charles-1

ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা চার্লস এর মুত্যুদন্ড

ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস: রাজা থেকে মৃত্যুদণ্ড

ইউরোপীয় ইতিহাসে রাজাদের মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বিরল ঘটনা। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস (Charles I, শাসনকাল ১৬২৫–১৬৪৯) ছিলেন সেই বিরল উদাহরণ, যিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তাঁর ফাঁসিকাঠে না গিয়ে শিরশ্ছেদে দণ্ড কার্যকর হয়, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে রাজতন্ত্র, সংসদ ও জনগণের ক্ষমতার ভারসাম্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।

রাজা প্রথম চার্লসের শাসন শুরু

চার্লস ১৬২৫ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন গভীরভাবে রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার (Divine Right of Kings)-এর বিশ্বাসী, অর্থাৎ রাজা ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতার দ্বারা শাসন করেন এবং তাঁকে জনগণ বা সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। এ ধারণাই তাঁকে সংসদের সঙ্গে ধারাবাহিক দ্বন্দ্বে নিয়ে যায়।

সংসদ বনাম রাজা

চার্লস রাজস্ব বাড়ানোর জন্য সংসদকে বাইপাস করে একাধিক কর আরোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে “ক্যাথলিক ঝোঁক” দেখিয়েছিলেন, যা প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ ও প্রজাদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে। ফলে চার্লস ও সংসদের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।

গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত

১৬৪২ সালে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। সংসদপন্থী (Parliamentarians, যাদের “Roundheads” বলা হতো) এবং রাজপন্থীদের (Royalists, যাদের “Cavaliers” বলা হতো) মধ্যে ইংলিশ সিভিল ওয়ার শুরু হয়। সংসদীয় বাহিনীর নেতৃত্ব দেন অলিভার ক্রমওয়েল। কয়েক বছরের যুদ্ধ শেষে সংসদীয় বাহিনী জয়লাভ করে এবং রাজা চার্লস বন্দি হন।

বিচার প্রক্রিয়া

১৬৪৯ সালের জানুয়ারিতে রাজা প্রথম চার্লসকে বিশেষ এক ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়—“High Court of Justice”-এ। তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় “দেশের স্বাধীনতা নষ্ট করা, সংসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং জনগণের রক্তপাত ঘটানোর জন্য।” চার্লস দাবি করেন, একজন বৈধ রাজাকে জনগণের আদালত বিচার করতে পারে না। কিন্তু আদালত তাঁকে “জাতির শত্রু” ও “স্বৈরাচারী শাসক” হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে।

চার্লস I ব্যক্তিগতভাবে কোনো হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন প্রমাণ নেই। তবে: তিনি সংসদের বিরুদ্ধে নিজস্ব রাজকীয় সেনা (Royalist Army) গড়ে তুলেছিলেন। এই সেনারা যুদ্ধে অংশ নিয়ে বহু মানুষ হত্যা করে, লুটপাট ও নির্যাতনের অভিযোগও ছিল। চার্লসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়। আদালত তাঁকে এই যুদ্ধের “নৈতিক দায়” ও “জনগণের রক্তপাতের দায়” বহন করার জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করে।

মৃত্যুদণ্ডে বিচারকদের ভোটাভুটি

রাজা প্রথম চার্লসের বিচার হয়েছিল High Court of Justice নামে বিশেষভাবে গঠিত একটি আদালতে। মোট ১৩৫ জন বিচারক মনোনীত হয়েছিলেন, তবে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় ৬৮ জন। শেষ পর্যন্ত ৫৯ জন বিচারক তাঁর মৃত্যুদণ্ডে সই করেন। আদালতের মধ্যে বিভাজন এতটাই তীব্র ছিল যে, অনেক বিচারক ভোট দেওয়া বা স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। ঐতিহাসিকরা বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অল্পের ওপর দাঁড়িয়েছিল; অর্থাৎ মাত্র কয়েক ভোট কম হলে হয়তো মৃত্যুদণ্ড হতো না। এক কথায়, চার্লসের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ধারিত হয়েছিল মাত্র কয়েকটি ভোটের ব্যবধানে। অন্য তথ্য মতে সেদিন আরো বিচারক উপস্থিত হলে এবং আরো ১০ জন বিচারক না ভোট দিলে তিনি বেঁচে যেতেন।

অন্য সূত্র মতে ৬৮ জন বিচারক ফাঁসির পক্ষে রায় দেন। যদি ১ জন কম দিতো তাহলে সব কিছু ভিন্ন রকম হতো?

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

১৬৪৯ সালের ৩০ জানুয়ারি লন্ডনের হোয়াইটহল প্রাসাদের বাইরে একটি কাঠের মঞ্চে তাঁকে আনা হয়। ঠাণ্ডা শীতের সকালে বিপুল জনতা এ দৃশ্য দেখতে জড়ো হয়। চার্লস শান্তভাবে বলেন, তিনি সবসময় দেশের স্বাধীনতা ও বিশ্বাস রক্ষার জন্য লড়েছেন, তবে বিচারটি অন্যায্য। এরপর জল্লাদ তাঁর শিরশ্ছেদ করেন। জনতা হতবাক নীরবতায় দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবেই ইংল্যান্ডে প্রথমবারের মতো কোনো রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

জনগণের প্রতিক্রিয়া

১৬৪৯ সালের ৩০ জানুয়ারি লন্ডনের হোয়াইটহল প্রাসাদের সামনে রাজা চার্লসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। জনতা ব্যাপকভাবে জড়ো হয়েছিল, তবে পরিবেশ ছিল অতিমাত্রায় নীরব ও শোকপূর্ণ। রাজাকে অনেকে ঘৃণা করলেও, “ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা” তত্ত্বের কারণে অধিকাংশ মানুষ রাজাকে পবিত্র মনে করত। অনেকে ভেবেছিল, রাজা মারা গেলে দেশে শান্তি আসবে; আবার অনেকে এই বিচারকে “অপবিত্র ও ঈশ্বরবিরোধী কাজ” মনে করেছিলেন। রাজা চার্লসের মৃত্যুর পর তাঁকে “শহীদ” (Martyr) হিসেবে কল্পনা করা শুরু হয়, বিশেষ করে অ্যাংলিকান চার্চের অনুসারীদের মধ্যে। পরে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্চ অব ইংল্যান্ড “সেন্ট” হিসেবে স্মরণ করে।

মৃত্যুদণ্ডের তাৎপর্য

বিচারকদের অল্প ব্যবধানের ভোটে চার্লস মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। জনগণের মধ্যে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া ছিল—কেউ নীরবে মেনে নেয়, কেউ তাঁকে শহীদ মনে করে। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে বিচার রিভিউ করা হয় এবং বিচারকদের অনেককেই শাস্তি দেওয়া হয়। চার্লস ব্যক্তিগতভাবে হত্যার নির্দেশ দেননি, তবে তাঁর বাহিনী যুদ্ধের সময় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, যা তাঁর মৃত্যুদণ্ডের প্রধান আইনি ভিত্তি ছিল।

চার্লসের মৃত্যুদণ্ড ব্রিটিশ ইতিহাসে রাজতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থার সম্পর্ক পাল্টে দেয়। এর পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড “কমনওয়েলথ” নামে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, যদিও পরবর্তীতে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবুও এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাজা জনগণের ঊর্ধ্বে নন এবং তাঁকে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।

অলিভার ক্রমওয়েলের শাসন

১৬৫৩ সালে ক্রমওয়েল নিজেকে ঘোষণা করেন “লর্ড প্রোটেক্টর”। তিনি কার্যত একজন রাজাধিপতির মতোই ক্ষমতা ব্যবহার করতেন, যদিও নাম ছিল প্রজাতন্ত্র। ধর্মীয় কঠোরতা, সামরিক প্রভাব এবং সংসদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। তাঁর শাসনকালে কিছু স্থিতিশীলতা এলেও জনগণ মনে করল, প্রকৃত স্বাধীনতা বা স্থায়ী শান্তি আসেনি।

দেশকে ঘোষণা করা হয় “কমনওয়েলথ অব ইংল্যান্ড”, যা মূলত সংসদ ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে। প্রথম দিকে সংসদ দেশ চালালেও সেনাবাহিনীর প্রভাব ছিল প্রবল। বাস্তবে সামরিক নেতা অলিভার ক্রমওয়েল ছিলেন সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি।

 ক্রমওয়েলের মৃত্যু ও অরাজকতা

১৬৫৮ সালে ক্রমওয়েল মারা গেলে তাঁর ছেলে রিচার্ড ক্রমওয়েল উত্তরসূরি হন। রিচার্ডের মধ্যে বাবার মতো নেতৃত্বগুণ ছিল না। সেনাবাহিনী তাঁকে সমর্থন করেনি, সংসদও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অল্প সময়েই দেশ ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় ডুবে যায়।

 জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবি

চার্লস I-এর ছেলে চার্লস II তখন নির্বাসনে ছিলেন (ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় নিয়েছিলেন)। ১৬৬০ সালে সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী জেনারেল জর্জ মনক (George Monck) সংসদকে বোঝান যে, রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ছাড়া উপায় নেই। সংসদ চার্লস II-কে দেশে ফেরার আমন্ত্রণ জানায়। চার্লস II দেশে ফিরে এসে সিংহাসনে বসেন।এই ঘটনাকে বলা হয় “The Restoration” (রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা)। ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পর জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রবল দাবি ওঠে। রাজাদের প্রতি পুরোনো আনুগত্য (Loyalty) আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেকেই বিশ্বাস করল, রাজা থাকলে দেশের স্থিতিশীলতা ফিরবে। সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারাও দেখলেন, রাজতন্ত্র ছাড়া সমাধান নেই।

পুনঃপ্রতিষ্ঠার শর্ত

চার্লস II রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় কিছু শর্ত মেনে নেন—তিনি সংসদের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবেন না বলে প্রথমে আশ্বাস দেন, তবে পরে অনেক বিচারক ও রাজনীতিবিদকে শাস্তি দেওয়া হয় জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে, অতীতের বিভেদ ভুলে একটি নতুন সূচনা হবে। এই পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইংল্যান্ডে আবার রাজাদের প্রভাব ফিরে এল। তবে এরপর থেকে রাজারা ধীরে ধীরে সংসদের কাছে জবাবদিহি হতে শুরু করেন। ভবিষ্যতে এ ধারাই গড়ে দেয় সংবিধানিক রাজতন্ত্রের ভিত্তি।

রাজতন্ত্র কিভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়?

১৬৪৯ সালে চার্লস I-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয় এবং ইংল্যান্ড “কমনওয়েলথ” নামে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয় এবং অলিভার ক্রমওয়েল “লর্ড প্রোটেক্টর” হিসেবে শাসন করেন (১৬৫৩–১৬৫৮)। ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। ১৬৬০ সালে জনগণ ও রাজনীতিবিদরা রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে ঐক্যমত হন। চার্লস I-এর ছেলে চার্লস II-কে নির্বাসন থেকে ডেকে আনা হয় এবং তাঁকে রাজা ঘোষণা করা হয়। একে বলা হয় The Restoration বা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

রাজা প্রথম চার্লসের মৃত্যুদণ্ড শুধুমাত্র একটি রাজপরিবারের পতন ছিল না, বরং আধুনিক গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের সূচনার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেখিয়ে দেয় যে শাসকের ক্ষমতা জনগণের সমর্থন ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী নয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply