কাতারের উপর অবরোধ: কি হয়েছিল ফলাফল

কাতারের উপর অবরোধ: কি হয়েছিল ফলাফল

কাতার অবরোধ ও বাংলাদেশের জন্য এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত  হতে পারে

২০১৭ সালের জুন মাসে  পবিত্র রমজান মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর  সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে অবরোধ আরোপ করে। তারা কাতারের উপর সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ তোলে, যা কাতার অস্বীকার করে।  এইতো সেদিনের কথা। কাতারের কি অর্জন ছিল সেটা ২০২২ বিশ্বকাপে কাতার দেখিয়েছে। আমরা আজকে কাতারের সে বিষয়টি স্মরণ ও বিশ্লেষণ করব।  ৫ জুন ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০২১  পর্যন্ত চলা অবরোধ শেষ হয় আল-উলা চুক্তির মাধ্যমে। ৪টি দেশ একসঙ্গে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, পরিবহন এবং সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

অনেকে বলেন,  আমেরিকার পরোক্ষ মদদ ছিল। কারণ অভিযোগ করা হয়- কাতার সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন করছে এবং ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখছে। যদিও কোনো বিশ্লেষক মনে করেন মূল কারণ ছিল সৌদি আরবের   কাতারকে কোনঠাসা করে আঞ্চলিক আধিপত্য পোক্ত করা।

অবরোধের কারণ (তাদের বক্তব্য অনুযায়ী):

  1. সন্ত্রাসবাদে সমর্থন: কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তারা মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস, তালেবান ও ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দিচ্ছে।

  2. আল জাজিরা চ্যানেলের ভূমিকা: অবরোধকারী দেশগুলো মনে করত, আল জাজিরা চ্যানেল তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে।

  3. ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক: কাতার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখায় সৌদি নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়।

  4. ২০১৭ সালের মে মাসে হ্যাকিং ইস্যু: কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম হ্যাক করে সেখানে ইরানপ্রীতি ও ইসরায়েল সংক্রান্ত ভুয়া বক্তব্য প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়।

চার দেশের ১৩ দফা দাবীর ৪টি

সৌদি আরব ও তার মিত্ররা কাতারের কাছে ১৩ দফা দাবি তোলে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

  • আল জাজিরা চ্যানেল বন্ধ করা

  • ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কমানো

  • তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা

  • মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন

কাতার এই দাবি মানতে অস্বীকার করে, কারণ তারা একে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।

অবরোধ যখন আরোপ হলো, তখন মনে হয়েছিল কাতার বুঝি টিকতে পারবে না। কিন্তু ইতিহাস উল্টো কথা বলে।

তারপর যা হলো-

মাত্র ১৬০ কিমি লম্বা ও ৮০ কিমি প্রস্থের এই ছোট্ট দেশটির একমাত্র স্থল সীমান্ত সৌদির সাথে, আর বাকি তিন দিক ঘিরে জলসীমা। বেশীরভাগ পণ্যসামগ্রী  সবই আসত সৌদি ও আমিরাত থেকে। এমনকি নির্মাণ সামগ্রী পর্যন্ত।

অবরোধের ফলে কাতার খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়। তারা তুরস্ক ও ইরান থেকে আমদানি বাড়ায় এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে, বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্যে। ফলে, কাতার দুধ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করে এবং অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনে। আমির কাতারের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, তুরস্ক, ইরান ও ওমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা, এবং নিজেদের দ্রুত অভিযোজনে সক্ষমতা— এই সব মিলিয়ে কাতার রূপ নেয় এক নতুন স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতিতে।

  • নিজস্ব সমুদ্রবন্দর সচল হয়

  • সরাসরি আমদানি শুরু হয়

  • গরুর খামার, দুধ উৎপাদন এবং সবজি চাষে আত্মনির্ভরতা গড়ে উঠে

  • এমনকি দুধ রপ্তানিও শুরু হয়

অবরোধ কাতারের জন্য অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদে রূপ নেয়। আর সৌদি ও আমিরাত হারায় এক বিশাল লাভজনক বাজার। অবশেষে ২০২১ সালে তারা অবরোধ তুলে নেয়— কিন্তু পুরনো সেই বাজার আর ফিরে পায়নি।

অবরোধের প্রভাব:

প্রথমদিকে নেতিবাচক:

  • খাদ্য সরবরাহ সংকট (সৌদি সীমান্ত বন্ধ)

  • দুধ, ওষুধ ও নির্মাণ সামগ্রীর ঘাটতি

  • জাতীয় বিমান সংস্থা কাতার এয়ারওয়েজের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যায়

পরবর্তীতে ইতিবাচক ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া:

  • তুরস্ক ও ইরান থেকে দ্রুত বিকল্প খাদ্য ও পণ্য আমদানি

  • স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি: কাতার নিজ দেশে দুগ্ধ, মুরগি ও শাকসবজি উৎপাদন বাড়ায়

  • অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য: LNG (গ্যাস) খাতে বিনিয়োগ ও নতুন বাজার খোঁজা

  • কূটনৈতিক বিজয়: কাতার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমর্থন অর্জন করে এবং অবরোধকারী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলে

  • জানুয়ারি ২০২১, আল-উলা চুক্তি (Al-Ula Declaration) স্বাক্ষরের মাধ্যমে সৌদি আরব, UAE, মিশর ও বাহরাইন কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

  • এই চুক্তির ফলে:

    • সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়

    • কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন

    • বাণিজ্য ও যোগাযোগ ধাপে ধাপে পুনরায় চালু হয়|

  • এবার বাংলাদেশ— ভারত ছাড়া কী সম্ভব?

এই ঘটনার সাথে যদি ৫ আগস্ট ২০২৩-পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গ টানা হয়, তাহলে আশ্চর্যজনক মিল পাওয়া যায়। বহু ভারতপন্থী রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ী বিশ্বাস করতেন যে, ভারত যদি আমাদের খাদ্য, জ্বালানি, অথবা অন্যান্য পণ্য না দেয়, তাহলে দেশ অচল হয়ে যাবে।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, ভারতের রপ্তানি ১৬% বৃদ্ধি পেয়ে $১.০৭ বিলিয়ন হয়েছে, এবং বাংলাদেশের রপ্তানি ২১.৫% বৃদ্ধি পেয়ে $১৬৩ মিলিয়ন হয়েছে।

বাংলাদেশ ভারত থেকে পেঁয়াজ ও আলুর আমদানির উপর নির্ভরতা কমাতে পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির চেষ্টা করছে।

যদি কাতার পারে, বাংলাদেশ কেন পারবে না? যদি কাতার নিজের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বিশ্বের এক নম্বর LNG রপ্তানিকারকে পরিণত হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ নিজস্ব শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, এবং মানবসম্পদ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply