আমার রাতজাগা পাখি
পর্ব: ১
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ও ঘুমুতে চায়না। ঘুমুতে চায়নাতো ঘুমুতে চায়ইনা। দুপুরে ঘন্টা দুয়েক ঘুমায়। সকালে ৭টায় উঠে। রাতের ১২টা এমনকি একটায়ও ঘুমুতে চায়না। খেলতে পছন্দ করে। আমার মেয়ে পুতলী। নামটা ও দিদার দেয়া। ওর মায়ের দেয়া নাম জেসিকা জেসি। জেসি বলেই ডাকে। আমি ডাকি রাতজাগা পাখি। আমার রাখাও একটা নাম আছে। কাউকে কোনোদিন বলিনি। আর বলতে চাইওনা। আমার পছন্দের কোনো নাম আছে কিনা আমার মেয়ের জন্য সেটা আমাকে কেউ কখনো জিজ্ঞেসই করেনি। আমিও মেনে নিয়েছি। মেয়ের জন্ম হয়েছে মাতুলালয়ে। আমার বাড়ীতে অযত্ন হবে শাশুড়ির সে আশংকায় আমার স্ত্রী বেবী জন্মের ৮ মাস আগে থেকে জন্মের এক বছর পরেও বাপের বাড়ীতেই ছিলেন। যত্ন্আত্তি ঠিকই হয়েছে। তাই আর আগ বাড়িয়ে বলতেও যাইনি। বলতে যাইনি যে, আমিও একটা নাম ভেবেছিলাম। যারা এতো করেছে তাদের অধিকার থাকবে এটাতো স্বাভাবিক। এর মধ্যে যতটা অধিকার আমার স্ত্রী কিংবা তার মায়ের তার চেয়ে বেশী অধিকার আমার স্ত্রীর বড় বোনের। সে সূত্রে তিনি আমারো মাননীয়া।
একবছর হলো মেয়ে আমার বাড়ীতে আছে। মানে লাগাতার নয়। আসা যাওয়া আছে। নানু বাড়ি থেকে দাদু বাড়ী, দাদু বাড়ী থেকে নানু বাড়ী। সারাদিন দাদা ও দিদার সাথে থাকে তার আনন্দের আর কোনো শেষে নেই। দাদার কাঁধের উপর চড়া, দাদাকে কামড়ানো আরো কতো খুনসুটি দাদা নাতীনের। বয়স বছর তিন পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছুদিন বাড়ীর বাইরে ছিলো। তখন সেটা আমার কর্মস্থল ছিলো একটা মফস্বল শহরে। তখনি অভ্যাসটা হয়ে যায় বাবাকে ছেড়ে দূরে থাকার। অফিস শেষে আমার বাসায় ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেত। মার্কেটিং কোম্পানীতে চাকরী। সাতটি টেরিটোরি নিয়ে একটি জোন দেখতে হতো। জোনের সবার রিপোর্ট দেখে কার কি সমস্যা শুনে সমাধান দিয়ে তারপর বাসায় ফেরা। আমরা মেয়ে বাবুজীর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। চোখের পাতায় রাজ্যের ঘুম নেমে আসলেও ঘুমাতে চাইতোনা। তার বাবুজি আসলে খাবে, খেলবে তারপর ঘুমাবে। ফোনে কথা হতো। ফোন দিলে মা ধরার আগেই মেয়ে ধরে ফেলতে।
-বাবুজি তুমি কখন আসবে? আমি ঘুমাচ্ছিনাতো।
-হাঁ মামনি একটু পরেই আসবো। তুমি খেয়ে নাও মা।
-তুমি খাবে না বাবুজি। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি তো
– না মা, লক্ষী মা আমার অপেক্ষা করতে হবে না। তুমি খেয়ে নাও।
– না আমি খাবো না। আমি ঘুমুবোনা। আমি খেলবেনা। আমি কিচ্চু করবো না, না।
– না পাখি রাগ করে না মা। বাবুজি এখনি এসে পড়বো। আর অল্প কিছু সময়। তারপর আমরা খেলবো। তুমি খেয়ে নাও। আজ আমরা নতুন খেলনা দিয়ে খেলবো।
– ও নতুন খেলনা। তাহলে পুরনো খেলনা কি কি মরিয়মের মাকে দিয়ে দেব?
– সে পরে দেখা যাবে বাবা। এখন রাখি। লক্ষী মেয়ের মত খেয়ে নাও।
আমার মনটা ঘরে পড়ে থাকতো আর দেহটা বাইরে। উপায় নেই। মার্কেটিং এর চাকরী বেশী বেচতে পারলে কিছু উপরি কামাই হবে। টার্গেট ফিল করতে পারলে বেতন বাড়বে, কমিশন পাবো। আরো বেশী বেচলে আরো বেশী কমিশন। একটুখানি বেশী খাটলেতো ভালো। তাছাড়া মেয়ের টান আছে কিন্তু স্ত্রীরতো শুধু হা-হুতাশ।
তিনি অনেক বড় ঘরের মেয়ে। ভুল করে তার মরহুম পিতা কি না, নাবুঝে নাশুনে আমার সাথে তার বিয়ে দিয়েছেন। তার জীবনটা শেষ হয়ে গেল। তার ঠ্যাং এর উপর ঠ্যাং তুলে খাওয়ার কথা ছিলো এখন দাসীগিরি করে খেতে হয়। দাসীগিরি মানে নিজে রান্না করে খেতে হয়। দুপুরে আমি বাইরে খাই। বেশীরভাগ সময় সকালেও শুধু রাতে একবেলা খাই।
সেই ক্লাস এইট থেকে নিজের কাপড় ছোপড় নিজে ধুয়ে অভ্যাস সেটা এখনো আছে। সেটার সাথে অন্যদেরটা ধুয়ে দিই। তিনি চাকরী করতে চেয়েছেন, নিষেধ করিনি। শুধু বলেছি তোমার পোষালে তুমি করো। কিন্তু এই মফস্বল শহরে যে বেতন এই বেতনে সারাদিন বাইরে পড়ে থেকে অল্প ক’টা টাকার জন্য নিজের সন্তানকে কাজের মেয়ের কাছে রেখে যাওয়া আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি। হয়তো সেও তাই বুঝতে পেরেছে। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত ছাপিয়ে দিইনি কখনো। আশাপাশের লোকেরা বলে এটাই আমার অপরাধ।
যুদ্ধ আর কম করলাম না। মেয়ের বয়স ৫ হয়ে গেছে। তখন একদিন গিন্নি রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেলেন। কার ভালো লাগে সব সময় এক বচন। বহুবার বলেছি। দেখ, আমি গরিব মানুষ। আমার কিছুই নেই। বাবা কষ্ট করে একটা বাড়ি করেছেন। সেখানে সবাই মিলে এখন থাকি। প্রাইভেট চাকরী, আমাকে এটা করে খেতে হবে। সরকারী চাকরীর বয়স নেই। এতে খেটে খুটে উন্নতি যা করা যায় তাই ভরসা। যুদ্ধটা আমার, তুমি একটু পাশে থাকো। সংসারটা সামলাও, বাকীটা আমি দেখছি। না তিনি তার জীবন নষ্ট করেছেন, এখন মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চান না। প্রতিদিন লোকেরা লেকের পাড়ে ফুসকা খেতে যায় কেবল আমার জন্য সপ্তাহের শেষ দিন পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। মৌসুমে লোকেরা সাজেক, সেন্টমার্টিন ঘুরতে যায় কেবল আমি একটার বেশী দুইটা ট্যূরের সময় পাইনা। মানুষ প্রতিবছর বিদেশ ঘুরতে যায়। আমারতো বাসে করে শিলিগুড়ি যাওয়ার ক্ষমতাও নাই। তাই তিনি বাপের বাড়ি গিয়ে উঠেছেন। মেয়ে মানুষ করার জন্য। এখানে থাকলে যেমন অর্থ আমার সেখানেও তাই। পার্থক্যটা কি জানি না। ফলে দুজনের দূরত্ব বেড়ে যায়। মাইলের মাপে এবং মনের মাপেও।
শেষদিনের কথাবার্তা ছিলো এইরকম
- তুমি কি সিদ্ধান্ত নিলে শুনি।
- ওকে স্কুলে ভর্তি করে দাও। আমি কাছের একটা শহরে চলে আসবো বদলি হয়ে তখন সপ্তাহে এক দুইবার বাড়ি আসবো। নিজের ঘরে থাকলে ঘরভাড়াটা বাঁচবে। সেটা জমিয়ে রেখো। ২/৩ বছরে মাসে ৫/৭ হাজার টাকা জমালে যা টাকা হবে। তাতে হয়তো কিছু একটা করা যাবে।
- এই তোমার বুদ্ধি। মানুষ ছেলেমেয়ে বড়ো হলে শহরে যায়। আর তুমি গ্রামে আসার প্লান করছো। তোমার ইচ্ছে হলো লাড়কির চুলায় আমি মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করি।
- দেখ লারকির চুলায় আমার মা এখনো রান্না করেন। তবুও করতে না চাইলে সিলিন্ডার আছে। আর আমি তোমাকে শহরে থাকতে মোটেই নিষেধ করছিনা। তাহলে বছর খানেকতো অপেক্ষা করো। ঢাকা বা কোনো বিভাগীয় শহরে বদলী হয়ে মেয়ে নিয়ে নাহয় সেখানে উঠবো। ভালো একটা স্কুলে…
- সাহেবের খালি অপেক্ষা। যেন তিনি অপেক্ষার টেন্ডার নিয়েছেন। আমি পারবোনা অপেক্ষা টপেক্ষা করতে। আমি আমার ডিসিশান নিয়েছি। আমি মার সাথে থাকবো। সেখাসে জেসিকে ভর্তি করে দেব। আমি কালই চলে যাবো আমার সব জিনিসপত্র নিয়ে একবারই।
- দেখ শ্বশুরবাড়ি আইমিন বাপের বাড়িতে থাকতে কেমন দেখায় বলো?
- ওরে বাপরে। (আমার স্ত্রী হুংকার দিয়ে উঠে) বস্তিতে থাকলে ইজ্জত যায়না, শ্বশুর বাড়ি থাকলে যায়? তোমাকে কে থাকতে বলছে? আমি আমার বাপের বাড়িতে থাকবো।
আমি আর কথা বাড়াইনি। সমঝোতাই শান্তি।
চলবে—-

