মানবসভ্যতার ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনকে আমরা সাধারণত আধুনিক যুগের একটি অধ্যায় হিসেবে দেখি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে, প্রাচীন চীনে। তখনকার চীন ছিল বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী, যেখানে রাজা বা সম্রাটের আদেশই ছিল সর্বশক্তিমান আইন। সেই সময় শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হতেন। কিন্তু রাজসভার পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক বিরাট ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের পথে নামেন।
ঘটনাটি ঘটেছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০ সালে, চীনের ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাচীন চীনা ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট একটি বিশেষ ফরমান জারি করেন। সেই ফরমান অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যক্রম সংশোধন ও নতুন সংযোজন না হওয়া পর্যন্ত সিভিল সার্ভিসে আবেদন করার অধিকার হারান। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্রের চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য ছিল না আমলাতান্ত্রিক পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে। ফলে রাষ্ট্রীয় চাকরির দোরগোড়া কেবল অভিজাত ও আমলা পরিবারের উত্তরাধিকারীদের জন্য উন্মুক্ত রইল। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনজন দূরদর্শী ছাত্র নেতা – গুও তাই, ঝান জিয়ান ও শি ফু – শিক্ষার্থীদের একত্রিত করেন। তাদের নেতৃত্বে ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ত্রিশ হাজার ছাত্র রাজপথে নেমে আসেন। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল—
-
পুরোনো পাঠ্যক্রম সংশোধন ও আধুনিকায়ন,
-
আমলাদের সীমাহীন ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা,
-
এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সিভিল সার্ভিসে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া।
তৎকালীন সময়ে আন্দোলনের ধরনও ছিল অত্যন্ত অনন্য। শিক্ষার্থীরা ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়াল লিখন করেন, এবং সরাসরি সম্রাট ও প্রশাসনের প্রতি নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ যেন প্রাচীন কালের মধ্যে আধুনিক আন্দোলনের প্রথম ছাপ।
কিন্তু ক্ষমতাশালী সম্রাট শিক্ষার্থীদের এই বিদ্রোহ সহ্য করেননি। তিনি সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আন্দোলন দমন করেন। অসংখ্য ছাত্রকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, অনেককে নির্বাসিত হতে হয় দূর প্রদেশে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয় অনেক আন্দোলনকারীর।
প্রাচীন চীনা ইতিহাসবিদ শি মা গুয়াং উল্লেখ করেছেন, গুও তাইকে নির্বাসিত করা হয়, ঝান জিয়ানকে দীর্ঘ সময় কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। অন্য নেতা শি ফু পালিয়ে পাহাড়ে আত্মগোপন করেন এবং পরে এক লোহার খনিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ঝান জিয়ান পরবর্তীতে মুক্তি পান এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ক্যাপ্টেন অব দ্য গার্ড পদে উন্নীত হন। আর গুও তাইকে প্রাচীন চীনা লেখকরা অসাধারণ মেধাবী ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন।
যদিও এই আন্দোলন সফল হয়নি, তবে এটি ইতিহাসে এক অনন্য নজির। প্রাচীন চীনের মতো পরাক্রমশালী সম্রাটের বিরুদ্ধে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর সংগঠিত আন্দোলন সে সময়ের জন্য বিস্ময়কর ঘটনা ছিল। প্রাচীন চীনা লেখকরা লিখেছেন, “শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষা গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোরও সাহস দেখিয়েছিল।”
এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ছাত্র সমাজ সর্বদাই অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। চীনের ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আন্দোলন পরবর্তী কালের নানা ছাত্র আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল বলা যায়।
এই আন্দোলন ছিল পৃথিবীর প্রথম নথিভুক্ত ছাত্র আন্দোলন, যা দেখিয়েছিল— শিক্ষার্থীরা শুধু ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়কই নয়, তারা প্রয়োজনে সমাজ ও রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামী সৈনিকও হতে পারে।

