Buroc, Study, Research

যেসব ভুল বিএনপিকে ব্যাকপুটে ফেলে দিতে পারে?

নির্বাচন ২০২৬: কি কি ভুলে  ব্যাকপুটে যেতে  পারে বিএনপি?

আগামী ১২ ফ্রেব্রুয়ারী ২০২৬ বাংলাদেশে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা ইতিহাসের দিক থেকে ভিন্নতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের দেড় বছর আগে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী, লুটেরা, খুনি ও ফ্যাসিবাদী তথা সাইকো হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। জনগন ৩৬ দিনে ১৪শ জীবন দিয়েছে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্য। আর ১৫ বছরের জীবনেরতো  আর কোনো হিসেবই নেই।

২৪ এর আন্দোলনে অবস্থান পরিষ্কার না করা

২৪ এর ফ্যাঁসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে দলীয় অবস্থান পরিষ্কার ছিলো না। দলের লাখ লাখ তৃণমূল কর্মীর অংশগ্রহণ এবং শত শত কর্মীর মৃত্যুর পরও তখনকার কৌশলগত কারণে বিশেষ করে সরকার সে আন্দোলনকে রাজনৈতিক রুপ দিয়ে যেন দমনপীড়নের কোনো নৈতিক বৈধতা না পায় এবং সারা দেশের সকল মানুষ যেন সমর্থন করে সে কারণে নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও জোরালো সমর্থন দিতে পারেনি। ফলে এই আন্দোলন বিএনপি’র তার সফল কর্মসূচীগুলোর মধ্যে অন্তভূক্ত করতে পারেনি।

 

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিরোধীতা করা

একটি আন্দোলন হয়েছে। যার তীব্রতায় শাসক ও তার দলের নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের সুবিধাভোগীরা পর্যন্ত পালিয়ে গেছে। অথচ তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাষ্ট্রপতি। তাকে বহাল  রাখার জন্য জোরালে ভূমিকা রাখে দলটি। সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল অবস্থান আন্দোলন পরবর্তী প্রথমবার বিএনপি’র প্রতি আস্থার সংকট সৃষ্টি করে।

এ ধরনের আন্দোলনে রাষ্ট্রপতি বহাল থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। এবং বাংলাদেশেও যতবার রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ ও হত্যা হয়েছে ততবার বিকল্প সমাধান দিয়ে দেশ চলেছে। তাই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির যে যুক্তি বিএনপি দিয়েছিল তা ছিল মিথ্যা বা ভুল। ফলে ইতিহাসে এই ভূমিকার জন্য বিএনপিকে সবসময় বিশ্বাসের সংকটে রাখবে। এই ঘটনা ভবিষ্যতেও নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আসতে পারে।

রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সেনাপ্রধান পরিবতর্তন হতো, সেনা প্রধান পরিবর্তন হলে সরকার অনেকগুলো সংষ্কার করতে পারতো হয়তো বা। আর সংষ্কারের মধ্যে দিয়ে গেলে সেসব সংষ্কার কাঠামোর সাথে সমন্বয় রেখে বিএনপি দল সংষ্কার করে এগিয়ে যেত, দলের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টিকারী লোকগুলো সরে যেতে বাধ্যহতো।

শেষের অংশটা আমি হয়তো দিয়ে লিখেছি। কারণ যে সরকার গঠিত হয়েছে। তাদের যোগ্যতার দূর্বলতার কারণে হয়তো চূঢ়ান্ত পর্যায়ের সংষ্কার হতো না। তবে যা হতো তাতে সবাই লাভবান হতো বা পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থার চেয়ে কিছুটা হলেও ভাল থাকতো।

দলের শীর্ষ পর্যায়ে বিতর্কিত নেতৃত্ব:

হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া দলের বেশীরভাগ শীর্ষ নেতৃত্ব ছিল বিতর্কিত। ফলে জনগনের একটা অংশের মাঝে অবিশ্বাস তৈরী হয় যে, এই বিএনপি তাদের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটাতে পারবেনা। নচেত ৫ ই আগষ্ট পরবর্তী মানুষ বাংলাদেশের জন্য বিএনপিকে ছাড়া আর কাউকে বিকল্প ভাবেনি।

যেমন, মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যিনি একজন ভদ্রলোক হওয়া সত্বেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের বিষয়ে তার উদাসীনতা, লীগের প্রতি কোমলতা এবং কিছু বিতর্কিত অবস্থান এর কারণে দলটি পুরোটাই আস্থার সংকটে পড়ে যায়।

সালাহ উদ্দীন আহমদ এর সাথে এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততা, দুদু সাহেবের উদ্যত আচরণ, ফজলুর রহমান সাহেবের বিতর্কিত মন্তব্য, আমীর খসরু মাহমুদ এর বিষয়ে বিএনপিতে আগে থেকে সমস্যা থাকা এসব কারণে শুধু জনগন নয় বিএনপি’র মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দ্বীধা দ্ধন্ধে পড়ে যায়।

 

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিরোধীতা করা:

যদি অন্তবর্তী সরকার প্রথম একবছরের মধ্যে বা জাতীয় নির্বাচনের ১ বছর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিরোধীতা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়াতে বিএনপি কতটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে?

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি দলকে গুচিয়ে ফেলতে পারতো। এটা প্রাথমিক ভাবে কিছু বিশৃংখলা হলেও স্থানীয় নির্বাচন শেষে জাতীয় নির্বাচনে গোছানো মাঠে বিএনপি আরো ভাল ফলাফল লাভ করতো। এবং স্থানীয় অনেক নেতা বিএনপি থেকে নির্বাচিত হওয়ার কারণে তাদের প্রভাবও থাকতো।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিরোধীতার কারণে জনগনের মাঝে একটি ভুল বার্তা ছড়ায় যে, বিএনপি নিজেরা ক্ষমতা এসে স্থানীয় নির্বাচন দিতে চায়। যাতে দলের নেতারা জনগনের পছন্দের প্রার্থীর বদলে তাদের নিজেদের প্রার্থীদের মনোনোয়ন দিতে পারে।

 

সংষ্কার বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা

জনগন যেখানে সংষ্কার বা পরিবর্তন চাচ্ছিল। সেখানে মীর্জা সাহেব বার বার বললেন যে, জনগন সংষ্কার বোঝে না। তাছাড়া সংষ্কারের বেশকিছু ইস্যুতে বার তর্ক বিতর্ক সৃষ্টি করার ফলে সংষ্কারের বেশীরভাগ বিষয়ে বিএনপি একমত হওয়া সত্বেও। সংষ্কার এর বিষয়ে বিএনপি কতটা আন্তরিক তা নিয়ে প্রশ্ন  উঠে যায়। ধীরে ধীরে বিএনপির অন্য এক চেহারা প্রকাশ হতে থাকে। যা বিএনপিকে নিশ্চিত বিজয়ীর জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। অথচ ধারণা ছিল যে, বিএনপি প্রশ্নাতীতভাবে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছিল।

দলীয় প্রধানের দেশে  ফিরতে বিলম্ব হওয়া

বেগম জিয়ার অসুস্থ্যতার তার পুত্র তারেক রহমান কার্যত দলের প্রধান হয়ে যান। দেশের পট পরিবর্তনের বছর পার হওয়ার পরও তিনি দেশে আসতে না পারায় সাধারণ জনগন ও দলীয় কর্মীরা হতাশ হয়ে যায়। যা সময়ের সাথে সাথে একটি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।

যদিও জনাব রহমান এর জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি ছিল। বাংলাদেশে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিদেশী কিছু শক্তি তাকে সরিয়ে দিতেও তৎপর ছিল বলে ধারণা করা হয়। ফলে তিনি তার নিরাপত্তা উপদেষ্ঠাদের কাছ থেকে সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করতে করতে পদ্মা মেঘনা যমুনার জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে।

 

 নির্বাচনের পূর্বে গণভোটের বিরোধীতা করা

এই অবস্থান দলটিকে পুরো পুরো নড়বড় করে দেয়। যদিও তাদের ধারণা তারা তাদের অবস্থান শক্তপোক্ত করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসলে তা সঠিক নয়। তারা কয়েকজন নেতাই নিজেকে দল মনে করেছে। তারা দল নয়। বিএনপি’র মূল দল হলো নেতৃমূলের লাখো হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগনের সমর্থন।

যদি নির্বাচনের ৬ মাস বা ১ বছর আগে গণভোট হতো তাহলে, সমস্ত সংষ্কারের দায়িত্ব পড়তো অন্তবর্তী সরকারের উপর। ফলে অন্য কোনো দল কোনো দোষ বা বিতর্কের মধ্যে পড়তো না। একটি নতুন সংবিধান ও শাসণতন্ত্র হতো। রাজনৈতিক আইন ও বিধিতে সংষ্কার আসতো। তার দোহাই দিয়ে বিএনপি নিজেদের দলটাও গুচিয়ে নিতো। দলের সংষ্কারের মধ্য দিয়ে যখন ঋণখেলাপী, চাঁদাবাজি প্রবণ লোকেরা বাদ পড়ে যেত। তখন তারা দলের নেতাদের দোষ দিতে পারতোনা।

নতুন ও সংশোধিত এক দল জনগনের নতুন আস্থায় উদ্ভাসিত হতো। কিন্তু তা না হওয়ার কারণে, দলে কতিপয় নেতার কতৃত্ব রয়ে গেছে। দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে তাদের খেলার পুতুল হয়ে গেছে। হয়ে যেতে পারে জনবিচ্ছিন্ন ও তৃণমূল থেকে দূরে। এই দূরত্ব তাদের জন্য ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আমি চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণহীণ দল পরিচালনার ব্যাপারটিকে আলাদা না করে এই টপিকের অধীনেই রাখতে চাই। কারণ হলো উপরের ইতিবাচক ঘটনাগুলো ঘটলে পরের নেতিবাচক ঘটনাগুলো ঘটতো না। তাই দলের নীতি নির্ধারকেরা তাদের কতৃত্ব বজায় রাখার জন্য দলকে শেষ করে দিয়েছে কিনা? তা আগামী দিনগুলোতে পরিষ্কার হবে।

প্রার্থী নির্বাচনে ভুল করা

সিনিয়র বিতর্কিত নেতৃত্বকে প্রার্থী করা বা এলাকায় তৃণমূলের বিপরীতে কোনো নেতৃত্বকে প্রার্থী করা ছিল ছোট বা কৌশলগত ভুল সেগুলোর প্রভাব হয়তো কম বা সীমিত পরিসরে ছিল। কিন্তু প্রায় অর্ধমত ঋণ খেলাপী তাও আবার শত শত হাজার কোটি টাকার খেলাপীদের প্রার্থী করার কারণে সারা দেশের সাধারণ ভোটাদের কাছে দল নিজেই একটা নেতিবাচক বার্তা দিলো।

যার সহজ মানে দাঁড়ায় বিএনপি পরিবর্তনের পথে নয় বরং আগের পথেই যাবে। এই বার্তা বিএনপিকে পেছনে ফেলে দেয়ার জন্য শেষ কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

এছাড়া জামায়াতের নারী নেত্রীদের বাঁধা দেয়া, একাত্তরের রাজনীতি করার চেষ্টা জনগন ভালোভাবে নেয়নি বলে মনে হয়। সর্বশেষ বিএনপিএর বিদ্রোহী প্রার্থী এবং ব্লগারদের ‘‘ এই বিএনপি জিয়া ও খালেদার সে বিএনপি নয়’’ বলে যে বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তা মানুষ বিশ্বাস করেছে বলে আমার মনে হয়।

এখন দেখার বিষয় হলো কত শতাংশ মানুষ এসব ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি তার সংখ্যা বা পরিমাণ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলে তবে তার একটা ইতিবাচক দিক হলো তা সকলের জন্য আগামীতে একটা শিক্ষা হয়ে থাকবে।

এখানে বিএনপি’র প্রতিপক্ষের কৌশল ও যোগ্যতা ফ্যাক্টর হবে। আমি সেটাকে ছোট করছিনা। কিন্তু আমার মনে হয় বিএনপি এই ভুলগুলো না করলে বিএনপি’র জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যেত। এখন কোনো কারণে বিএনপি খারাপ বা দূর্বল ফল করলে তার কারণ হবে এগুলো।

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply