ibn botuta

ইবনে বতুতার বিশ্বভ্রমণ

প্রারম্ভিক জীবন ও প্রথম হজযাত্রা 

ইবনে বতুতা ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর তাঞ্জিয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৩২৫ সালে, তিনি ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ (মক্কায় তীর্থযাত্রা) পালনের উদ্দেশ্যে একাকী তার জন্মভূমি তাঞ্জিয়ার থেকে রওনা দেন। তার মূল পরিকল্পনা ছিল শুধু হজ সম্পন্ন করা, কিন্তু কৌতূহল এবং জ্ঞান অন্বেষণের তাগিদে তিনি এক যাত্রায় প্রায় পুরো জানা দুনিয়া ঘুরে দেখেন।

ভ্রমণের বিস্তৃত বিবরণ

তার দীর্ঘ ভ্রমণকে কয়েকটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা যায়:

১. উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য:

  • তিনি প্রথমে উত্তর আফ্রিকা অতিক্রম করে মিশরে পৌঁছান। নীল নদ অতিক্রম করে তিনি কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া সহ মিশরের বিভিন্ন শহর পরিদর্শন করেন।

  • এরপর তিনি সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনের দিকে যাত্রা করেন। জেরুজালেম, দামাস্কাস এর মতো পবিত্র নগরী দেখার পর তিনি মক্কায় পৌঁছে হজ সম্পন্ন করেন।

২. ইরাক ও পারস্য:

  • হজ শেষ করে তিনি ইরাক ও পারস্য (বর্তমান ইরান) ভ্রমণ করেন। তিনি বাগদাদ নগরী দেখেন, যা তখন মঙ্গোল আক্রমণের পর পুনর্নির্মাণ হচ্ছিল। তিনি পারস্যের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো যেমন: ইসফাহান, শিরাজ ইত্যাদি পরিদর্শন করেন।

৩. পূর্ব আফ্রিকা:

  • এরপর ইবনে বতুতা পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো ভ্রমণ করেন। তিনি সোমালিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়া পর্যন্ত যান এবং সেই অঞ্চলের বাণিজ্য ও সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে মূল্যবান বর্ণনা রেখে গেছেন।

৪. আনাতোলিয়া (এশিয়া মাইনর) ও মধ্য এশিয়া:

  • তিনি বর্তমান তুরস্ক (তৎকালীন আনাতোলিয়ায় অবস্থিত বিভিন্ন তুর্কি বেইলিক) ভ্রমণ করেন।

  • এরপর তিনি কৃষ্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে ক্রিমিয়া, ককেশাস এবং রাশিয়ার দক্ষিণের স্তেপ অঞ্চল পর্যন্ত যান।

  • তিনি সোনার উর্দু (গোল্ডেন হোর্ড) নামে পরিচিত মঙ্গোল রাজ্যের রাজধানী সারাই শহর পরিদর্শন করেন এবং এর শাসক উজবেক খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

৫. ভারত উপমহাদেশ:

  • ইবনে বতুতার ভ্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ভারতবর্ষ। তিনি দিল্লি সুলতানাতের সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে পৌঁছান।

  • সুলতান তার পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে দিল্লির প্রধান কাযী (বিচারক) নিযুক্ত করেন। তিনি প্রায় সাত বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

  • পরে সুলতান তাকে চীনের সম্রাটের কাছে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করেন। এই সমুদ্রযাত্রায় ইবনে বতুতা দুর্যোগের সম্মুখীন হন এবং দলবিচ্ছিন্ন হয়ে যান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাপদে চীন পৌঁছান।

৬. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীন:

  • ভারত থেকে তিনি মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (যেমন: মালয় দ্বীপপুঞ্জ) হয়ে চীন ভ্রমণ করেন।

  • তিনি চীনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহরগুলো যেমন: কুয়াংচৌ (ক্যান্টন), বেইজিং (খানবালিক) ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তিনি চীনের উন্নত নৌপরিবহন, কাগজের মুদ্রা এবং কারিগরি দক্ষতায় বিশেষভাবে অভিভূত হন।

৭. প্রত্যাবর্তন ও শেষ জীবন:

  • চীন থেকে তিনি সমুদ্রপথে ফেরত আসেন এবং পশ্চিম এশিয়া হয়ে ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ শহরে ফিরে আসেন। কিন্তু তার ভ্রমণ তখনও শেষ হয়নি।

  • এরপর তিনি স্পেনের মুসলিম শাসিত অঞ্চল আন্দালুসিয়া এবং সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে পশ্চিম আফ্রিকার রাজ্য মালি ভ্রমণ করেন।

  • শেষ পর্যন্ত তিনি মরক্কোতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সুলতানের নির্দেশে, তিনি তার সমস্ত ভ্রমণকাহিনী লেখক ইবনে জুজাইয়ের সহায়তায় লিপিবদ্ধ করেন, যা “রিহলা” (ভ্রমণবৃত্তান্ত) নামে পরিচিত।

ভ্রমণকাহিনীর গুরুত্ব

ইবনে বতুতার “রিহলা” শুধু একটি ভ্রমণগল্প নয়, এটি ১৪শ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বের একটি জীবন্ত দলিল। তার বর্ণনায় ওই সময়ের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনিই প্রথম পর্যটক যিনি প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এবং তার বাইরের অনেক অঞ্চল একজন সাধারণ মানুষের视角 থেকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে গেছেন। এ কারণেই তাকে “মুসলমানদের মার্কো পোলো” বা তার চেয়েও বড় পর্যটক হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ তিনি মার্কো পোলোর চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি পথ ভ্রমণ করেছিলেন। তার এই কাহিনী ইতিহাস ও ভূগোল চর্চার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply