Vote, Politics, Political Rights

৭২ এর সংবিধানের নৈতিক দূর্বলতা

৭২ এর সংবিধানের নৈতিক দূর্বলতা

১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধান ছিল স্বাধীন দেশের প্রথম মৌলিক আইন, যা গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংবিধানে কিছু ত্রুটি ও দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।

খসড়া সংবিধানে বিতর্কিত বিষয়গুলো যেমন: রাষ্ট্রের ধর্ম ও জাতিগত সংবেদনশীলতা, ফ্লোর ক্রসিং, সম্পদ ও উৎপাদন পদ্ধতির যৌথ মালিকানা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির সীমা, নারীদের সংরক্ষিত আসন না থাকা, মৌলিক অধিকার প্রয়োগের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকা, তফসিলি সম্প্রদায় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাধান্য, রাষ্ট্র বা প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা— এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা ও দ্বিমত গণপরিষদে তোলা হলেও প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে কোনো সংশোধন হয়নি।

সমালোচকেরা বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নিজের ক্ষমতাকে রাষ্ট্রপতির তুলনায় একচ্ছত্র করে নিয়েছিলেন। ফলে রাষ্ট্রপতি কার্যত ক্ষমতাহীন ‘শিখণ্ডী’ অবস্থায় পরিণত হন। পাকিস্তান আমলের দমনমূলক আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রেখে দেওয়া হয়, যা সংবিধানের জনবিরুদ্ধতা বৃদ্ধি করে। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকায় একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত হয়।

সংবিধান প্রণয়নে মূলভাবে রাজনৈতিক এলিটরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। তবে অন্যান্য সমালোচনার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, গণপরিষদ এবং খসড়া সংবিধান প্রণয়নের বিতর্ক যথেষ্ট পরিসরে হয়েছে। সাধারণ জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ সীমিত হলেও এটি তখনকার বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কার্যকর প্রক্রিয়া ছিল।

সংবিধান প্রণয়নের বৈধতা ও গণপ্রতিনিধিত্বের অভাব

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত গণপরিষদে ৪৩০ জন সদস্য ছিলেন, যাদের মধ্যে ৪০৩ জন আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। এছাড়া, গণপরিষদের সদস্যরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য তাদের কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছিল না। এই কারণে সংবিধানের প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংবিধান প্রণয়নের সময় জনগণের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে এটি প্রণীত হয়নি।  ১৯৭০ সালের নির্বাচন কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের সংসদ নির্বাচনের বিজয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার বৈধ ভিত্তি নয় সংবিধান সভা নির্বাচিত বা পুনর্গঠিত হয়নি; স্বঘোষিতভাবে সংবিধান প্রণেতারা সংবিধান তৈরি করেছেন। ফলে এটি জনগণের সংবিধান হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল (আওয়ামী লীগ)-এর সংবিধান হিসেবে তৈরি হয়েছে।

সংবিধান প্রণয়নের জন্য কোনো জাতীয় রেফারেন্ডাম হয়নি। জনগণের সম্মতি বা বৈধায়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুপস্থিত। এ কারণে সংবিধান প্রণয়নের জনসমর্থন ও গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ।

সংবিধান প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ অসম্পূর্ণ ছিল। সংখ্যালঘু ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা সীমিতভাবে অবদান রাখতে পেরেছেন। সংবিধান প্রণেতাদের অধিকাংশ প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মতামত গ্রহণ করা হয়নি, ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিতর্কিত রয়ে গেছে।

রাষ্ট্রের ধর্ম নির্ধারণ ও ধর্মনিরপেক্ষতার অভাব

১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের ধর্ম নির্ধারণ করা হয়নি, যা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে দুর্বল করেছে। এছাড়া, সংবিধানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, যা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। বরং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জায়গায় বাঙালী জাতীয়বাদের মাধ্যমে এর পরিধিকে ছোট করা হয়েছে এবং পাহাড়ী অবাঙালী জনগোষ্ঠিকে অস্বীকার করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা

সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রতীকী হয়ে পড়েছে। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। পরে নানারকম সংশোধনী আসার পরও কৌশলগত ক্ষমতা কিন্তু রয়ে যায়।

এখানে ৭৪ সালে যেহেতু সকল দল ও মত নিষিদ্ধ করে এক দলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছে। এবং সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা হয়েছে। সূতরাং ৭৫ এর পর যারা নতুন সংবিধান না করে ৭২ এর সংবিধান ফিরিয়ে এনেছে তাদেরও দায় রয়েছে।

মৌলিক অধিকার ও আইনি বাধ্যবাধকতার অভাব

১৯৭২ সালের সংবিধানে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলস্বরূপ, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সংবিধানের সাথে বৃটিশ ও পাকিস্তানী আইনের কোনো সংঘর্ষ তৈরী হয়নি। যা নির্দেশ করে যে, এই সংবিধান নতুন কোনো দিশা দিতে পারেনি।

১৯৭২ সালের সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মৌলিক আইন হলেও, এর কিছু ত্রুটি ও দুর্বলতা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এই ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে সংবিধানের সংস্কার ও আধুনিকীকরণ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, যাতে এটি দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

সংবিধান মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করলেও তাদের প্রয়োগের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট করা হয়নি। জনগণের খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, নারী-পুরুষ সমতা, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা রাখেনি। ফলে সংবিধান বাস্তবে জনগণের স্বার্থ সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিল।

সংসদ সদস্যদের বাকস্বাধীনতা হরণ (৭০ অনুচ্ছেদ)

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা দলের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারতেন না, এমনকি বিল বা নীতিমালার ক্ষেত্রে। এই বিধান ভোটারদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্যদের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলে।ফলে সংসদ কার্যত দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, যা একনায়কতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে হাফেজ হাবীবুর রহমান উল্লেখ করেছেন, গণতান্ত্রিক দেশের সংসদে এরকম বিধান নেই; সদস্যদের মূল দায়বদ্ধতা থাকা উচিত ভোটারদের কাছে, দল নয়।

সংসদ সদস্যদের দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ৭০ অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হলেও এটি দলের নেতাদের একনায়কত্বকে প্রাধান্য দিয়েছে। সদস্যরা ভোটারদের প্রতি দায়বদ্ধ না থেকে দল ও নেতার প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এই বিধান রাজনৈতিক পারদর্শিতা, স্বতন্ত্র মতপ্রকাশ এবং সংবিধানের আদর্শের বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

পাকিস্তানি শাসন কাঠামোর প্রভাব

১৯৭২ সালের সংবিধান পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক শাসনের পূর্ববর্তী কাঠামোর উপর আংশিক নির্ভর করেছে বলে সমালোচনা হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও ছয় দফার ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাস্তবতায়, এটি ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় গণতন্ত্রকে আত্মস্থ করার চেষ্টা ছিল, পাকিস্তানি শাসন অনুকরণের উদ্দেশ্য নয়।

সংবিধান সংশোধন ও ক্ষমতার ভারসাম্য সমস্যা

সংবিধানে সংরক্ষিত ছিল দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা:১) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তনের অধিকার। ২) অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখলের পর নতুন সংসদ ডেকে সবকিছু বৈধকরণের provision।এটি সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতা বা দলকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয় এবং সংবিধানের মূল নীতিতে অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের সুযোগ রাখে।  একটি রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশে সাংবিধানিক আদালত ও ন্যায়পাল থাকতে পারতো। কিন্তু সেটি রাখা হয়নি।

. নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংহতির সীমাবদ্ধতা

সংবিধান প্রণয়নের সময় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিরোধী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অসম্পূর্ণ ছিল। বহু বিতর্কিত বিষয় (ধর্মনিরপেক্ষতা, নারী অধিকার, সম্পদ ও মালিকানার সীমা) সমাধান করা হয়নি। এতে সংবিধান কার্যত রাজনৈতিক একদলীয় আধিপত্য বা নেতা-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার প্রতি ঝোঁক তৈরি করেছে।

মৌলিক ক্রটিসম ও সমস্যাগুলো ছিল জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের অভাব। বৈধ রেফারেন্ডাম বা সম্মতিমূলক প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মতামতের সীমিত গ্রহণ।ক্ষমতার একচেটিয়া কেন্দ্রায়ন ও সংশোধন প্রক্রিয়ায় নেতৃবৃন্দের অতিরিক্ত সুবিধা। এলিট প্রেফারেন্স ও গণতান্ত্রিক সমতার সীমাবদ্ধতা।