হেটি গ্রীন কি পৃথিবীর সবচেয়ে কৃপণ নারী?
হেটি গ্রীনকে পৃথিবীর সবচেয়ে কৃপণ নারী হিসেবে তুলে ধরা হয়। আসলে কি তাই? আমরা এই লেখায় বিগত শতকে আমেরিকায় বসবাস করা এই ধনী ও কৃপণ নারী সম্পর্কে এই লেখায় জানতে পারব। তিনি তার মৃত্যুর পর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে “সবচেয়ে কৃপণ ব্যক্তি” হিসেবে স্থান পেয়েছেন। ১৮৩৫ সালে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া হেটি ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র কন্যা। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ লাভ করেন।
বিনিয়োগ কৌশল ও ধনসম্পদ
অসাধারণ বিনিয়োগ দক্ষতার কারণে তিনি ওয়াল স্ট্রিটে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন এবং তাকে ‘ওয়াল স্ট্রিটের জাদুকরী’ বলা হতো। তার সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২.৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। হেটি গ্রীনের মৃত্যুর সময় তার সম্পদ ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যা আজকের মানে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। তিনি ব্যবসার মাধ্যমে যে সম্পদ অর্কৃজন করেছেন কৃপণতার মাধ্যমে তা ধরে রেখেছেন বছরের পর বছর। তিনি ভোগ না করে সম্পদ বাড়াতেন। তাহলে কেন এত সম্পদের মালিক হওয়া সেটা তিনি ভাল বলতে পারবেন।
কৃপণতার গল্প
হেটি গ্রীন তার অস্বাভাবিক কৃপণতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি মুদি দোকানের অবশিষ্ট কেক এবং ভাঙা বিস্কুট খেয়ে দিন কাটাতেন। মাত্র দুই সেন্টের পাই খেয়েও বহুদিন কাটিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন কুকুরের জন্য দোকান থেকে একটি ফ্রি হাড় পাওয়ার জন্য ঝগড়া করতেন। এমনকি গরম পানি ব্যবহার করতেন না, কারণ এতে কয়লা নষ্ট হতো।
পোশাকের ক্ষেত্রে তার কার্পণ্য ছিল আরও চরম। তিনি একমাত্র কালো পোশাক পরতেন, যা পুরোনো না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তন করতেন না। অনেকেই তাকে ‘ব্ল্যাক উইচ’ বলে ডাকতেন। তিনি ১৬ বছর ধরে তার অন্তর্বাস সেলাই করে ব্যবহার করেছেন, যা তার মৃত্যুর পরও মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল।এর ছবি দেখলে বোঝা যায় যে এটিকে বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও ইন্টারনেটে পাওয়া অন্তবাসটি তার কিনা সেটা কেউ পরীক্ষা করেছে বলে জানা যায়নি।
অর্থলোভ
হেটি গ্রীনের চাচী সিলভিয়ার মৃত্যুর পর, তিনি চাচীর ২ মিলিয়ন ডলার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার দাবি করেন। তবে আদালতে উপস্থাপিত বিকল্প উইলটিকে জাল ঘোষণা করে তার দাবি বাতিল করা হয়।
১৯০৭ সালে নিউ ইয়র্কের আর্থিক সংকটের সময়, হেটি নগদ অর্থ ধরে রাখার পরিকল্পনা করেন, যাতে তিনি বিপদের সময় উচ্চ সুদে ধার দিতে পারেন। তার বিনিয়োগ কৌশল এবং ব্যবসায়িক মেধা তাকে আরও ধনী করে তুলেছিল।
চিকিৎসার জন্য কৃপণতা
হেটি গ্রীন তার ছেলে নেডের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও কৃপণতা দেখিয়েছিলেন। নেডের একটি পা ভেঙে গেলে, হেটি বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন, যার ফলে অবশেষে ছেলেটির পা কেটে ফেলতে হয়। তবে নেড পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমার মাকে বিদ্বেষপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মোটেই সত্য নয়।”
মৃত্যুর কারণ ও পরবর্তী প্রভাব
হেটি গ্রীন ১৯১৬ সালে নিউ ইয়র্কে ৮১ বছর বয়সে মারা যান। রটনা রয়েছে যে, মৃত্যুর কারণ ছিল গৃহকর্মীর সঙ্গে ঝগড়া, যিনি বেতন বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলেন। তাই নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। মৃত্যুর পর হেটি বিপুল সম্পদ রেখে যান, তবে তার সন্তানরা তার কৃপণতার উত্তরাধিকার বহন করেননি বরং, তার মেয়ে একটি বিনামূল্যে হাসপাতাল তৈরি করে সকল সম্পত্তি উইল করে হাসপাতাল ট্রাস্টিবোর্ডকে দিয়ে যান। তিনি নি:সন্তান ছিলেন। এমনকি ভাইয়ের সম্পত্তিরও তিনি মালিক হোন।
দর্শন ও পরিবারিক প্রভাব
হেটি গ্রীনের কঠোর জীবনধারা তার পারিবারিক মূল্যবোধ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমার পরিবারের পাঁচ প্রজন্ম ধনী ছিল, আমাদের অবস্থান প্রকাশের প্রয়োজন নেই। আমার পারিবারিক চর্চা আমাকে অপচয় থেকে দূরে রেখেছে।”
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
সূত্র: উইকিপিডিয়া, ইনভেস্টোপিডিয়া ও অন্যান্য

