nile, river

বিশ্বের নদীকেন্দ্রীক আন্তজাতিক সংস্থাসমূহ

জলধারার মৈত্রীতে বিশ্বশান্তি: নদীভিত্তিক আন্তরাষ্ট্রীয় সংগঠনের চালচিত্র

নদী কেবল জলধারা নয়, নদী হলো সভ্যতার ধমনী। আর এই ধমনী যখন একাধিক দেশের সীমানা পেরিয়ে বয়ে চলে, তখন তা হয়ে ওঠে ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মূল ভিত্তি।

 হিমালয়ের বরফ গলা জল যখন গঙ্গা হয়ে বাংলাদেশে মেশে, কিংবা দানিয়ুব যখন ইউরোপের দশটি দেশের সীমানা ছুঁয়ে যায়, তখন নদী হয়ে ওঠে ঐক্যের সেতুবন্ধন। পৃথিবীর প্রায় ২৬০টিরও বেশি নদী দুই বা ততোধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এই নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা, পানির সুষম বণ্টন এবং পরিবেশ রক্ষায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শক্তিশালী আন্তরাষ্ট্রীয় সংগঠন। আজ আমরা বিশ্বের তেমনই কিছু প্রভাবশালী নদী-সংগঠনের গল্প শুনবো।

 নীল নদ অববাহিকা উদ্যোগ (Nile Basin Initiative – NBI)

প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠাকাল: নীল নদকে বলা হয় মিসরের দান, কিন্তু এই নদীকে কেন্দ্র করে আফ্রিকার ১১টি দেশের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয়। নীল নদের পানির বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদ নিরসন করে ১৯৯৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তানজানিয়ার দার-এস-সালামে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

সদরদপ্তর ও সদস্য দেশ: এর সচিবালয় উগান্ডার এনতেবেতে (Entebbe) অবস্থিত। সদস্য দেশগুলো হলো— বুরুন্ডি, কঙ্গো, মিশর, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান, সুদান, তানজানিয়া এবং উগান্ডা। ইরিত্রিয়া বর্তমানে পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছে।

কাঠামো ও কার্যক্রম: এনবিআই প্রধানত তিনটি উইং নিয়ে কাজ করে: নীল পরিষদ (Nile-COM), কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (Nile-TAC) এবং সচিবালয় (Nile-SEC)। এদের মূল কাজ হলো নীল নদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

সফলতা: নীল নদ নিয়ে যুদ্ধের যে আশঙ্কা একসময় করা হতো, এনবিআই-এর আলোচনার টেবিল তা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। তারা ‘জলবিদ্যুৎ বাণিজ্য’ এবং ‘সেচ প্রকল্প’ বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদান সফলভাবে করতে পেরেছে।

 মেকং নদী কমিশন (Mekong River Commission – MRC)

প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠাকাল: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাণস্পন্দন হলো মেকং নদী। ভিয়েতনাম যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও নদী ব্যবস্থাপনার তাগিদে ১৯৯৫ সালের ৫ এপ্রিল থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে এটি গঠিত হয়।

সদরদপ্তর ও সদস্য দেশ: এর সচিবালয় লাওসের ভিয়েনতিয়েন-এ অবস্থিত। পূর্ণ সদস্য দেশ ৪টি: কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম। তবে চীন ও মিয়ানমার ‘সংলাপ সহযোগী’ (Dialogue Partners) হিসেবে যুক্ত।

কাঠামো ও কার্যক্রম: এমআরসি-র কাঠামোতে রয়েছে কাউন্সিল (মন্ত্রী পর্যায়), যৌথ কমিটি এবং সচিবালয়। এই কমিশন মূলত জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং মেকং নদীতে বড় বড় বাঁধ নির্মাণের প্রভাব নিয়ে কাজ করে।

সফলতা: মেকং অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে বন্যা পূর্বাভাস এবং খরা মোকাবিলায় এই সংস্থাটি অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে কোনো দেশ নদীতে বাঁধ দিলে তার পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণে এমআরসি-র তথ্য এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

 দানিয়ুব নদী রক্ষা কমিশন (International Commission for the Protection of the Danube River – ICPDR)

প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠাকাল: ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নদী দানিয়ুব। নদীটির দূষণ রোধ এবং টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে সোফিয়াতে ‘দানিয়ুব নদী সুরক্ষা কনভেনশন’ স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৯৮ সালে এই কমিশন পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।

সদরদপ্তর ও সদস্য দেশ: এর সদরদপ্তর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় নদী সংগঠন যার সদস্য ১৫টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)। দেশগুলো হলো— জার্মানি, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মলদোভা এবং ইউক্রেন।

কাঠামো ও কার্যক্রম: এর সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা হলো ‘অর্ডিনারি মিটিং’। এটি প্রধানত পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষা এবং বন্যার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে।

সফলতা: দানিয়ুবের পানিকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা এবং নদীটির জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা ছিল এই কমিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ‘পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল’ আন্তর্জাতিক নদী অববাহিকা হিসেবে স্বীকৃত।

আমাজন সহযোগিতা চুক্তি সংস্থা (Amazon Cooperation Treaty Organization – ACTO)

প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠাকাল: পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন রেইনফরেস্ট এবং আমাজন নদী রক্ষায় ১৯৭৮ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে এটি একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক সংস্থা (ACTO) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সদরদপ্তর ও সদস্য দেশ: এর সদরদপ্তর ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়াতে। সদস্য দেশগুলো হলো— বলিভিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গায়ানা, পেরু, সুরিনাম এবং ভেনিজুয়েলা।

কাঠামো ও কার্যক্রম: সংস্থাটি মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সভা এবং একটি স্থায়ী সচিবালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমাজনের অবৈধ বন উজাড় রোধ, আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং নদীপথে অবৈধ পাচার বন্ধে এটি কাজ করে।

সফলতা: আমাজন অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে পরিবেশগত তথ্য শেয়ারিং এবং বন রক্ষায় সম্মিলিত রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারা এই সংস্থার বড় সার্থকতা।

 গঙ্গা ও সিন্ধু ইস্যু এবং দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতা

আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় যদিও বড় কোনো ‘স্থায়ী কমিশন বা সংগঠন’ সব দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠেনি, তবে ১৯৬০ সালের ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ (Indus Waters Treaty) এবং ১৯৯৬ সালের ‘গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি’ দ্বিপাক্ষিক নদী কূটনীতির উদাহরণ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু কমিশন এবং বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন (JRC) কাজ করছে।

 নদীর জয় হোক

নদী কোনো কাঁটাতার মানে না, নদী হলো সেই জীবনের আধার। বিশ্বের এই সংগঠনগুলো আমাদের শেখায় যে, সংঘাত নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেই একটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে নদীভিত্তিক এই মৈত্রীই হতে পারে মানবসভ্যতা টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি। জাহাঙ্গীর আলম শোভনের ভাষায় বলতে হয়— “নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই বাঁচবে পৃথিবী।”

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply