ই-কমার্স আইন

ই-কমার্স আইন কেন ইতিবাচক পদক্ষেপ নয়

ই-কমার্স আইন কেন ইতিবাচক পদক্ষেপ নয়

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

ই-কমার্স খাতের ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা অবগত আছেন যে ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মডেলে ই-কমার্সের কারণে এই খাতে ক্রেতা ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। বহুবিধ ক্ষতির মধ্যে পড়েছে যারা বিতর্কিত মডেলে ব্যবসা করেছে তারা নিজেরাও। প্রথমে বিষয়টা অনেকে বুঝতে না পারলেও একটা পর্যায়ে মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকার এসোসিয়েশন সকলে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে কাজ করেছে।

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ৪ জুলাই ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ জুন ২০২১ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সার্কুলার এর কারণে সে বিশেষ মডেলে ব্যবসা করা বন্ধ হয়েছে।

 

ডিজিটাল কমার্স খাতে আইনের কেন প্রয়োজন নেই। তার যথার্থ ব্যাখ্যা

 

এক।। প্রচলিত আইন

বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব আর্থিক ও বাণিজ্যিক অপরাধ হয়ে থাকে। তা প্রচলিত যেকোনো আইনের আ্ওতায় পড়ে। এসব আইনের আওতায়, প্রতারণা, পণ্য না দেয়া, মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অপরাধানের সাজার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই বাড়তি আইনের প্রয়োজন নেই।

 

দুই।। আইনের প্রয়োগ

দেশে প্রচলিত আইনগুলো প্রয়োগ করে ডিজিটাল কমার্স খাতে অনিয়মের বিচার সম্ভব তা সাম্প্রতিককালে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির নামে অভিযোগ দায়ের হলে তাকে চিহ্নিত করার মাঝে বর্তমান আইন প্র্রয়োগ করে ব্যবস্থা নেয়া যায়। যা বেশকিছু ঘটনায় প্রতীয়মান হয়েছে।

 

তিন।। খাতের বিকাশ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত অনলাইন কেনাকাটা হলেও বাংলাদেশে এর হার ১% এর কম। যদিও এই খাতের প্রবৃদ্ধি ৫০% এর মতো।  এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেনি। রয়েছে ভ্যাট ও ট্যাক্স এর বিষয়ে প্রচলিত ব্যবসার সাথে নানারকম বৈষম্য। এমতাবস্থায় আইনের বাড়তি চাপ এই খাতকে পিছিয়ে দিবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

চার ।।  পূর্বের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নহীনতা

বিগত ২০১৮ সালে সরকার এই খাতের উন্নয়নে ‘‘ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০১৮’’ প্রনয়ন করে যা ২০২০ সালে একটি সংশোধনীও আনে। কিন্তু এই নীতিমালার ২০% সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচী এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যেখানে খাত উন্নয়নের সিদ্ধান্তসমূহ এখনো বেশীরভাগ আলোরমূখ দেখেনি। সেখানে আইন দ্বারা এই খাতকে বাঁধার বিষয়টি যৌক্তিক বিচারে যথার্থ নয়।

 

পাঁচ।। স্বীকৃতি

সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য দপ্তর এই খাতকে স্বীকৃতি দিলেও। এখনো এই খাত আইনি কাঠামোতে ব্যবসা খাত হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ট্রেড লাইসেন্স অ্যাক্ট ২০১৬ সংশোধনের উদ্যোগ গতিশীল নয়। এখনো এই খাতের উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসায়িক লাইসেন্স পায়না বা লাইসেন্স ক্যাটাগরিতে ‘‘ই-কমার্স’’ বা ‘‘ ডিজিটাল কমার্স’’ উল্লেখ করতে পারে না। কারণ এটি আেইন দ্বারা স্বীকৃত নয়। যেখানে দেশের আইন এখনো এই খাতকে ব্যবসা খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সেক্ষেত্রে এই খাতকে নিয়ন্ত্রণ বা তদারকীর জন্য আইন প্রনয়ন কতটা যুক্ত যুক্ত এই প্রশ্নটা থেকেই যায়।

 

ছয়।। গৃহিত পদক্ষেপ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ই-কমার্স খাতে অনিয়মের যে অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো কিছু পদক্ষেপ এর মাধ্যমে অনেকাংশে দূর করা হয়েছে। যেমন বিগত ২০২১ সালের ৪ জুলাই প্রণীত ‘‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’’, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি সিদ্ধান্ত, টেকনিক্যাল কমিটি গঠন ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে যেমনি বেশকিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে তেমনি এ ধরনের অনিয়মও বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি আইনগত জটিলতায় পড়লে হয়তো এতো সহজে সমাধান হতো না।

 

সাত।। অভিযোগ ও আইনের প্রয়োগ

ই-কমার্স খাতে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কাজ করতে গিয়ে কিছু বিষয় প্রমাণিত হয়েছে। যেমন, আইন থাকলেও কেউ যদি অভিযোগ না করে বা মামলা রুজু না হয় তাহলে আসলে আইনী প্রক্রিয়া শুরু হয়না। আর মূলত এই কারণেই অনিয়মের সুযোগ পেয়েছে অনেকে। আইন না থাকা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো আইন বিষয়ে সচেতন না থাকা। কারণ অপরাধীকে অপরাধ প্রমাণ হলে প্রচলিত আইন শাস্তি প্রয়োগ করা সম্ভব।

 

 

আট।। আইনের সংশোধন

প্রচলিত যেসব আইন রয়েছে যা ডিজিটাল কমার্স ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত এর মধ্যে অন্যতম হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং প্রতিযোগিতা আইন ২০১২। ইতোমধ্যে এই দুটো আইন সংশোধন এর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ভোক্তা অধিকার আইন সংশোধন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এভাবে কপিরাইট আইনসহ বেশকিছু আইনের কিছু সংশোধনীর মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে এই খাতের অনিয়মসমূহকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব বলে মনে করে সংশ্লিষ্ঠ সকলে।

 

নয় ।। অন্যান্য দেশ

যেসব দেশে ই-কমার্স বিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে সেসব দেশে এখনো ই-কমার্স বিষয়ে কোনো আইন হয়নি বলে চলে। ২/১ টা দেশে অন্য আইনের অধীনে বিধি প্রণীত হয়েছে। এবং সে বিধি দ্বারা সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।

 

দশ ।। আইনের ব্যবহার

আমাদের মতো দেশে সব সময় আইনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের আশংকা থাকে। এ ধরনের একটি বিকাশমান খাত আইনের অপ-ব্যবহার দ্বারা বাধাগ্রস্থ হলে জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়বো এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে।

 

এগারো ।। ক্রস বর্ডার ই-কমার্স খাত

ক্রস বর্ডার ই-কমার্স খাতের মতো একটি সম্ভাবনাময় খাত এখনো পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারেনি। ই-ক্যাব এই বিষয়ে ৬টি খাতওয়ারী সমস্যা ও ১৭টি বাঁধা চিহ্নিত করেছে। এসব সমস্যা সমাধান ও বাঁধা অপসারণ এর ক্ষেত্রে বর্তমানে শুধুমাত্র একটি পলিসি প্রনয়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। এই অবস্থায় এই খাতের আইন পুরো খাতকে ভুল পথে পরিচালিত করার পুরো আশংকা রয়েছে।

 

বারো ।। বিদেশী বিনিয়োগ ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ অপসারণ

আইনের মাধ্যমে এই খাতে বিভিন্ন ধরনের সংকোচন তৈরী করলে এই খাতে কাংখিত বিদেশী বিনিয়োগ বাঁধাগ্রস্থ হবে। এতে ডিজিটাল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন ও স্মার্ট বাংলাদেশ এর কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হবে।  এই খাতে বিদেশী বিনিয়োগ বাঁধাগ্রস্থ হবে এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ অপসারণ করে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

 

তেরো।। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন

বিগত  তারিখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন প্রাইভেট সেক্টর ডেভলপমেন্ট কমিটি এই খাতের উন্নয়নে বেশকিছু প্রস্তাব পাশ করে। উক্ত প্রস্তাবগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তর বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তার বেশীরভাগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এই অবস্থায় আইন দ্বারা এই খাতকে বাঁধার সিদ্ধান্ত  একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত বলে খাত সংশ্লিষ্ঠরা মনে করছেন।

 

চৌদ্দ।। বোধগম্যতা, দক্ষতা, সক্ষমতা ও পরিপূর্নতা

ই-কমার্স খাত নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে যে, প্রাইভেট এবং পাবলিক খাতে এই খাতের কারিগরি দিক, রেভিনিউ মডেল, বিজনেস কনসেপ্ট নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল ধারণাও রয়েছে। রয়েছে এই খাতের বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ এবং পেশাদারের অভাব। এই অবস্থায় যেকোনো ধরনের আইন তৈরী করতে গেলে বোধগম্যতা দক্ষতা, সক্ষমতা ও পরিপূর্নতার অভাবে তা হিতে বিপরীত হওয়ার আশংকা রয়েছে।

 

পনের ।। বাস্তবায়নাধীন ইস্যু

ইতোমধ্যে ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন, ডিবিআইডি, এসক্রো, সিসিএমএস, সিএলসিএম ও ডিজিটাল কমার্স সেলকে শক্তিশালী করন ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এখানে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন, ডিবিআইডি ছাড়া অন্যকোনো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। এই অবস্থায় আইন করা যথার্থ হবে না।

 

ষোলো।। আর্থিক ইস্যু ও এসক্রো

মূলত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আর্থিক ইস্যূতে সবচেয়ে বেশী অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই  সমস্যার সমাধান এর জন্য ডিজিটাল কমার্সম পলিসিতে এসক্রো সেবা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা আজ অবধি বাস্তবায়িত হয়নি।

 

যদি ই-কমার্স আইন হয় তাহলে অবশ্যই অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে এমনভাবে হওয়া উচিৎ যাতে পূর্বের সমস্যাগুলোর পূনরাবৃত্তি না ঘটে। এছাড়া ই-কমার্স কতৃপক্ষ আইনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেটাও হতে পারে তবে উভয়ক্ষেত্রে একই বিষয়গুলো বিবেচ্য।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply