কোরআন অনুবাদ

কোরআনের সহজ সরল বাংলা অনুবাদের বৈশিষ্ট্য

কোরআনের সহজ সরল বাংলা অনুবাদের বৈশিষ্ট্য

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমেদ অনূদিত কোরআনের সহজ–সরল বাংলা অনুবাদ বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। অনেক সংস্করণে সূরা পরিচিতি, আয়াত নম্বর, শিরোনাম বা বিষয়ভিত্তিক ভাগ দেওয়া হয়েছে, যা পাঠককে বিষয় বুঝতে সাহায্য করে। এছাড়া  তাঁর অনুবাদের  অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো—

নামকরণ

অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে ভুল নাম করা হয়। যেমন ‘‘বাংলা কোরআন’’ । আসলে কোরআন ১টাই তার আর কোনো রুপান্তর নেই। শুধুমাত্র কোরআনের বক্তব্যটাকে অনুবাদ করা হয়। এমনকি এই অনুবাদ যুগের সাথে বদলে যেতে পারে। কারণ কোরআনের ভাষার গভীরতা অনেক বেশী। এমন শব্দ রয়েছে যা একশ বছর আগে যে অনুবাদ হতো এখন সেটি অর্থ বহন করে। আবার এখন যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সেটা ১শ আগে ব্যবহার করলে লোকেরা বুঝতো না। তাই যুগের সাথে যথাযথ অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য বাংলা কোরআন বা বঙ্গানুবাদ কোরআন নয় বরং ‘‘কোরআনের  অনুবাদ‘‘ যথাযথ। এজন্য এই কোরআনটির নাম ‘‘কোরআনের সহজ সরল বাংলা অনুবাদ’’ আর যেটাতে আরবিসহ রয়েছে সেটির নাম ‘‘ কোরআন শরীফ: সহজ বাংলা অনুবাদ’’।

ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ

কোরআনের শুরুতে রয়েছে। কোরআনের ইতিহাস, কোরআনের নামগুলো, নানারকম মুজিযা আরো বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৫০ পৃষ্ঠার তথ্য। যা একটি বইয়ের সমান। এগুলো একজন বাংলাভাষী কোরআনের পাঠককে অনেক কিছু জানতে সাহায্য করে। কোরআনের পড়ার সময় কিংবা আগে পরে এই বিষয়গুলো জেনে রাখলে কোরআনকে বোঝা কিছুটা সহজ হয়। রয়েছে কোরআনের বাংলা অনুবাদের ইতিহাসের উপর একটি নিবন্ধ। যা পাঠককে ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য দিয়ে চমকপ্রদ করে তুলবে।

বিষয়ভিত্তিক সূচী

সূরা, পারা ভিত্তিক সূচী এমনকি রুকু ও পৃষ্ঠাভিত্তিক বিভাজনের সাথে এখানে রয়েছে এক অমূল্য বিষয়ভিত্তিক সূচী। যেমন উদাহরণস্বরুপ বলা যায় নামায সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত কোন কোন সূরার কত নং আয়াত সেটা নির্দিষ্ঠ করা আছে। কেউ যদি মনে করে আমি আজকে শুধু হজ্জ সম্পর্কিত আয়াতগুলো পড়বো। তাহলে খুঁজে খুঁজে তারপক্ষে সেভাবে পাঠ করা সম্ভব।

সহজ ও সরল অনুবাদ

প্রথমদিকের কোরআনের অনুবাদগুলো সাধু ভাষায় লেখা হলেও এটা বর্তমান সময়ের অনুবাদের মতো চলিত ভাষায় লেখা। এবং প্রচলিত বাংলা শব্দ এবং সেগুলোর প্রচলিত বানানকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একজন সাধারণ শিক্ষিত পাঠকও কোনো শব্দের অর্থ নিয়ে কনফিউশনে থাকবেনা। আমাদের দৈনিন্দিন ব্যবহার্য শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।

সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা

অনুবাদে কঠিন আরবি-ফার্সি শব্দের আধিক্য না রেখে তিনি সহজবোধ্য বাংলা ব্যবহার করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষিত পাঠক, এমনকি তরুণ শিক্ষার্থীরাও অর্থ বুঝতে পারেন।

আক্ষরিক ও ভাবানুবাদের সমন্বয়

তিনি কেবল শব্দে-শব্দে অনুবাদ করেননি, আবার পুরোপুরি মুক্ত ভাবানুবাদও করেননি। আয়াতের মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ণ রেখে প্রাসঙ্গিক অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। এতে কোরআনের বার্তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

ভাষার সাবলীলতা ও ধারাবাহিকতা

বাক্যগঠন সরল ও সাবলীল। দীর্ঘ জটিল বাক্যের পরিবর্তে ছোট ও অর্থবহ বাক্য ব্যবহার করেছেন। এতে পাঠে ক্লান্তি আসে না।

 আধুনিক বাংলা রীতি অনুসরণ

অনুবাদে আধুনিক প্রমিত বাংলা রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে সমকালীন পাঠকের কাছে ভাষা গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক মনে হয়।

 ধর্মীয় পরিভাষার ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার

যেখানে প্রয়োজন সেখানে প্রচলিত ইসলামী পরিভাষা (যেমন: সালাত, তাকওয়া, রিজিক ইত্যাদি) রাখা হয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার বাংলা অর্থও দেওয়া হয়েছে—যাতে পাঠক অর্থ হারিয়ে না ফেলেন।

তাফসির-নির্ভর নির্ভরযোগ্যতা

অনুবাদে স্বীকৃত তাফসিরগ্রন্থের ব্যাখ্যার প্রভাব দেখা যায়। ফলে ব্যক্তিগত মতামতের প্রভাব কম এবং মূলধারার ইসলামী ব্যাখ্যার সাথে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।

ব্যাকরণগত মিসিং লিংক

আমরা জানি প্রতিটি ভাষার গঠন আলাদা। আমি যদি বাংলা এবং ইংরেজীর গঠন দেখাই। তাহলে আমরা দেখবে এখাতে বাক্যের শুরুতে কর্তা দিয়ে শুরু হলেও বাংলায় শেষ হয় ক্রিয়া আর ইংরেজীতে কর্ম দিয়ে। আবার ইংরেজীতে ইজ আমরা বাংলায় ব্যবহার করি না। আমি একজন ছাত্র। এটাতে ইংরেজীতে অবশ্যই এম ব্যবহার করতে হবে। এভাবে ভাষা অনুবাদে কোনো ভাষায় শব্দ ঐহ্য থাকে কোনো ভাষায় সেটা মিসিং লিংক হয়ে যায়। সেজন্য ব্রাকেটে মিসিং লিংকগুলো দেয়া রয়েছে। এজন্য কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ছাড়াই এমনকি তাফসির ও ব্যাখ্যা ছাড়াই পাঠক মূল অর্থটি বুঝতে পারে।

ব্রাকেটে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

শুধু ব্যাকরনের মিসিং লিংক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের ঘটনা ও শানে নযুল কিংবা কোন প্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয়েছে তা না বুঝলে পাঠকের মনে ভুল বোঝাবোঝি সৃষ্টি হতে পারে এবং হয়। এই সমস্যা দূর করতে। অনুবাদের মধ্যে ব্রাকেটে ব্যাখ্যার সাথে সংহতি রেখে এমন কিছু শব্দ দেয়া হয়েছে। যা মিলিয়ে পড়লে আর বিভ্রান্তি থাকে না। এবং এই শব্দগুলো বিশ্বনন্দিত তাফসীরগুলো থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

এছাড়া হাফিজ মুনির উদ্দীন আহমেদ অনুদিত এই কোরআনটি কয়েকটি ভার্সনে পাওয়া যায়। এরমধ্যে একটি হলো বাংলা আরেকটি বাংলা ও আরবি। এখানে বাংলাদেশ থেকে মূদ্রিত ভার্সনে বাংলাদেশের মানুষের পরিচিত কলকাতা ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে মানুষ সহজে এটি পড়তে পারে।

বলা বাহুল্য আল কোরআন একাডেমী লন্ডন এই অনুবাদ প্রকল্পের সাথে বিনামূল্যে কোরআন বিতরণ কার্যক্রম ‍যুক্ত করেছে। যার আওতায় বিশ্বের ২২ টি ভাষায় এ যাবত (২০২৪) ১৮ লাখ অনুবাদসহ কোরআর বিতরণ করা হয়েছে।

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমেদের অনুবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—সহজতা, স্পষ্টতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। যারা আরবি জানেন না কিন্তু কোরআনের মর্মার্থ সহজ বাংলায় বুঝতে চান, তাদের জন্য এই অনুবাদ বিশেষ উপযোগী।

লেখা- জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply