chanda

ক্যাডার ও চাঁদাবাজ ভিত্তিক সামাজিক কাঠামো

বাংলাদেশ: রাজনৈতিক ক্যাডার ও চাঁদাবাজ ভিত্তিক সামাজিক কাঠামো

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশের বিগত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা ও  চাঁদাবাজ ভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক নেতা-ব্যক্তি এবং গোষ্ঠি-সংগঠনকে দায়ী মনে করি না। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আমরা এগুলো ভেতর থেকে বিশ্লেষণ করলে হয়তো ব্যাপারটা বোঝা যাবে। কারণ এই ব্যবস্থা একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি কোনো এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠি দ্বারা হয় বা হয়েছে বলে প্রমাণ হয়নি। তাই আমরা সাদাচোখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করবো।

প্রথমত, জোর করে খাজনা ও চাঁদা আদায়ের ইতিহাস

আমাদের দেশে দূর ইতিহাস বাদ দিয়ে আমরা যদি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ব্রিটিশ শাসনের কথা চিন্তা করি। আমরা দেখতে পাই কোম্পানীর লোক ও জমিদারেরা জনগনের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায় করতো। এখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার দ্বারা তারা লোকজন থেকে জোর করে অর্থ আদায় করতো। পাশাপাশি হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে পূজা পার্বনে চাঁদা তোলার অভিযোগও রয়েছে সকল ধর্মের লোকদের কাছ থেকে। এই ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়। ক্ষমতাসীনরা বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় ও বেরাষ্ট্রীয়ভাবে নিরীহ ও সাধারণ জনগন থেকে শত বছর ধরে চাঁদা আদায় করে আসছে।

আরো সহজে বোঝার জন্য আমরা ভারতেও এই প্রবণতা দেখতে পাই। পশ্চিমবঙ্গে যেটাকে বলে তোলাবাজি। এই তোলাবাজির ইতিহাস ও চর্চা কম গভীর নয়।

দ্বিতীয়ত, পুলিশ ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নয়

আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কখনো পুলিশ বিধান করতে পারেনি। জমিদার ভিত্তিক ও পঞ্চায়েত ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ছিল। সামাজিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। পুলিশ এবং থানা দুটোই ছিল সংখ্যায় কম এবং দূর দূরান্তে ফলে চাইলে সামাজিক অপরাধ বিশেষ সে সময়ের চুরি, ডাকাতি, লুট ও ঠগবাজির জন্য পুলিশ কখনো জননিরাপত্তা দেয়নি বা দিতে পারেনি। সামাজিক প্রতিশ্রুতি, বন্ধন, একতা ও পঞ্চায়েত কাঠামো যুগে যুগে সামাজিক শৃংখলা বিধান করেছে।

কিন্তু পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ এবং বাংলাদেশ আমলে রাজনৈতিক দল ভিত্তিক কাঠামোর তৃণমূলে বিস্তার হলে।  সমাজের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা চলে যায়। ফলে তারা সামাজিক বিধিতে হস্তক্ষেপ করে নিজেদের আখের গোছানোর চেষ্টা করতে থাকে। এর ফলে তারা নানাবিধ উপায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে থাকে। তারমধ্যে একটি হলো তোলাবাজি।

তৃতীয়ত: সামাজিক অপরাধকে বিবেচনায় না আনা

আমাদের দেশে অপরাধ ও শাস্তির বিধান দেয়া হয় মূলত ১৮৬১ সালের পেনাল কোড অনুযায়ী। এই আইনটি সিপাহী বিদ্রোহের ৪ বছর পর করা এবং এখানে যেমনি অনেক ছোট খাটো অপরাধগুলো বাদ দেয়া হয়েছে বিশেষ করে সামাজিক এই তোলাবাজি ধরনের বা রাজনৈতিক অধিকার হরণজাতীয় অপরাধ। যেসব অপরাধ জমিদাররা করতো। অন্যদিকে এখানে এলিটদের জন্য এক ধরনের দায়মুক্তি রয়েছে।

তাছাড়া এই আইনগুলোতে অপরাধের পর শাস্তির কথা বলা হলেও অপরাধ প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা অনুপস্থিত। কারণ তখনকার প্রেক্ষাপটে সেটা প্রায় অসম্ভব ছিল। কেননা ১০০ কিলোমিটার দূরের থানা থেকে সেটা করা সম্ভব ছিলো না। এটা এক রকম অলিখিতভাবে জমিদারদের উপর ন্যস্ত ছিল এবং তার অসৎ ব্যবহার হয়েছিল। আরো মজার ব্যাপার সকল ধরনের অপরাধের একই রকম শাস্তি। যেমন জরিমানা, জেল ও ফাঁসি। এটা ন্যায্যতার বিচারে সঠিক নয়। যে লোকটি অন্যের সামাজিক অধিকার হরণ করলো তার সামাজিক অধিকারও সংকুচিত করে তাকে শাস্তি বিধান করা যায়। এই ধারণাটা তখন ছিলো না।

কিন্তু দু:খের বিষয় হলেও সত্য যে আমরা এখনো সে পুরনো কাঠামোতে রয়ে গেছি। ফলে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় পুরনো আইনগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেনা।

তৃতীয়ত, নেতিবাচক চর্চা বজায় রাখার প্রবণতা

বাঙালী জাতিসত্তার একটি বৈশিষ্ট্য হলো আমরা নিজের সংষ্কৃতি বজায় রেখে খুব সহজে অন্যের সংষ্কৃতি গ্রহণ করি। তার প্রমাণ যদি আমরা পোশাকে দেই এবং উপমহাদেশ তথা ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিদের সাথে মিলিয়ে দেখি যে, আমরা বাংলাদেশ এবং ভারত এই ২ দেশের বাঙালী আমাদের পোশাক ধরে রাখলেও চর্চার মধ্যে তেমন একটা নেই। মানে টিকিয়ে রাখলেও নিত্য ও গণচর্চা নেই। অন্যদিকে আমরা গুজরাট, পাঞ্জাব ও অন্যান্য অনেকের মধ্যে দেখি তারা এখনো গণহারে নিজস্ব পোশাকই পরে। আমরা কিন্তু পশ্চিমা পোশাক নিয়েছি। আর নিজস্ব পোশাকের ডিজাইন বদলে সেটাকে উৎসবে ব্যবহার করছি।

এভাবে আরো নেতিবাচক চর্চা আছে আমরা সেটা গ্রহণ করেছি এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সেটাতে অঙ্গীভূত করে চর্চা বজায় রেখেছি। চাঁদাবাজি ও তোলাবাজি সেরকম একটি বিষয়।

চতুর্থত, ক্যাডার ভিত্তিক রাজনীতির চর্চা

বাংলাদেশে চাঁদাবাজিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ভোট বা নির্বাচন ব্যবস্ধার জন্য কাজ করছে তখন তারা দেখলো যে, কেন্দ্র দখল করে ভোটে জেতা যায়। তখন কেন্দ্র দখল করার জন্য তাদের ক্যাডার বা দুষ্ঠু শ্রেণীর লোক পালার দরকার হয়ে পড়লো। একসময় রাজনৈতিক দলকে বিশেষ করে জাতীয় পাটিকে দেখেছি ডাকাতদলের পৃষ্ঠাপোষকতা করতে। আরো অন্য কিছু দলের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ রয়েছে। প্রতিপক্ষকে হটিয়ে এবং মাঠ দখল করে জনগনকে ভয় দেখানো ও ভোট কেন্দ্র দখল করে ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনতে গুন্ডাদের পালতে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো। ইতিহাসে এবং বিগত ৫০ বছরের পত্রিকায় হাজার হাজার ঘটনা ও প্রমাণ রয়েছে।

কিন্তু সব সময় চুরি ডাকাতি করা যায়না। আবার ক্যাডারদের সংখ্যা এত বেড়েছে চুরি ডাকাতি করলে দেশের কোনো মানুষ ঘুমাতে পারবেনা। তাছাড়া সেটা ফৌজদারী অপরাধ গ্রেপ্তার না হলে মামলা দৌড় এবং ফেরারী হওয়ার ভয় রয়েছে। সে তুলনায় চাঁদাবাজি নিরাপদ। এভাবে চাঁদাবাজি ব্যবস্থা শেকড় ঘাটতে শুরু করে।

পঞ্চমত, ব্রিটিশ আমলের আইনি কাঠামো

ব্রিটিশ আমলের আইনি কাঠামোর কারণে নতুন নতুন সামাজিক অপরাধগুলোতে শাস্তি বিধান করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অপরাধিকে জেলে নেয়ার পর সেখান থেকে আদালতের মাধ্যমে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। তারপর সে একই অপরাধ করে যাচ্ছে। এই চক্র চলছে বছরের পর বছর। কারণ আদালত বা বিচারকের দায়মুক্তি রয়েছে এবং জবাবদিহিতার কোনো জায়গা নেই। কেননা এই আইনগুলো ব্রিটিশ আমলে এভাবে তৈরী করা হয়েছে। যেসব পদে ব্রিটিশরা কাজ করতো তাদের দায় রাখা হয়নি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পরবর্তী আইনগুলো একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এতে করে সামাজিক অপরাধগুলো সমাজে সয়লাব হয়ে গেছে। চাঁদাবাজিও তার মধ্যে একটা।

