওয়ে আবশ্যক। কারন Paypal নিজেই Escrow সিস্টেম দেখাশোনা করে। এই সুবিধা দিতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাও আকৃষ্ট হবে। পেপ্যাল ও পেঅনএয়ার সরাসরি বাংলাদেশে ব্যবসা করার অনুমতি দিতে হবে।
সমস্যা: পিওডি
সুগঠিত সিস্টেমের অভাবে প্রিন্ট অন ডিমান্ডের সুব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না।
সমাধান:
নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ও রপ্তানি প্রসেস গঠনের মাধ্যমে প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মতো সেবা দেওয়া সম্ভব।
সমস্যা: দেশীয় পণ্য
দেশে তৈরিকৃত পণ্যের তুলে ধরার মত কোন সুগঠিত প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইটের অভাব রয়েছে। দেশের ইনভেন্টরি প্রস্তুত রাখা এবং তা রপ্তানিমুখী করার জন্য সফল গাইডলাইনের অভাব রয়েছে।
সমাধান:
ওয়েবসাইট ভিত্তিকভাবে তৈরিকৃত পণ্য প্রস্তুত রাখতে হবে। রপ্তানির জন্য স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন মেনে সারা দেশে প্রেসেন্ট করার মত ইনভেন্টরি প্রস্তুত রাখতে হবে। যাতে করে অন্তত ১০০০ পণ্য ভারচুয়ালি স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন মেনে মেইন্টেইন করা যায়।
সমস্যা: আন্তজাতিক মানের প্যাকেজিং
প্রোডাক্ট প্যাকেজিং ফর্মূলা মানসম্মত ও টেকসই না হলে পণ্য ক্ষতির সমস্যা হতে পারে। বিদেশী ক্রেতা পণ্য গ্রহণ করতে চায়না।
সমাধান:
প্যাকেজিং ফর্মূলা বিশ্বমানের হতে হবে। যাতে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাতে পণ্য ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।
অন্যান্য সমস্যা
অন্যান্য ক্ষেত্রে রফ্তানী এবং রেমিট্যান্স এ সরকার প্রনোদনা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ দিলেও ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জিত হলেও এখানে রফতানীর ১০% নগদ প্রনোদনা এবং রেমিট্যান্স এর ২% নগদ প্রনোদনা কোনোটাই দেয়া হয় না।
ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের উপযোগী নীতি পলিসি প্রনয়ন করতে হবে। শিপিং চার্জসহ অন্যান্য সেবা আরো সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। সেবামূল্য কমাতে হবে। যেহেতু এর মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রা আসে। এসব সেবার ভ্যাট ট্যাক্স রহিত করে প্রয়োজনে ভুর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। রফতানীমুখী ই-কমার্সকে এক্সপোর্ট এর আওতায় এনে ১০% প্রনোদনা এবং ড্রপ শিপিং ই-কমার্সকে রেমিট্যান্স এর আওতায় এনে ২% প্রনোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

