ই-কমার্স যাত্রা ২০২০
করোনাকালীন সময়ে (২০২০-২০২১) বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসার লাভ করে। লকডাউনের কারণে যখন সাধারণ মানুষ ঘরবন্দি ছিল, তখন অনলাইন কেনাকাটা ও ডিজিটাল পেমেন্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিম্নরূপ—
সার্বিক বাজার
করোনা শুরুর আগে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত মূলত ফ্যাশন ও ইলেকট্রনিকস পণ্য কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু মহামারির সময় গ্রোসারি, ফার্মাসিউটিক্যালস, ও জরুরি পণ্য বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। দারাজ, চালডাল, ও ফুড পান্ডা মার্টের মতো প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মুলেপ (মুঠোফোন লেনদেন পদ্ধতি) যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট ই-কমার্সে লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। ক্যাশ অন ডেলিভারির বদলে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের হার বাড়ে। ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা ২০২১ প্রণয়ন করা হয়, যাতে অনলাইন লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। ই-ক্যাব (e-CAB) এবং সরকারের সমন্বয়ে ডিজিটাল হাট চালু করা হয়, যা কোরবানির পশুর অনলাইন কেনাবেচার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে অর্ডার নেওয়ার পর ডেলিভারি না দেওয়া এবং প্রতারণার ঘটনা ঘটে, যা ই-কমার্স খাতের প্রতি মানুষের আস্থায় চিড় ধরায়। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) ফেসবুক বিজনেস, ওয়েবসাইট, ও মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন। লাইভ কমার্স (লাইভে পণ্য বিক্রি করা) নতুন ট্রেন্ড হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল ডেলিভারী সার্ভিস ও বাংলাদেশের বর্তমান অনলাইন পণ্য ডেলিভারী সেবা
নতুন অনেক ই-কমার্স ভিত্তিক পণ্য ডেলিভারী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডেলিভারী সেবায় যুক্ত হয়েছে। ঢাকার বাইরে অনেকে হোম ডেলিভারী সেবার পরিধি বাড়িয়েছে। ডেলিভারী সেবায় অনেকে অটোমোশন এনেছেন। এখানে সম্পূর্ণ অপারেশন প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্ভব। মনিটরিং, ট্র্যাকিং এবং কনফার্মেশন সবই ডিজিটাল পদ্ধতি করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। অনলাইন বুকিং এর পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্টও করা যায় ডেলিভারী সেবার বিপরীতে। ই-কমার্স সেক্টরে বর্তমানে প্রতিদিন ১ লক্ষ মানুষকে এই সেবা দেয়া হচ্ছে। ডেলিভারী সেবার পরিধি বৃদ্ধি পেয়ে চাল, ডাল তৈরী খাবার থেকে শুরু করে কুরবানির পশু পর্যন্ত ডেলিভারী দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে যা সহজে করা সম্ভব হয়েছে। রেস্টুরেন্ট রান্না করা খাবার, বাসায় রান্না করা খাবার, ক্যাটারিং সার্ভিসের খাবার সময় মোবাইল এ্যাপের মাধ্যমে বুকিং, পেমেন্ট এবং ডেলিভারী সম্পন্ন হয়।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
ই-কমার্স ভিত্তিক ডেলিভারী সার্ভিসগুলো মূলত বিটুবি পর্যায়ে সেবা দিয়ে থাকে। MSME দের সাথে এসব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সংযোগ ঘটাতে ফেসবুক একটা ভূমিকা পালন করছে। এখানে ই-কমার্স ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতে তারা একে অপরকে খুঁজে পান। এছাড়া অফিসিয়ালী ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে। যেমন ট্রেনিং, মেলা ও অভিযোগের সমাধান।
গ্রামীণ পর্যায়ে সেবা দিতে তারা কখনো কখনো প্রথাগত কুরিয়ার কোম্পানী ও পোস্ট অফিসের সাহায্য নিয়ে থাকেন। লজিস্টিক সেবাদাত প্রতিষ্ঠানকে সদস্যপদ দেয়ার মাধ্যমে ই-ক্যাব তাদেরকে নজরে রাখে ও পরামর্শ দিয়ে থাকে। ফলে গত কয়েকবছরে এ খাতে সেবার মানের উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে কোভিড এর কারণে কর্মীসংকটে মানসম্পন্ন সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে তৃতীয় পক্ষের পাশাপাশি নিজেরাও ডেলিভারী টিম তৈরী করেছেন।
ডিজিটাল চ্যালেঞ্জগুলোর সমন্বয়
এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। সবসময় এটা হয়ে আসছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং ক্লায়েন্টদের চাহিদার কারণে তারা এটা করে চলেছে। যেমন, ফেক কাস্টমারের কারণে ডেলিভারী ম্যানেরা নানাভাবে বিপদে পড়েন এব্যাপারে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এছাড়া ক্রেতারা তাদের পন্যের আপডেট জানতে চায় এজন্য ট্রাকিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ্যাপভিত্তিক ডেলিভারী সেবার ক্ষেত্রে রিভিউ’র সুযোগ রয়েছে। কিছু কিছু ডেলিভারী সার্ভিস সিস্টেম ই-কমার্স সাইটের সাথে ইন্ট্রিগেট করা যায়। যাতে অর্ডারের মেসেজ ডেলিভারী কোম্পানীর কাছে চলে যায়। এভাবে প্রতিনিয়ত এসেবায় নতুন নতুন আইডিয়া যুক্ত হচ্ছে।
ই-ক্যাবের ভূমিকা
ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ২০১৪ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে বাংলাদেশের ই-কমার্সের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। হাজার হাজার তরুন উদ্যোক্তার প্রশিক্ষন, সরকারের সাথে সহযোগী হিসেবে আইসিটি পলিসি বাস্তবায়নে ভূমিকা ও ডিজিটাল কমার্স পলিসি তৈরীতে সহযোগিতামূলক ভূমিকা রেখেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি ডিভিশন, এটুআই, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনসহ সরকারী বিভিন্ন সংস্থার সাথে যৌথভাবে ই-বাণিজ্যের উন্নয়নে কাজ করছে।
আন্তজাতিক সংস্থার মধ্যে আইসিটি, এফএনএফ, শী ট্রেডস এর মতো সংস্থার সাথেও যৌথভাবে কাজ করেছে ই-ক্যাব।
বিগত করোনাকালীন সময়ে ই-ক্যাব চালু করে মেম্বার রেজিস্ট্রেশন ও হেলথ সেন্টারসহ নানাবিধ অনলাইন সেবা। ই-ক্যাবের স্টিকার নিয়ে সদস্য প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজার গাড়ি সারাদেশে সাপ্লাইচেইন সচল রেখেছে। নিত্যপণ্য সরবরাহ তদারকীর মাধ্যমে ই-ক্যাব ডিজিটাল অর্থনীতির চাকাকে করেছে অধিকতর গতিশীল। ডিজিটাল হাটের মাধ্যেমে কোরবানি পশু বিক্রি, আমমেলার মাধ্যমে বাগান থেকে সংগ্রহ করা ক্যামিকেমুক্ত আম বাসায় ডেলিভারী, লকডাউন এলাকায় ঘরে ঘরে নিত্যপণ্য সরবরাহ, মানবসেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজারো দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, অনলাইনে টিসিবি’র পণ্য বিক্রির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা এবং ইজিনিয়াস উদ্যোগের মাধ্যমে স্কুল শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশে সহশিক্ষা কার্যক্রমে গ্রহণ করেছে।
মোটকথা, করোনাকালীন সময়ে ই-কমার্স ব্যবসার প্রসার ও ভোক্তাদের অনলাইন কেনাকাটার প্রতি নির্ভরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশে ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।
তবে কিছু কার্যক্রম যেমন এই খাতকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে এবং সময়মতো কিছু উদ্যোগ না থাকায় কাংখিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। এই বিষয়ে অন্য লেখায় আলোকপাত করা হবে।
– লেখা জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি: পিক্সাবে