ষষ্ঠত দূর্বল শিক্ষা, অদক্ষ জনশক্তি ও ব্যাপক বেকারত্ব

চাঁদাবাজি ব্যাপক ও একটি শক্ত ভিত্তি লাভ করে এখনো টিকে আছে যার অন্যতম কারণ হলো দূর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে অদক্ষ শক্তি তৈরী হওয়া ও বেকারত্ব মহামারি আকারে ধারণ করা। একসময় রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে তরুনরা এক সময় বিপথে যেত এবং তোলাবাজি করতো এখন বরং অপরাধ করা ও চাঁদাবাজির এক ধরনের লাইসেন্স পেতে তরুনরা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যুক্ত হচ্ছে।

সপ্তমত: মাঠ পর্যায়ে বিশৃংখলা ও শূণ্যতা

দুটো ক্ষেত্রের উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। প্রথম, বিভিন্ন শহরে যে পরিমাণ দোকান বসে রাস্তায় প্রথমত এগুলো বেআইনি কিন্তু সরকার যেহেতু লোকদের চাকরি বা ব্যবসার জন্য সহযোগিতা করতে পারে না, তাই চুপ থাকে। কিন্তু এসব স্থানের দখল ও শৃংখলা নিয়ে নানা সংকট তৈরী হয়। তখন দরকার হয় কারো নিয়ন্ত্রণ ও দাদাগিরি। কিন্তু সবাই দাদাগিরি করলেতো লোকে মানবেনা বা পুলিশও সুযোগ দিবেনা। তখন আসে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তারা এখানে নিয়ন্ত্রণ নেয় শৃংখলা বিধান করে তখন তাদের কাছ থেকে একটা ফিস নেয়া তাদের সহজ হয়ে যায়।

ঠিক বেআইনি পরিবহন এর ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য।

অষ্টমত: রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত দূর্বলতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র ও কাঠামো খুব দূর্বল ও সংক্ষিপ্ত। সেখানে কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। এবং দল পরিচালনায় অনুদান আদায় ও খরচ স্বচ্ছ ও সুন্দর নয়। পৃথিবীর সব দেশেই রাজনৈতিক দল চলে অনুদানের টাকায়। সবাই মূল দলকে তহবিল দেয়, দল একটি পরিকল্পনা ও নিয়মের মাধ্যমে সে অর্থ খরচ করে। কিন্তু আমাদের দেশে দলগুলো তাদের কর্মীদের ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় নিজ উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে চলার সুযোগ করে দেয়। কখনো কখনো উধ্বস্তনদের সে আয়ের ভাগ পাওয়ার কথাও শোনা যায়।

নবমত: রাজনৈতিক সংঘটন আইন ও বিধি না থাকা

বাংলাদেশে ৩ ধরনের অলাভ সংগঠন রয়েছে। সাামজিক সংগঠন, বাণিজ্য  সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠন। অন্য সংগঠনের জন্য একাধিক আইন ও বিধি থাকলেও রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য শুধু নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশনের কিছু নিয়ম কানুন আছে। কারা রাজনীতি করবে কিভাবে করতে তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ফলে শুধু চাঁদাবাজি নয় রাজনৈতিক অনিয়মগুলো আইডেন্টিফাই ও সমাধান আমাদের আইন বিচার ও সমাজ ব্যবস্থায় নেই। আর যতদিন এটা না থাকবে ততদিন এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তিও মিলবেনা।

এমনকি একটি ‘‘নাগরিক অধিকার আইন’’ না থাকলে নাগরিকদেরকেও এসব থেকে মুক্তি দেয়া যাবে না।

এভাবে চাঁদাবাজি একটি শক্ত ও পোক্ত সিস্টেমের দাঁড়িয়ে আছে। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে   এই বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে এবং সেভাবে এর প্রতীকার এর ব্যবস্থা করতে হবে। আমি অন্যলেখায় সেগুলো তুলে ধরতে চাইব।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply