অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র

অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র

অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র

যেকোনো বিষয়ে দুজন মানুষ বা দুটি পক্ষ নিয়মিত বা ধারাবাহিক বা দীর্ঘসময়ের জন্য কাজ করতে চাইলে বিশেষ করে যেখানে দেনাপাওনা বা মূল্যযোগ আছে সেসব ক্ষেত্রে অবশ্যই চুক্তি হওয়া উচিত। চক্তি লিখিত ও মৌখিক দু’ভাবে হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে আমরা এমন এক বহুধা বিভক্ত এবং বহুমাত্রিক কর্মমূখী সমাজে বাস করি এখানে মৌখিক চুক্তি প্রয়োজন ফুরিয়েছে বলা যায় বিশেষ করে দুটো পক্ষের মধ্যে যখন ভুল বুঝাবোঝি শুরু হয়।
ইসলাম তার অনুসারিদের মৌখিত চুক্তির বদলে লিখিত চুক্তি করতে নির্দেশ দিয়েছে। এবং কিভাবে চুক্তি করতে হয় শিখিয়েছে। ঐতিহাসিক মদীনা সনদের মাধ্যমে আজ থেকে ১৪শ বছর আগে মদীনা শহরে আগত আর স্বাগত ব্যক্তিদের মাঝে এবং ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ^াসীদের সাথে মদীনা সনদ নামে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সেটা আজো মানুষকে পথ দেখায়।
তবে আধুনিক সমাজে আরো কয়েকধাপ এগিয়ে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের জন্য স্ট্যাম্প তৈরী করেছে এবং চুক্তিপত্র রেজিস্ট্রি করে তার আনুষ্ঠানিক রুপ দেয়ার বিধান প্রচলন করেছে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এর প্রাসঙ্গিকতা পদে পদে বিদ্যমান।
বলা যায় অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র যেকোনো আকৃতির ব্যবসায়িক উদ্যোগের একটি প্রাথমিক চুক্তিপত্র। উদ্যোক্তা বা ব্যবসার মালিকের সাথে অফিস বাড়ি বাসা বা স্খানের মালিকের সাথে সম্পাদিত চুক্তি যার বদলে একজন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী অন্য একজন ব্যক্তির ঠিকিানা ও সম্পত্তি ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন।

চুক্তিপত্র কেন প্রয়োজন
১। ব্যবসায়ের অনেকগুলো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মধ্যে এটাও একটা। কারণ সরকারী স্ট্যাম্পে আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠছে একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে।
২। ট্রেড লাইসেন্স তৈরীর একটি অপরিহার্য দলিল। এছাড়া ব্যাংক ঋণসহ বিভিন্ন কাজে এটি প্রয়োজন হয়।
৩। একজন উদ্যোক্তা আরেকজন দ্বিতীয় ব্যক্তির দালান বা কোঠা বা ঘর ব্যবহার করবে তা নিশ্চই কিছুর বিনিময়ে এবং বহু শর্তসাপেক্ষে সে জিনিসগুলো সঠিকভাবে লিখিত না থাকলে দুজনের মাঝে ভুল বোঝাবোঝি দেখা দিতে পারে এবং সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে।
৪। চুক্তির মাধ্যমে ভাড়ার টাকা ও মেয়াদসহ যাবতীয় তথ্য উল্লেখ থাকে। যাতে বাড়ীওয়ালা চাহিবামাত্র ভাড়া চাইতে পারেনা, ইচ্ছেমত ভাড়া বাড়াতে পারেনা এবং যখনখুশি ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারে না। এই নিরাপত্তাগুলো না থাকলে ব্যবসা করা সম্ভব হবেনা।
চুক্তিপত্রে কি থাকে
১। চুক্তিপত্রের শিরোনাম, চুক্তির বিষয় ও তারিখ
২। উভয়পক্ষের নাম ঠিকানা ছবি মোবাইল নাম্বার ও জাতীয় পরিচয়পত্র নং
৩। ঘরের বিবরণ, ঘরভাড়ার বিবরণ ও ভাড়ার শর্ত
৪। উভয়পক্ষের স্বাক্ষর ও ২ জন করে ৪ জন স্বাক্ষীর নাম পরিচয় ও স্বাক্ষর
৫। কমপক্ষে ৩০০ টাকা দামের স্ট্যাম্প প্যাড

চুক্তিনামা স্বাক্ষরের গুরুত্বপূর্ণ দিক
১। প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে চুক্তি করতে গিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও শর্ত যেন বাদ না পড়ে।
২। বিষয়টা বড়ো কিংবা ছোট হোক চুক্তিতে কার কী দায়দায়িত্ব, তা সুস্পষ্টভাবে লিখিত থাকতে হবে। কোনো অস্পষ্টতা রাখা যাবে না। এতে চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের জটিলতায় সৃষ্টি হতে পারে।
৩। চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা কাজ নিয়ে হলে তা শুরুর তারিখ এবং সম্পন্ন বা অবসান হওয়ার তারিখ থাকতে হবে।
৪। কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, তাও চুক্তিতে থাকতে হবে।
৫। কোনো কারণে মেয়াদ পূর্তির পূর্বে চুক্তি রহিত করার সুযোগ থাকলে তা লেখা থাকতে হবে এবং কিভাবে এবং কতদিনের নোটিশে তা রোহিত করা হবে সেটা উল্লেখ করতে হবে।
৬। বর্তমানে সব ক্ষেত্রেই মীমাংসার মাধ্যমে যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তিকে উৎসাহিত করা হয়। তাই চুক্তিপত্রের একটি অনুচ্ছেদে এ-সংক্রান্ত শর্ত রাখা জরুরি।
৭। নাবালক, পাগল, দেউলিয়া ব্যক্তি, দেশদ্রোহী ব্যক্তির সঙ্গে কোনো চুক্তি করা যাবে না। বিশেষ করে ব্যবসায়িক চুক্তি তো একবারেই নয়।
৮। চুক্তিপত্রের শর্তগুলো ষ্পষ্ট, স্¦চ্চভাবে লিখুন। লেখায় জটিলতা পরিহার করে সহজ সরল ভাষায় লিখুন। আগেকার দিনের জটিল ভাষায় চুক্তি পত্র লেখা জরুরী নয়।
৯। চুক্তিপত্রের ২টি কপি ২ পক্ষের কাছে রাখুন।
১০। সম্ভব হলে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ছবি তুলে রাখুন। স্বাক্ষীদের সামনেই স্বাক্ষর করার চর্চা করুন।
১১। দেশের প্রচলিত আইনের বিপরীতে কোনো চুক্তি সবসময় মূল্যহীন হবে। যেমন, নিষিদ্ধ কোনো ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
১২।

বাড়ী/অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র (নমুনা)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
“মাসিক উচ্ছেদযোগ্য বাড়ী/অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র দলিল”

১ম পক্ষ : বাড়ীর মালিক
নাম : কাজী আবিদুর রহিম
পিতার নাম : মরহুম আশরাফুর রহিম
ঠিকানা :
মোবাইল :
জাতীয় পরিচয়পত্র নং:

২য় পক্ষ : ভাড়াটিয়া
নাম : সাদীদ এন্টার প্রাইজ, মালিক দৌলত খান
পিতার নাম:
ঠিকানা :
মোবাইল :
জাতীয় পরিচয়পত্র নং:

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নিমিত্তে কার্যলয় ভাড়ার চুক্তিনামা:
অদ্য ৩০ মার্চ ২০২১ প্রথম পক্ষ, বাড়ীর মালিক, নাম : কাজী আবিদুর রহিম, পিতার নাম : মরহুম আশরাফুর রহিম, ঠিকানা :
জাতীয় পরিচয়পত্র নং: মোবাইল নং:
এবং দ্বিতীয় পক্ষ-ভাড়াটিয়া- নাম : সাদীদ এন্টার প্রাইজ, মালিক দৌলত খান, পিতার নাম:
ঠিকানা : মোবাইল : জাতীয় পরিচয়পত্র নং:
উভয়ে প্রথম পক্ষের অবস্থিত ও মালিকানায় ভোড় দখল এবং ব্যবস্থপনায় থাবকা ৫.২৫ শতাংশ সম্পত্তির বাড়ী নং: ৭৪৫, তিনতলা বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় মোট ১৬৫০ বর্গফুটের ২০ ফুট থেকে ৩০ ফুট = ৬০০ বর্গফুট, একরুমের রেডি কক্ষ মাসিক অর্থের বিনিময়ে নিমিত্তে ২য় পক্ষ ১ম পক্ষ ও দ্বিতীয় পক্ষ ৩ বছরের জন্য চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে।
অদ্য ৩০ মার্চ ২০২১ তারিখ স্বাক্ষীগনের সামনে উভয় পক্ষ নিন্মলিখিত শর্ত মেনে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
১। ভাড়ায়িত বাড়ির ঠিকানা:
২। ভাড়াকৃত অংশের পরিমাণ ৬০০ বর্গফুট । তিনতলা বাড়ীর দ্বিতীয় তলায়।
৩। কক্ষটি পাকা, একটি দরজা ও দুটি জানালা আছে। টাইলস করা একটি এটাচ বাথরুম ও একটি ছোট বারান্দা আছে।
৪। মাসিক ভাড়া ৮০০০ (আট হাজার) টাকা। ১ মাসের ভাড়া অগ্রিম প্রদত্ত হবে এতদসংক্রান্ত কারণে শেষমাসের ভাড়া প্রদেয় হবেনা। এবং ভাড়া প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে প্রদেয় হবে। চুক্তির মেয়াদের মধ্যে ভাড়া বাড়ানো হবে না।
৫। এই চুক্তিপত্র ৩ বছর মেয়াদের হবে। তবে উভয়পক্ষ একমত হলে একমাসের নোটিশে এই চুক্তি বাতিল করতে পারে। এবং ১ মাসে আগে বলে দিয়ে ভাড়াটে বাড়ি ছেড়ে যেতে পােের আবার ১ মাসে আগে বলে বাড়িওয়ালা ভাড়াচেকে উচ্ছেদ করতে পারে।
৬। অন্যান্য ইউটিলিটি বিল, গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল, পানি বিল ২য় পক্ষ বহণ করবে।
৭। এছাড়া প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ ২য় পক্ষের উপর বর্তাবে।
৮। ২য় পক্ষ উক্ত জমিতে কোনো রকম বেআইনি, অসামাজিক বা নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্যক্রম বা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন না। তথাপি যদি আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ কিছু করে থাকে সেজন্য ভাড়াটিয়ার পক্ষেই এর সকল দায়-দায়িত্ব বহন করবে।
১১। জরুরী প্রয়োজনে ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র বা অন্যকোন কারণে জমির দলিল বা অন্য কোন কাগজের কপি প্রয়োজন হয় তাহলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রাসঙ্গিক ব্যাপারে প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে সার্বিক সহযোগিতা করবেন।
১২। আপাতত ২য় পক্ষ ঘরটিতে যাবতীয় ডেকোরেশন করে নেবেন। তবে স্থাপনা যেমন দেয়াল, পিলার ও দরজা জানালার কোনো পরিবর্তন করতে পারবেন না।
১৩। পরবর্তীতে যদি প্রয়োজন হয় দ্বিতীয় পক্ষ ব্যবসা বৃদ্ধি করলে বা বৈধ ব্যবসার জন্য কাউকে অংশীদার নিলে তাতে প্রথম পক্ষের কোন আপত্তি থাকবেনা।
১৪। বাড়ীর মালিকানা ও অন্যান্য ব্যাপারে আইন গত অন্য কোন সমস্যা থাকলে এ ব্যাপারে ১ম পক্ষই দায়িত্বশীল বলিয়া বিবেচিত হবেন। তা কোনোভাবেই দ্বিতীয় পক্ষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত হবেনা। তবে ভাড়াটিয়ার প্রয়োজনে ইউটিলিটি বিলের কপি ও হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের রশিদ ভাড়াটিয়াকে প্রদান করবেন বাড়িওয়ালা।
১৬। দ্বিতীয় পক্ষ এর মূল নকশায় কোনো পরিবর্তন করতে পারবেন না।
১৭। এক বছরকাল সময়ের মধ্যে মূল স্থাপনায় প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে কোনরূপ ক্ষতি সাধিত হলে তা প্রথম পক্ষই মেরামত করিবেন।
১৮। ছয় মাসের মধ্যে প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে সরাতে চাইলে দ্বিতীয় পক্ষ যে পরিমান স্টাবলিশমেন্ট খরচ করবে তার ৫০% প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে প্রদান করবে । ১ বছরের মধ্যে প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে সরাতে চাইলে দ্বিতীয় পক্ষ যে পরিমান স্টাবলিশমেন্ট খরচ করবে তার ২০% প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে প্রদান করবে ।

আগামী ০১/০৪/২০২১ তারিখ হতে ৩ (তিন) বছর মেয়াদকাল শুরু হবে এবং তা আগামী ৩১/০৩/২০২৪ তারিখ পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।

তফসিল :

জেলা: ঢাকা, থানা: মোহাম্মদপুর, রূপনগর হাউজিং এস্টেটের ব্লক-সি-তে অবস্থিত কক্ষ নং-১০২, যার আয়তন ১৫০ বর্গফুট। উত্তরে: ফ্লাট নং-১০১, দক্ষিণে: ফ্লাট নং-১০৩, পূর্বে: রাস্তা, পশ্চিমে: ফ্লাট নং-১০৪ অবস্থিত।

চুক্তিপত্র:

জাহাঙ্গীর আলম শোভনের সৌজন্যে Shovonio.com থেকে ডাউনলোড ও সম্পাদনা করে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এই মর্মে প্রকাশ থাকে যে উভয় পক্ষ এবং স্বাক্ষীগন সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক। তারা স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে অন্যের বিনা প্ররোচনায় এই চুক্তিপত্রের সমুদয় শর্ত পড়ে বুঝে এই চুক্তিপত্রে অদ্য ৩০ মার্চ ২০২১ প্রথম পক্ষের বাড় তে বেলা ১০ ঘটিকার সময় স্বাক্ষর করেছেন।

স্বাক্ষরঃ
মালিক, ১ম পক্ষ:

ভাড়াটিয়া, ২য় পক্ষ:

স্বাক্ষীগণের নাম ও স্বাক্ষরঃ
১।
২।

বি দ্রঃ ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প এ ভাড়ার চুক্তিপত্র করতে হয়। সবচেয়ে ভাল হয় ৩০০ টাকার ২ সেট স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করা। এর মধ্যে একটি থাকবে প্রথম পক্ষের নিকট অন্যটি দ্বিতীয় পক্ষের নিকট।