চাঁদাবাজির সামাজিক ও রাজনৈতিক ময়নাতদন্ত
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না যে, এই ব্যবস্থার জন্য শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করলে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যাবে। কারণ চাঁদাবাজি হঠাৎ জন্ম নেয়নি, একদিনে তৈরি হয়নি, এবং একক কোনো শক্তির হাত ধরে বিকশিত হয়নি। বরং এটি ইতিহাস, আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ—সবকিছুর সম্মিলিত ফল।
এই লেখায় প্রথম অংশে বাংলাদেশের চাঁদাবাজির কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হবে এবং দ্বিতীয় অংশে সেই কারণের আলোকে চাঁদাবাজি থেকে মুক্তির বাস্তবসম্মত উপায়গুলো তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজির কারণসমূহ
১. জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
বাংলাদেশে চাঁদাবাজির শিকড় অনেক গভীরে। ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও জমিদারদের জোরপূর্বক খাজনা আদায় ছিল রাষ্ট্রীয় বৈধতা পাওয়া এক ধরনের চাঁদাবাজি। এই সংস্কৃতি সমাজে একটি বার্তা দেয়—ক্ষমতা থাকলে অর্থ আদায় করা যায়। এই মানসিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রূপ বদলে টিকে আছে।
২. পুলিশভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তার অনুপস্থিতি
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কখনোই কার্যকরভাবে পুলিশের হাতে ছিল না। পঞ্চায়েত, মাতব্বর, জমিদার কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীরাই শৃঙ্খলা রক্ষা করতো। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি হলেও এই শূন্যতা পূরণ হয়নি। ফলে রাজনৈতিক কর্মী ও ক্যাডাররা সেই শূন্যতা দখল করে “নিরাপত্তার বিনিময়ে ফি”—অর্থাৎ চাঁদা—নিতে শুরু করে।
৩. সামাজিক অপরাধ হিসেবে চাঁদাবাজিকে স্বীকৃতি না দেওয়া
১৮৬১ সালের ব্রিটিশ পেনাল কোডে চাঁদাবাজির মতো সামাজিক ও রাজনৈতিক অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে এটি অপরাধ হয়েও অনেক সময় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। আইনের চোখে যখন অপরাধ অস্পষ্ট থাকে, তখন অপরাধীর সাহস বেড়ে যায়।
৪. নেতিবাচক চর্চা টিকিয়ে রাখার সামাজিক প্রবণতা
আমরা বাঙালিরা অনেক নেতিবাচক চর্চাকে প্রশ্ন না করে গ্রহণ করেছি। একসময় যা ব্যতিক্রম ছিল, সেটাই ধীরে ধীরে “নিয়ম” হয়ে গেছে। চাঁদাবাজিও তেমনই—একে আমরা ঘৃণা করি, কিন্তু প্রতিরোধে সম্মিলিত হই না।
৫. ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিকাশ
ভোটকেন্দ্র দখল, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো ও মাঠ নিয়ন্ত্রণ—এই কৌশল থেকেই ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির জন্ম। ক্যাডারদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন অর্থ, আর নিরাপদ অর্থের উৎস হলো চাঁদাবাজি। এভাবেই চাঁদাবাজি রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠে।
৬. ব্রিটিশ আমলের দায়মুক্তিমূলক আইনি কাঠামো
আমাদের বিচারব্যবস্থায় বিচারক, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার জবাবদিহিতা দুর্বল। ফলে চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধ করে। শাস্তির ভয় না থাকলে অপরাধ কমে না।
৭. দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা ও ব্যাপক বেকারত্ব
অদক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা তরুণদের কর্মসংস্থানের যোগ্য করে তুলতে ব্যর্থ। রাজনীতি তখন কর্মসংস্থানের বিকল্প হয়ে ওঠে, আর চাঁদাবাজি হয়ে যায় আয়ের পথ।
৮. মাঠপর্যায়ের শাসন শূন্যতা
ফুটপাত, অবৈধ বাজার, অবৈধ পরিবহন—এসব জায়গায় রাষ্ট্র নেই, কিন্তু শৃঙ্খলা দরকার। এই শূন্যতায় রাজনৈতিক শক্তি প্রবেশ করে এবং শৃঙ্খলার নামে চাঁদা আদায় করে।
৯. রাজনৈতিক দলের দুর্বল কাঠামো ও অর্থায়ন ব্যবস্থা
রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছ তহবিল ব্যবস্থার অভাবে কর্মীদের “নিজ উদ্যোগে” অর্থ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হয়। এই সুযোগই চাঁদাবাজিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
১০. রাজনৈতিক সংগঠন আইন ও নাগরিক অধিকার আইনের অভাব
রাজনীতি করার জন্য কে যোগ্য, কীভাবে করবে, কী অপরাধ—এসব নির্ধারণের কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত না হলে চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না।
চাঁদাবাজি থেকে মুক্তির উপায়
চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে কেবল আলাদা আইন করলেই হবে না, সংবিধান ও আইনের দর্শনগত সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিতে নাগরিকের জীবিকা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে কেন্দ্রে আনতে হবে। আইন এমন হতে হবে যাতে ক্ষমতা নয়, অধিকার মুখ্য হয়। রাষ্ট্র যদি নিজেই নীতিগতভাবে শক্ত অবস্থানে না দাঁড়ায়, তাহলে চাঁদাবাজি কেবল রূপ বদলাবে, বিলুপ্ত হবে না।
১. চাঁদাবাজিকে স্বতন্ত্র সামাজিক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা
চাঁদাবাজিকে আলাদা অপরাধ হিসেবে আইনে সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং এর জন্য সামাজিক অধিকার সংকোচনমূলক শাস্তি চালু করতে হবে। জোরপূর্বক চাঁদা নিলে সেটা ফৌজদারী অপরাধ এবং কৌশল, মিথ্যা ও চালাকির মাধ্যমে নিলে তাকে নাগরিক ও সামাজিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ফৌজদারী অপরাধের জন্য জেল জরিমানা এবং নাগরিক ও সাামাজিক অপরাধের জন্য নাগরিক ও সামাজিক শাস্তি দিতে হবে। যেমন সামাজিক কাজে অনুদান প্রদান, রাস্তা ও খাল পরিষ্কার, রক্তদান এবং নাগরিক অধিকার নিয়ন্ত্রণ।
২. পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পুনর্গঠন
মাঠপর্যায়ে পুলিশকে কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক কর্মী নয়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দৃশ্যমান করতে হবে। নাগরিক পরিষদ এর সাথে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের ত্রিমুখী সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি এলাকার সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়ে একটি এলাকা ভিত্তিক প্রকৃতিপুঞ্জ গঠন করতে হবে। যারা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করবে।
৩. ক্যাডার রাজনীতির অবসান ও দলীয় সংস্কার
রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্যাডারনির্ভরতা ত্যাগ করে আদর্শভিত্তিক রাজনীতিতে ফিরতে হবে। দলীয় গঠনতন্ত্রে অর্থায়নের স্বচ্ছ বিধান যুক্ত করতে হবে। দলের কমিটি, নির্বাচন, অর্থায়ন, অনুদান গ্রহণ ইত্যাদি প্রক্রিয়া স্বচ্চ ও গণতান্ত্রিক হতে হবে।
৪. রাজনৈতিক সংগঠন আইন ও নাগরিক অধিকার আইন প্রণয়ন
কারা রাজনীতি করতে পারবে, অপরাধে জড়ালে কী শাস্তি—এসব নির্ধারণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠন আইন প্রণয়ন জরুরি। রাজনৈতিক সংগঠন আইন ও বিধি দ্বারা কারা কিভাবে রাজনীতি করবে এবং কিভাবে রাজনীতি থেকে দুষ্ঠু লোকদের প্রতিহত করা থাকবে সে কাঠামো আইনের মধ্যে থাকতে হবে।
নাগরিকের জীবন, জীবিকা ও ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না। আইনের কাঠামো এমন হবে যে, যে অন্যের নাগরিক অধিকার হরণ করবে তার মৌলিক ও মানবাধিকার সমুন্নত রেখে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করতে হবে। যেমন= কেউ যদি জালভোট দেয় বা অন্যের ভোট দেয়। তাহলে সে ১০ বছর প্রার্থী হতে পারবেনা এবং ১০ বছর ভোট দিতে পারবেনা। জেল জরিমানা জনিত শাস্তি কাঠামো থেকে বের হয়ে সামাজিক শাস্তিকে আইনের অন্তভূক্ত করতে হবে।
৫. স্ট্রিট দোকান ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কার
ফুটপাত ও রাস্তার দোকানগুলো চাঁদাবাজির সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র। একে উচ্ছেদ করে সমাধান করা যায়নি। তাই দরকার কাঠামোগত সমাধান— সব স্ট্রিট দোকানকে লাইসেন্স ও ডিজিটাল পোর্টালের আওতায় আনতে হবে, এলাকা ভিত্তিক এজেন্ট ও ইজারাদার নিয়োগ করতে হবে, তাদের দায়িত্ব হবে— রাস্তা পরিচ্ছন্ন রাখা, নির্ধারিত সীমানা মেনে চলা, ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা, ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চাঁদাবাজির বদলে একটি আইনসঙ্গত, সম্মানজনক ও টেকসই আয়ের পথ তৈরি হবে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ পাবে, ব্যবসায়ী নিরাপত্তা পাবে, আর অপরাধের জায়গা সংকুচিত হবে।
৬. পরিবহন ব্যবস্থাপনার সংস্কার
পরিবহন খাত বাংলাদেশের চাঁদাবাজির অন্যতম বড় ক্ষেত্র। কিন্তু এখানে শুধু দমনমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।
বরং প্রয়োজন— চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রিত ও রূপান্তরিত করা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার টেন্ডারভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া, টোল আদায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে চালু করা, ভ্যাট ও ট্যাক্সের আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বৃদ্ধি করা, এর মাধ্যমে যারা একসময় চাঁদাবাজ ছিল, তাদেরকে সেবা প্রদানকারী, করদাতা ও স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এতে অপরাধ কমবে, রাষ্ট্র লাভবান হবে।
৭. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সুযোগ প্রসারিত করণ
দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তরুণদের রাজনীতিতে গিয়ে অপরাধ করার প্রয়োজন না পড়ে।
৮. বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহিতা
বিচারক, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যাতে অপরাধীরা বারবার ছাড় না পায়।
৯. সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা
চাঁদা না দেওয়া যেন ব্যক্তির সাহস নয়, সমাজের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়—এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন না থাকাই চাঁদাবাজির অন্যতম বড় কারণ।
এ জন্য— রাজনৈতিক সংগঠন আইন প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা থাকবে: কারা রাজনীতি করতে পারবে, রাজনৈতিক সংগঠনের অর্থায়নের উৎস কী হবে, সামাজিক অপরাধে জড়িত হলে রাজনীতি করার অধিকার বাতিল হবে, যারা চাঁদাবাজি, দখলদারি, তোলাবাজি ও ভয়ভীতির রাজনীতিতে যুক্ত—তাদের জন্য রাজনীতির রাস্তা আইনগতভাবে বন্ধ করতে হবে।
একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী নাগরিক অধিকার আইন প্রণয়ন করতে হবে, যাতে নাগরিকের ব্যবসা, চলাচল ও জীবিকার ওপর কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক শক্তি হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
চাঁদাবাজি কোনো ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা দূর করতে হলে আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসন—সবখানে একযোগে সংস্কার দরকার। দমন নয়, রূপান্তর; ভীতি নয়, কাঠামো—এই নীতিতে এগোতে পারলেই বাংলাদেশ চাঁদাবাজিমুক্ত হওয়ার বাস্তব পথে হাঁটতে পারবে।
– জাহাঙ্গীর আলম শোভন
