ব্যাংক ছাড়াও বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী সংস্থা থেকে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ঋণ পাওয়া যায়। হয়তো আত্মীয় স্বজনের কাছে ঋণের জন্য দরখাস্ত দিতে হয় না কিন্তু কোনো সমিতি, অফিসের বস কিংবা চেয়ারম্যান ও এমপি থেকে ঋণ নিতে একটি লিখিত আবেদনপত্র দরকার হতে পারে।
নিচে ঋণ সংক্রান্ত তিনটি ভিন্ন প্রসঙ্গে আবেদনপত্রের নমুনা দেওয়া হলো। প্রতিটি আবেদনপত্রই একটি ছোট গল্পের মতো করে সাজানো হয়েছে, যাতে আবেদনকারীর জীবনসংগ্রাম, প্রয়োজনের গভীরতা এবং মানবিক অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
১) এলাকার সমিতির কাছে ঋণ চেয়ে আবেদন
তারিখ: ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রতি,
সভাপতি মহোদয়
উত্তরা সমবায় সমিতি লিমিটেড
বাড়ি # ৫০, রোড # ১০, সেক্টর # ০৭
উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
বিষয়: পুত্রের চিকিৎসা ও সংসার নির্বাহের জন্য জরুরি ঋণের আবেদন
জনাব সভাপতি,
আমার নাম মোঃ আবুল কালাম, বয়স ৫৮, পিতা: মৃত হাশেম আলী। আমি গত ১৫ বছর ধরে উত্তরার ৭ নং সেক্টরের বাসিন্দা এবং আপনাদের সমিতির একজন নিয়মিত সদস্য (সদস্য নং: UT-১২৩৪৫)। আজ আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এবং বাধ্য হয়ে আপনাদের দ্বারস্থ হয়েছি।
আমার জীবনের গল্পটা একটু শোনার অনুরোধ করছি। আমি পেশায় একজন রিকশাচালক। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে যা আয় করি, তাতে সংসারের পাঁচজন মানুষের (আমি, আমার স্ত্রী, বড় ছেলে, ছোট ছেলে ও মেয়ে) দুই বেলা খাবার জোগানোই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বড় ছেলে রানা একটি গার্মেন্টসে কাজ করে, কিন্তু লকডাউনের পর তার চাকরিটা চলে গেছে। এখন সে আমার সাথেই রিকশা চালায় মাঝে মাঝে।
কিন্তু গত মাসে আমাদের পরিবারে এক বড় বিপদ নেমে আসে। আমার ছোট ছেলে সাগর (১৬ বছর) হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ জ্বর, কিন্তু কয়েকদিন পর তার অবস্থার এতটাই অবনতি হয় যে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ডাক্তার জানিয়েছেন, তার হার্টের ভালভে সমস্যা হয়েছে এবং অস্ত্রোপচার জরুরি। অস্ত্রোপচারের খরচ অন্তত ৩ লক্ষ টাকা।
আমার যা কিছু সঞ্চয় ছিল, সব হাসপাতালের টেস্ট ও ওষুধ পেছনে শেষ হয়ে গেছে। সমিতিতে আমার ৫০০ টাকা করে জমা ছিল, কিন্তু তা তো এক ফোঁটা পানি সমান। আমি আর কোন পথ না পেয়ে আপনার কাছে হাত পাতছি। আমি জানি, আমাদের সমিতি কঠিন সময়ে সদস্যদের পাশে দাঁড়ায়।
আমি সমিতি থেকে ১ লক্ষ টাকা জরুরি ঋণ চাই। এই টাকা আমি ফিরিয়ে দেব—এক পয়সাও বাকি রাখব না। আমার রিকশাটি আছে, সেটা বন্ধক রেখে হলেও আমি টাকা পরিশোধ করব। প্রতি সপ্তাহে আমার আয় থেকে ৫০০ টাকা করে পরিশোধ করতে পারব বলে আশা করছি। আমার ছেলের বেঁচে থাকার স্বপ্নটা আপনার হাতে।
আমি সারা জীবন সৎ পথে থেকে সংসার চালিয়েছি। কারো কাছে হাত পাতিনি। আজ অসহায় বাবার মতো আপনার কাছে এসেছি। এই ঋণ আমার ছেলের জন্য নতুন জীবন নিয়ে আসবে। আমার আবেদনটি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করুন।
বিনীত নিবেদন,
[স্বাক্ষর]
মোঃ আবুল কালাম
সদস্য নং: UT-১২৩৪৫
ঠিকানা: বাসা # ২৩, রোড # ০৫, সেক্টর # ০৭, উত্তরা, ঢাকা
মোবাইল: ০১৭১১-২২৩৩৪৪
২) নিয়োগ কর্তা বা মালিকের কাছে ঋণ চেয়ে আবেদন
তারিখ: ১৫ মার্চ, ২০২৬
প্রতি,
সম্মানিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মেসার্স রহিম অ্যান্ড সন্স লিমিটেড
৯৮, নবাবপুর রোড, পুরান ঢাকা-১১০০
বিষয়: জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে অগ্রিম বেতন ও ব্যক্তিগত ঋণের আবেদন
জনাব এমডি স্যার,
আমি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, গত ১২ বছর ধরে আপনাদের কোম্পানির ডেলিভারি বিভাগে চালক হিসেবে কর্মরত আছি (কর্মী আইডি: RS-২০০৪-৭৮৯)। এই দীর্ঘ সময়ে আপনি ও কোম্পানি আমাকে পরিবারের একজন সদস্যের মতোই দেখে এসেছেন। সেজন্য আজ আমার এই বিপদের দিনে আপনার কাছেই সাহায্য চাইতে এলাম।
স্যার, আমার জীবনটা খুব একটা সুখের ছিল না। ছোটবেলায় বাবা মারা যান, মা অন্যের বাড়ি কাজ করে আমাকে মানুষ করেছেন। সংসারের অভাব এতটাই ছিল যে, লেখাপড়া বেশি দূর করতে পারিনি। কিন্তু চাকরিটা পাওয়ার পর থেকে সংসারের চাকা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আমার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ছোট্ট সংসার। মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখি, ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখি।
কিন্তু গত ২০ দিন ধরে আমাদের পরিবারে একের পর এক বিপদ নেমে এসেছে। প্রথমে আমার স্ত্রী টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার চিকিৎসা চলছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এর মাঝেই আমার বড় মেয়ে সুমির বিয়ের পাকা কথা ছিল। বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর আগে মেয়েকে কিছু কাপড়চোপড় ও গহনার ব্যবস্থা করতে হবে—তা তো দূরের কথা, তার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসাই আমাদের শেষ করে দিয়েছে।
স্যার, আরও একটি কথা না বললেই নয়। গত সপ্তাহে আমার পুরনো বাসার মালিক হঠাৎ করে বাসা খালি করতে বলেছেন। এখন নতুন বাসা ভাড়া নিতে গেলে ২ মাস的超前置 ও ভাড়া বাবদ আরও ৪০ হাজার টাকা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে আমি এখন একেবারে নিঃস্ব।
আমি স্যার, আপনার কাছে ১ লক্ষ টাকা ঋণ চাই। এই টাকা আমি চাকরি থেকে মাসে মাসে কেটে নেওয়ার অনুরোধ জানাই। প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা করে কেটে নিলে ২০ মাসে আমার ঋণ শোধ হয়ে যাবে। আমি এই প্রতিষ্ঠানে ১২ বছর ধরে কোনো ঝামেলা না করে কাজ করেছি। ভবিষ্যতেও করব। শুধু আমার পরিবারটাকে বাঁচাতে আজ আপনার দরবারে হাত পাতলাম।
আপনি একবার সাহায্যের হাত বাড়ালে আমি এবং আমার পরিবার চিরদিন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আমার আবেদনটি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করুন।
আপনার বিনীত সেবক,
[স্বাক্ষর]
মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
পদবি: চালক (ডেলিভারি বিভাগ)
কর্মী আইডি: RS-২০০৪-৭৮৯
ঠিকানা: ৫৬/এ, বংশাল, পুরান ঢাকা
মোবাইল: ০১৮১৮-৫৫৬৬৭৭
৩) দাতা সংস্থার কাছে বিনাসূদে ঋণ চেয়ে আবেদন
তারিখ: ২০ এপ্রিল, ২০২৬
প্রতি,
প্রোগ্রাম অফিসার
আশার আলো মানবকল্যাণ ফাউন্ডেশন
হাউস # ৪৫, রোড # ১২, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৯
বিষয়: স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বিনাসূদে ঋণের আবেদন ও একটি সংগ্রামী নারীর জীবনগল্প
জনাব প্রোগ্রাম অফিসার,
আমার নাম মোসাম্মৎ শাহিদা বেগম, বয়স ৩৪, স্বামী: মৃত আব্দুল মতিন। আমি কেরানীগঞ্জের বালুঘাট এলাকার ১২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। আপনাদের সংস্থার নাম শুনেছি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তাই আমার জীবনের গল্পটা আপনাকে বলতে চাই এবং কিছু সাহায্য চাইতে চাই।
আমার বিয়ে হয়েছিল ১২ বছর আগে। স্বামী মতিন ছিলেন একজন দিনমজুর। দুজন মিলে কোনোমতে সংসার চালাতাম। আল্লাহ আমাদের একটি ছেলে সন্তান দিয়েছিলেন—রবিন। কিন্তু সুখ বেশি দিন টেকেনি। তিন বছর আগে স্বামী মতিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আমি তখন একেবারে নিঃস্ব।
স্বামীর সংসারে কোন জমিজমা ছিল না। ছিল শুধু একটি টিনের ঘর, যার চাল আজও হেলে পড়েছে। আমি আর রবিন (এখন ৯ বছর বয়সী) কোনোমতে দিন কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু বাঁচতে হলে তো লড়াই করতে হয়। প্রথমে অন্যের বাড়ি কাজ করতাম, কিন্তু তাতে পেট চলে না।
দুই বছর আগে আমি একটি সেলাই মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নিই। এক আত্মীয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে এবং নিজের সঞ্চয় মিলিয়ে ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরনো সেলাই মেশিন কিনি। সেই মেশিন দিয়েই শুরু হয় আমার নতুন জীবন। প্রথমে প্রতিবেশীদের কাপড় সেলাই করে দিতাম, তারপর এলাকার একটি ছোট দোকানের সাথে চুক্তি করি তাদের কাপড় সেলাই করার।
এখন আমার আয় মাসে ৪-৫ হাজার টাকার মতো হয়। রবিনকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু এখন যে সমস্যাটা হচ্ছে, আমার সেলাই মেশিনটি পুরনো হয়ে প্রায়ই নষ্ট হয়। মেরামত করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়। একটি নতুন ভালো মেশিন কিনতে পারলে আমি আরও বেশি কাজ নিতে পারব। এলাকায় এখন পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। একটি নতুন মেশিনের দাম প্রায় ১৫ হাজার টাকা।
এছাড়া রবিনের স্কুলের বেতান ও বইয়ের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আমি যদি ২০ হাজার টাকার মতো ঋণ পাই—১৫ হাজারে একটি নতুন সেলাই মেশিন কিনব, আর ৫ হাজার টাকা দিয়ে ছেলের লেখাপড়ার খরচ ও ঘরের কিছু মেরামত করব।
আমি জানি, আপনারা বিনাসূদে ঋণ দেন। এই টাকা আমি ফিরিয়ে দেব। আমার সেলাইয়ের কাজ থেকেই প্রতি মাসে কিছু টাকা জমিয়ে আপনাদের অফিসে গিয়ে পরিশোধ করব। আমার হাত দুটো এখনো শক্ত, কাজ করতে পারি। শুধু একটু সাহায্য চাই—একটা হাত বাড়িয়ে ধরার মতো। আমার ছেলেটাকে মানুষ করতে চাই, ওকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় মানুষ করতে চাই।
আমার আবেদনটি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করুন। আপনি যদি আমার পাশে দাঁড়ান, আমি আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাব না।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাসহ,
[স্বাক্ষর]
মোসাম্মৎ শাহিদা বেগম
স্বামী: মৃত আব্দুল মতিন
গ্রাম: বালুঘাট, ওয়ার্ড নং: ১২
ইউনিয়ন: শুভাঢ্যা, থানা: কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
মোবাইল: ০১৯৯৯-১১২২৩৩
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ৮৫৭৪ ৩২৬৫ ১২৩৪ (কাল্পনিক)

